বিএনপিকে আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আনতেই হবে সরকারকে এ অবস্থান নিয়েছে বিদেশিরা। কোন পথে বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে হবে তা নিয়ে সরকারকে বিদেশিরা সুনির্দিষ্ট কোনো গাইডলাইন দেয়নি। অন্যদিকে বিএনপির প্রতিও তাদের বার্তা নির্বাচনে আসতে হবে। বিএনপি নির্বাচনের ছয় মাস আগে সরকারকে নির্বাচনী রোডম্যাপ পরিষ্কার করতে বিদেশিদের কৌশল নিতে অনুরোধ করেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে সরকার যেমন বিএনপিকে বাইরে রেখে আগামী সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে পারবে না। তেমনি বিএনপিও নানা কারণে নির্বাচনের বাইরে থাকতে পারবে না। তাই সরকারকে যেমন নমনীয় অবস্থানে দেখা যাচ্ছে, তেমননি বিএনপির মধ্যেও ভাবনা-চিন্তার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপিদলীয় একাধিক সূত্রে দুই দলের ওপর বিদেশিদের চাপ থাকার বিষয়টি জানা গেছে।
আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদেশি শক্তিগুলো সুনির্দিষ্ট করে কোনো পথ এখন পর্যন্ত বাতলে দেয়নি। তবে বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনের বাইরে যাওয়া না যাওয়ার ব্যাপারেও তারা কোনো কথা বলেনি। নির্বাচনকেন্দ্রিক উদ্ভূত রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান হয়েছে বিদেশিরা সেটা দেখতে চায়।
ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, বিএনপিকে তারাও নির্বাচনে আনতে চান। তবে বিএনপির দাবির কাছে নতি স্বীকার করে নয়। এখন পর্যন্ত তাদের অবস্থান হচ্ছে, সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিয়ে যাচ্ছেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। সেই নিশ্চয়তাকে আমলে নিতে হবে বিএনপির। বিএনপির দাবি, সংবিধানের বাইরে গিয়ে হলেও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে সরকারকে। সেই ক্ষেত্রে সংবিধানের বাইরে এক চুলও সরবে না সরকার এমনটাই এখন পর্যন্ত বলে আসছেন সরকারের মন্ত্রীরা।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপিকে নির্বাচনে আনার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ ‘সাপও মরতে চায়, আবার লাঠিও ভাঙবে না’ এ নীতি অনুসরণ করতে চায়। কিন্তু কোন পথে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটাবে, তা এখনো খুঁজে পায়নি ক্ষমতাসীনরা।
দলটির সভাপতিমন্ডলীর আরেক সদস্য বলেন, বিএনপিকে নির্বাচনে আনতেই হবে বিদেশি এ অবস্থান টের পেয়ে সংলাপের ব্যাপারে আগ্রহ আছে জানিয়ে আওয়ামী লীগ এক ধাপ এগিয়েছে।
গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক প্রভাবশালী দেশের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে এসেছেন। দেশের রাজনীতি নিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের তৎপরতাও বেশ চোখে পড়ছে। তারা সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পাশাপাশি সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ভারত ছাড়া প্রায় সব দেশের রাষ্ট্রদূতরা সব দলের অংশগ্রহণে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেখতে চান বলে জানিয়েছেন।
উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর কাছ থেকে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে, কোনো দলের ভগ্নাংশ নির্বাচনে এলেও হবে না, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রমাণ করতে সব দলকেই আনতে হবে নির্বাচনে। তাদের এ চাওয়া কীভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব, সেটাই চিন্তা করতে শুরু করেছে সরকার। সাজা স্থগিত হওয়ায় খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে না পারলেও রাজনীতি করতে পারবেন আইনমন্ত্রী নিয়মিত বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। তবে দলের নেতা ও সরকারের অন্য মন্ত্রীরা উল্টো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন।
হঠাৎ উদয় হওয়া খালেদা ইস্যুতে আলাদা আলাদা বক্তব্য ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক কৌশল বলে মনে করা হচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিষয়ে আওয়ামী লীগ একেবারেই নেতিবাচক। আর বিএনপি এখন তারেকের হাতের মুঠোয়। তার হাত থেকে বিএনপিকে বের করে আনতে খালেদা জিয়া রাজনীতি করতে পারবেনএমন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করছে রাজনৈতিক মহল। এ ব্যাপারে বিএনপির মনোভাব বোঝার পাশাপাশি রাজনৈতিক চাপে ফেলার জন্য খালেদা জিয়াকে পুনরায় কারাগারে পাঠানো সহজ হবে বলে মনে করছেন তারা।
বিদেশিদের সঙ্গে সম্পর্ক আছে আওয়ামী লীগের এমন একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে উন্নয়ন, অগ্রযাত্রা, গণতন্ত্র হুমকির পাশাপাশি তাদের বড় বিনিয়োগের ক্ষতিসাধন হবে। তাতে বাংলাদেশের অর্থনীতিও হুমকির মুখে পড়বে। বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মকা- চলমান রয়েছে। বিদেশিদের এমন অবস্থান ক্ষমতাসীনদের পাশাপাশি সরকারবিরোধী অবস্থানে থাকা বিএনপিকেও জানিয়েছে বিদেশিরা। বাংলাদেশ সফরে আসা বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বিএনপির আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক না হলেও কূটনীতিকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি তাদের জানানো হয়েছে।
বিএনপিকে নির্বাচনে আনতেই হবে উন্নয়ন সহযোগীদের এমন অবস্থানে আওয়ামী লীগের ভেতরে উদ্বেগের কথা উঠে এলেও এই মূহূর্তে পর্দার অন্তরালের থাকা বিষয় নিয়ে প্রকাশ্য কোনো বক্তব্য দিতে চান না ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। উন্নয়ন সহযোগীদের অনুরোধ নিয়ে দলটির সভাপতি ও সম্পাদকমন্ডলীর একাধিক নেতা প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্ল্যা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনীতিতে সব সময় সংলাপের সম্ভাবনা আছে।’ তিনি বলেন, উন্নয়ন সহযোগীরা সংলাপ নিয়ে কোনো পরামর্শ আওয়ামী লীগকে দেয়নি। তবে তারা চায় আগামী নির্বাচন যাতে সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের এ নেতা বলেন, সংলাপ কখন ও কীভাবে হবে তা সময় ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
শুধু আওয়ামী লীগের ওপরই নয়, নির্বাচনে আসতে হবে- বিদেশিদের এমন চাপ রয়েছে বিএনপির ওপরও। বিএনপির সঙ্গে কূটনীতিকদের একাধিক বৈঠকে এ চাপ দেওয়া হয়েছে। কোন পথ অনুসরণ করে তারা আসবে, সে ব্যাপারে বিএনপিকে সুনির্দিষ্ট কোনো পরামর্শ দেয়নি বিদেশিরা। তবে বিএনপি মনে করছে, সম্প্রতি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনীতি করা ও বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের বিষয়ে সরকারের মন্ত্রীদের মন্তব্য তাদের আন্দোলনকে দুর্বল করার চেষ্টা।
দলটি বলছে, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানা না হলে তারা কোনো সংলাপেও বসবেন না।
গত মঙ্গলবার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও জ্যেষ্ঠ এক নেতা মন্তব্য করেছেন, ‘সরকারের মন্ত্রী-এমপি-নেতারা যে ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের বক্তব্য তাদের কাছ থেকে আরও আসবে। এসব কথার প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
সংলাপ হলে কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে অন্যদের মতো বিএনপির নেতাদেরও বড় ধরনের কৌতূহল রয়েছে। রাজনৈতিক মহলে এরই মধ্যে পর্দার আড়ালে সংলাপের গুঞ্জন চাউর হলেও বিএনপি আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে চায় না।
দলটির তৃণমূল থেকে শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যন্ত সবাইকে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে, সংলাপের নামে চায়ের আসর বা আসন ভাগাভাগির মতো কোনো প্রস্তাবে সমঝোতা হবে না। কেননা, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে জাতিসংঘের তৎকালীন রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর আওয়ামী লীগ-বিএনপির সঙ্গে বৈঠক করে সমঝোতার চেষ্টাও সফল হয়নি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেও সংলাপ হয় গণভবনে। ফল হয়েছে উল্টো।
বিএনপির বরং নির্বাচনের ছয় মাস আগে সরকারকে নির্বাচনী রোডম্যাপ পরিষ্কার করতে বিদেশিদের কৌশল নিতে অনুরোধ করেছে। দলটির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশে থাকা বিদেশি দপ্তরগুলোতে গত বছর চিঠি দিয়ে এই অনুরোধ করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত বছরের ১০ ডিসেম্বরের পর সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে নির্বাচনের অন্তত ৬ মাস আগে নির্বাচনী রোডম্যাপ পরিষ্কার করতে সরকার যাতে বাধ্য হয়, সে ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করে বিএনপি।
ওই চিঠিতে বলা হয়, সরকার কি বর্তমান সংবিধানের আলোকেই নির্বাচন করবে, নাকি সব দলকে নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে চায়, সেটি যেন তারা পরিষ্কার করে। বিএনপি যে বিদেশি দপ্তরগুলোতে চিঠি দিয়েছে তা নিয়ে চলতি মাসের শুরুতে অভিযোগ করেছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। সেই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, ‘শুধু জাপানকে কেন আমরা তো চিঠি দিয়েছি বহু দেশকে। এটা সত্য।’
চিঠি তৈরি ও বিদেশি মিশনগুলোতে পাঠানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে য্ক্তু বিএনপির দুজন নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, নানা বিষয়ের পাশাপাশি আগামী দ্বাদশ নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে ওই চিঠিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তারা জানান, মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ আরেকটি একতরফা সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে টানা ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা করছেন। অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটের কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হচ্ছে না; বরং বিরোধী দলের ওপর মামলা, নির্যাতন, কর্মসূচিতে বাধার হার আরও বেড়েছে।
ঈদুল ফিতরের পর সংলাপ হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ বা বিএনপি এ বিষয়ে স্পষ্ট করেনি। সমঝোতা ছাড়াই সরকার একতরফা নির্বাচনের ব্যবস্থা নিলে সে ক্ষেত্রে কী হবে? বিএনপির নেতারা মনে করছেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই সরকার যত বেশি সম্ভব দলগুলোকে নানা পন্থায় নির্বাচনে আনার প্রচেষ্টা চালাবে। সেটি আমলে নিয়ে বিএনপি মাঠে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের কর্মসূচি পালনে মনোযোগী। মার্চ মাসের পর সমঝোতার দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে আন্দোলনকে নতুন পর্যায়ে নিতে কাজ করবেন তারা। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে, সেটির ওপর ভিত্তি করেই তাদের নির্বাচনী পদক্ষেপ পরিচালিত হবে বলে মনে করছেন জ্যেষ্ঠ নেতারা।
জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংলাপ নিয়ে সরকার ও তার দলের লোকেরা যেসব কথা বলছে, সেটা আমরা আমলেই নিচ্ছি না। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো না। আমাদের কথা একেবারেই স্পষ্ট। আমরা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চাই। সরকার সেটার ব্যবস্থা না করলে আমাদের আন্দোলন চলমান আছে, ভবিষ্যতে তা আরও বাড়বে।’ বিদেশি মিশনগুলোতে বিএনপি চিঠি দিয়েছে এমনটি জানিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মানবাধিকার, হত্যা-গুম-খুনসহ দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তাতে উল্লেখ রয়েছে।
বিদেশিদের চাপ বিএনপির ওপর নেই দাবি করে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদেশিরা বাংলাদেশের জনগণের দাবির পক্ষে কথা বলছে। জনগণ তাদের ভোটাধিকার ফেরত পেতে চায়। স্বাভাবিক জীবনযাপনের গ্যারান্টি চায়।’
বিএনপির ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির দায়িত্বে থাকা এই নেতা আরও বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলের চিত্র চিঠির মাধ্যমে বিদেশিদের আমরা জানিয়েছি। সরকারের অপকর্ম তুলে ধরে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছি।’