অন্যরূপে ‘সমাজতন্ত্র’

ত্রিশ শতকের মহামন্দার মহাচিকিৎসক অর্থনীতিবিদ জন এম কেইনস বলতেন, ‘আমি অচল ঘড়ির কাঁটা নই যে, একই জায়গায় থেমে থাকব; আমি সচল ঘড়ি, অবস্থা যখন পাল্টায়, আমি আমার মত পরিবর্তন করি। আপনি কী করেন জনাব?’

আজ যদি কেউ জিজ্ঞেস করেন, পৃথিবীতে তথা বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র কি সম্ভব এ প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই হয়তো জন মেইনারড কেইনসের মন্তব্যের দ্বারস্থ হবেন।

এক

‘সমাজতন্ত্র’ নামক শব্দটি কিংবা সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ধারণা, এক কালে আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এবং স্বাধীনতা-উত্তর ক’টা বছর গ্রাম-শহর, ধনী-গরিব, ডান ও বামসবখানে, সব জায়গায়, সবার করোটিতে সমাজতন্ত্র জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়। তবে কেউ হুজুগে, কেউ সুযোগে এবং কেউ অন্তরের অন্তস্তল থেকে বিশ্বাসে ভর করে। তৎকালীন সিনেমা, নাটক, উপন্যাস কিংবা গানে সমাজতন্ত্রের মূল চেতনার সন্ধান পাওয়া যেত; যা ছিল ‘কেউ খাবে তো কেউ খাবে না, তা হবে না তা হবে না।’

সত্তরের নির্বাচনী প্রচারণায় এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমাজতন্ত্রের কথা গণবিবৃতির মাধ্যমে বিধৃত করেছেন। প্রফেসর রেহমান সোবহানের আত্মজীবনীমূলক বই থেকে অনুবাদ করা অনুসন্ধান এই যে, বঙ্গবন্ধু নিয়মিত সমাজতন্ত্রের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পুনরায় ব্যক্ত করেছেন। যেখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, একটা শোষণমুক্ত সমাজ গঠন। ‘আমি আমাদের শ্রমিক শ্রেণিকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠায় আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তার একটা মৌলিক উদ্দেশ্য হচ্ছে শ্রমিক সমাজের ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা। জাতীয়করণের জন্য পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যেখানে শিল্পে শ্রমিকদের ভূমিকা রাখার ব্যবস্থা থাকবে। বস্তুত বর্ধিত উৎপাদনের ভাগ তারাও পাবে।’

অতীত স্মরণ করে পাই, সত্তরের দশক বিশেষত স্বাধীনতা-উত্তর থেকে পঁচাত্তর-পূর্ব বাংলাদেশে বামধারার রাজনীতির প্রাধান্য আর ডানধারা ডানাকাটা পাখির মতো মুখ থুবড়ে মাটিতে পতিত। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, পঁচাত্তরের দুর্ভাগ্যজনক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষিতে পেন্ডুলাম ঠিক উল্টো ঘুরে যায়। ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি শাসনতন্ত্র থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়, বাজার অর্থনীতির ধারণা প্রাধান্য পায় এবং সমাজ থেকে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাচেতনা বিলুপ্তির পথে পা বাড়ায়। খাঁটি কতক বামপন্থি ছাড়া মেকি সব, সমাজতন্ত্র ফেলে ভোঁ-দৌড় দিল। খুশিতে টগবগ ডুগডুগি বাজাল, ডান।

বিগত দিনে বাংলাদেশের চিত্তাকর্ষক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (এবং উন্নয়নের) পাশাপাশি নেতিবাচক প্রভাবগুলো নিয়ে আমরা সবাই উদ্বিগ্নঊর্ধ্বমুখী অর্থনৈতিক বৈষম্য, ভারসাম্যহীন এক সমাজব্যবস্থা, স্বজনতোষণ পুঁজিবাদ, লুটেরা ধনিক শ্রেণি, ব্যাপক এবং বিস্তৃত দুর্নীতি, পরিবেশ ক্ষয় ইত্যাদি। বাজার অর্থনীতির ব্যর্থতা এবং একই সঙ্গে সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং তদারকির অদক্ষতা কিছুটা হলেও বিকল্প উন্নয়ন মডেলের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছে। এর একটি তো অবশ্যই সমাজতন্ত্র যে শব্দটি তিরোহিত পঁচাত্তর-পরবর্তী সময় থেকে।

সেই বিলুপ্ত সমাজতন্ত্র শব্দটি মাটি খুঁড়ে যেন তুলে আনলেন প্রখ্যাত অধ্যাপক ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ তার সদ্য প্রকাশিত ‘উন্নয়নশীল দেশের গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র : একটি রূপরেখা’ বইতে। ‘সমসাময়িক উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির সমন্বয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি রূপরেখা তৈরি করা যায় কি না, তা নিয়ে কিছু প্রাথমিক চিন্তাভাবনাই এ বইয়ের উদ্দেশ্য।’ কিন্তু এই ‘উদ্দেশ্য’ যে তাকে কট্টর মার্কসবাদীদের সমালোচনার জ্বলন্ত উনুনে নিক্ষেপ করতে পারে এবং স্বজনতোষণ পুঁজিবাদের সমর্থকরা বিস্ফারিত নেত্রে তার দিকে তেড়েফুঁড়ে আসতে পারে, আশা করি সেটা মাথায় রেখেই তিনি হাতে কলম নিয়েছেন।

দুই

গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র? এ আবার হয় নাকি? ভ্রু কুঁচকে সাচ্চা বামপন্থি এই প্রশ্ন করতেই পারেন, যখন তাদের ধারণা ‘গণতন্ত্র’ হচ্ছে বুর্জুয়াদের বিলাস। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এক সাক্ষাৎকারে তার রাজনৈতিক পছন্দ সম্পর্কে যা বলছেন, তা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় এরকম ‘অবশ্যই বাম কিন্তু স্বাধীনতা এবং সমগ্র সাপেক্ষে। যেটা আমি পছন্দ করি না তা হচ্ছে বামেরা, হোক কলকাতা কিংবা ক্যামব্রিজে, জনগণকে স্বাধীনতা এবং পছন্দ করার অধিকার প্রদানকে একধরনের বুর্জুয়া বিলাসিতা বলে গণ্য করে। সুতরাং আমি বামধারায় ঝুঁকে গেলাম কিন্তু স্বাধীনতা ও মুক্তির আগ্রহ সহকারে।’

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের এক চিত্তাকর্ষক বর্ণনা এবং সমাজতন্ত্রের বিভিন্ন ধরন নিয়ে আমাদের কিঞ্চিৎ ধারণা আছে এবং বইটি থেকে লব্ধ জ্ঞান তা শানিত করে বৈকি। আগেও বলা হয়েছে যে, একসময় এতদাঞ্চলে সমাজতন্ত্র শব্দটি বহুল আলোচিত ছিল : “বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই শাসনতন্ত্রে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে ‘সমাজতন্ত্র’কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে ১৯৭১ সালে, শ্রীলঙ্কায় ১৯৭৮ সালে এবং নেপালে ২০১৫ সালে শাসনতন্ত্রে সমাজতন্ত্রের কথাটি যোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বেশকিছু দেশ, যেখানে বহুদলীয় গণতন্ত্র বিদ্যমান, সেসব দেশের শাসনতন্ত্র বা রাষ্ট্রের মূলনীতিতে সমাজতন্ত্রের উল্লেখ আছে।” স্মর্তব্য যে, নানান ব্যাখ্যায় এবং অস্পষ্ট সংজ্ঞায় ব্যবহৃত সেই সমাজতন্ত্র। আবার, তথাকথিত ‘গোলাপি জোয়ার’ বা ‘পিংক টাইড’-এর প্রেক্ষাপটে বামপন্থি অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে ব্রাজিলসহ লাতিন আমেরিকার কিছু দেশ। ‘লাতিন আমেরিকার এই বামপন্থি ধারার রাজনীতি প্রধানত ইতিপূর্বের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সমর্থিত কট্টর বাজার অর্থনীতির প্রতিক্রিয়া হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে।’

তিন

গণতান্ত্রিক সমাজের বিবর্তনশীল ধারণা থেকে আমরা লক্ষ করি, কীভাবে ‘অ-সমাজতান্ত্রিক’ জওহরলাল নেহরু সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক সাফল্যে আকৃষ্ট হয়ে এবং কেমব্র্রিজ সতীর্থ প্রশান্তচন্দ্র মহালনবিশের অনুপ্রেরণায়, বেসরকারি বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর সরকারের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণে ভারী যন্ত্রশিল্প গড়ে তুলতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। ‘সে তুলনায় বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরপর সমাজতন্ত্রকে আদর্শগতভাবে বাহ্যত অনেকটা শক্তভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল; বিশেষত প্রস্তাবিত ভূমি সংস্কার ও শিল্পের সরকারি মালিকানার বিষয়ে।’ তা ছাড়া, আশির দশকের শেষার্ধ থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দর্শনে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক পরিবর্তনের ইতিবৃত্তান্ত‘নব্য-উদারীকরণ পরবর্তী সমাজতন্ত্র’, অমর্ত্য সেন এবং বার্ট্রান্ড রাসেলের সমাজতান্ত্রিক কাঠামোতে ব্যক্তি স্বাধীনতার সুযোগ, জন রলসের ন্যায়পরায়ণতা, ‘বাজার সমাজতন্ত্র’ ইত্যাদি সমেত উপসংহার আমাদের অজানা নয়। মোট কথা, ‘এযাবৎকালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষণীয় হলো যে, বাজার অর্থনীতি ও ব্যক্তি উদ্যোগের অন্তর্নিহিত শক্তিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সে সঙ্গে কিছু মানুষের হাতে এত সম্পদ হতে দেওয়া যাবে না, যাতে সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং জনকল্যাণমূলক নীতি প্রবর্তনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।’

যে দেশে বাজার বৈষম্যের বাহক আবার বিপ্লবের মাধ্যমে সর্বহারার ক্ষমতা দখল সম্ভব নয়, সেসব দেশে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র একটা সমাধান হিসেবে কাজ করতে পারে; তবে তার জন্য প্রয়োজন খুব দক্ষ আমলাতন্ত্র এবং প্রতিশ্রুত রাজনীতিবিদ (দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যার বিশাল ঘাটতি রয়েছে)। যেসব দেশে, যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া রাষ্ট্রীয় খাত প্রতিযোগিতামূলক মুনাফা অর্জন করতে পেরেছে; সেসব দেশে দক্ষ আমলা আর আইনের শাসনের বলেই সম্ভব হয়েছে।

 আর কিছু না হোক, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের পর্যালোচনা সমাজতান্ত্রিক চিন্তার খোরাক জোগাবে তাদের জন্য যারা মনে করেন, সমসাময়িক কালে ‘বাজার সমাজতন্ত্র’ একটা বিকল্প ভাবনা হতে পারে। রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক এবং অধ্যাপনায় রত সবার জন্য এটি পুনরায় বিবেচনার দাবি রাখে। যদিও এ ধরনের বক্তব্য বিতর্কের বাইরে নয়। প্রসঙ্গত বলে নেওয়া ভালো যে, ‘নব্য-উদারীকরণপরবর্তী সমাজতন্ত্র’ নিয়ে নতুন চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে লাতিন আমেরিকায় এমনকি খোদ যুক্তরাষ্ট্রে, তার ঢেউ বাংলাদেশে আসতে পারে একদিন এবং তখন বাংলাদেশের এই প্রফেসরের গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র সম্পর্কিত ধারণাগুলো খুব কাজে লাগবে বলে বিশ্বাস।

অনেকটা সমাধিস্থ সমাজতন্ত্রকে লোকালয়ে নিয়ে আসার সাহস দেখানোর জন্য প্রফেসর মাহমুদকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আশা করি, একদিন আরও বিস্তারিত লেন্সে তিনি বিষয়টি নিয়ে পাঠকের সামনে হাজির হবেনবিশেষত বাংলাদেশের প্রেক্ষিত বিবেচনায় রেখে। যেখানে ‘অন্যায় সুবিধা ও সর্বব্যাপী দুর্নীতিই বড় সমস্যা’ এবং ব্যাংকব্যবস্থা হরিলুটের কারখানা।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, কলাম লেখক সাবেক উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়