বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিদেশি বিনিয়োগে ভাটা পড়ে। বিনিয়োগের জোয়ার প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে, দেশে রাজনৈতিক নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা হলে বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহের পালে বাতাস বইবে। অর্থাৎ নির্বাচিত সরকার হলে, নীতি সহায়তা দরদাম সুযোগ সুবিধা আদায়ের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ যে শর্ত ও উপায়ে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশা বা আহ্বান করে, সে নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দৃষ্টি সরানো হয়। এরপর দর-কষাকষিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আবদারের দিকটা না দেখার ভান করা অসমীচিন। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বানের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, ঘোষিত শিল্পনীতিতে ছিল বা আছে ‘অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় ও বিনিয়োগের জন্য পুঁজির অপ্রতুলতা থাকায়, বিপুল শ্রমিকশক্তির জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, দেশীয় কাঁচামালের কার্যকর ব্যবহারকল্পে উপযুক্ত প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি আমদানি দ্বারা উৎপাদন কৌশল জানা, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানিমুখী শিল্প উদ্যোগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও রূপান্তর’ ঘটানো। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা সেই সত্তরের দশক থেকে। সত্তরের দশকের প্রথমার্ধে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনকালে প্রাইভেট সেক্টরের ওপর পাবলিক সেক্টরের প্রাধান্য ও নিয়ন্ত্রণ বলবৎ ছিল, দ্বিতীয়ার্ধে শিল্প উদ্যোগে পাবলিক সেক্টরের নিয়ন্ত্রণ শিথিল এবং আধিপত্য হ্রাস পেতে থাকে। ১৯৮০-৮১ সালে সরকার প্রাইভেট সেক্টরের উন্নয়ন লক্ষ্যে শিল্পনীতিতে কিছু মৌল পরিবর্তন আনে। আশির দশকে বিদেশি বিনিয়োগ তেমন আসেনি বাংলাদেশে। সত্তর ও আশি দশকে অর্থনৈতিক সাহায্য হিসেবে বিদেশি ঋণ ও অনুদান এসেছে, মূলত পাবলিক সেক্টরের জন্য। প্রাইভেট সেক্টরের পুঁজির প্রয়োজনীয়তা ও তার চাহিদা সৃষ্টি হয় আশির দশকের শেষ ভাগে। প্রাইভেট সেক্টরের বিকাশ শুরু হলে এবং বিদেশি পুঁজি প্রবেশের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সুযোগ-সুবিধার সমাহার ঘটানোর নীতিমালা ঘোষিত হলে বিনিয়োগ বোর্ড অ্যাক্ট, ১৯৮৯ বলে প্রতিষ্ঠিত পোশাক প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগ বোর্ডের কার্যক্রম শুরুর পর দেশে বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে, নব্বই দশকের শুরুতে দেশে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর, বিশ^ায়ন প্রক্রিয়া ও বাজার অর্থনীতির অবগাহনে দেশ সিক্ত হয়। বেসরকারি খাতে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে নীতিমালা এখনো বলবৎ আছে (১) বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো হবে সেসব খাতে, যেসব শিল্প উৎপাদনব্যবস্থা বাংলাদেশে নেই অথচ যা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয়, (২) বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করা হবে বাংলাদেশে বিদ্যমান ওই জাতীয় শিল্পে উৎপাদনব্যবস্থার অধিকতর বিকাশ ঘটানোর জন্য, যা সামাজিক প্রয়োজন ও চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বিদ্যমান এবং (৩) বিদেশি বিনিয়োগে সেই শিল্প প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ ও সহায়তা প্রদান করা হবে যা অবদান রাখতে সক্ষম। দেশে পুঁজি, প্রযুক্তি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা বৃদ্ধিতে প্রাকৃতিক সম্পদের অনুসন্ধান করা দরকার। একই সঙ্গে প্রয়োজন জরিপ ও আহরণে ব্যালান্স, পেমেন্ট পরিস্থিতি উন্নয়নে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্য উপায়ে দেশের অর্থনীতির সার্বিক বিকাশ সাধন।
নীতিমালায় বলা হয়, ‘দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তা বা উৎপাদন উদ্যোগে যেসব সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিধান দেওয়ার ব্যবস্থা অনুসরণ করা হবে, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তার বিধান থাকবে এবং এ ব্যাপারে কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব ও বৈষম্যমূলক আচরণ করা হবে না। বিদেশি বিনিয়োগকে অধিকতর আকর্ষণের লক্ষ্যে ইক্যুইটি শেয়ারের ক্ষেত্রে কোনো মাত্রা বেঁধে না দেওয়া এবং লভ্যাংশসহ পুরো পুঁজি প্রত্যাবাসনের অবাধ সুযোগ ঘোষিত হয়। মাত্র পাঁচটি খাত বাদে সব খাতে দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়ার সুযোগও ঘোষিত হয়। বিদেশি প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় বিদেশি বিশেষজ্ঞ কর্মীদের জন্য, কর রেয়াতসহ সহজ শর্তে ওয়ার্ক পারমিট প্রদানের সুযোগ রাখা হয়। ঘোষিত হয়, রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মেশিনারি ও কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক মওকুফের ব্যবস্থা । দেখা যায়, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেসরকারি খাতে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ঘোষিত সুযোগ-সুবিধাদি বেশি এবং অধিকতর উদার। বিদেশি বিনিয়োগকারী, বিশেষ করে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য শুল্ক মওকুফসহ, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার অধিক সমাহার প্রয়োজন। ফলে একই পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য তা তীব্র প্রতিযোগিতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগে পরবর্তীকালে তারা ফেয়ার প্লে-গ্রাউন্ড প্রতিষ্ঠার দাবি করেছেন।
বিদেশি বিনিয়োগের দ্বারা রপ্তানি বৃদ্ধি তথা ব্যালান্স অব পেমেন্ট পরিস্থিতি উন্নতির শুমারি করলে দেখা যায়, ইপিজেডে প্রতিষ্ঠিত বিদেশি বিনিয়োগ প্রকল্প থেকে রপ্তানি আয় স্বাভাবিক ও সহজভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সে মাত্রা আমদানি (কাঁচামাল) বাদ দিয়ে ভ্যালু এডিশনের ক্ষেত্রে খুব উল্লেখজনক নয়। ১০০ ভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর শুল্ক রেয়াত বাবদ রাজস্ব আয় ভর্তুকি দিয়ে প্রকৃত প্রাপ্তির হিসাব নাজুক অবস্থায় দাঁড়ায়। ইপিজেডে প্রতিষ্ঠিত শিল্প-কারখানাগুলোর শতকরা ৮৭ ভাগের উৎপাদন, কাঁচামাল ও খুচরা যন্ত্রপাতি আমদানিনির্ভর। ইপিজেড শিল্পগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রেডিমেড গার্মেন্টস ইউনিট শিল্প। বাইডাতে নিবন্ধিত বিদেশি বিনিয়োগ, রপ্তানিমুখী শিল্প কারখানাগুলোর সিংহভাগ হলো রেডিমেড গার্মেন্টস সেক্টরে। হালে আইটি সেক্টরে বিদেশি বিনিয়োগ সংবলিত কিছু শিল্প নিবন্ধিত হয়েছে। কিন্তু তাদের রপ্তানির হিসাব সাধারণত দৃশ্যগোচর নয়। বাংলাদেশে বাকি বড় বড় বিদেশি বিনিয়োগ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সেক্টরে। আহরিত গ্যাসের প্রধান ক্রেতা বাংলাদেশ নিজে আর উৎপাদিত বিদ্যুতের ব্যবহারকারীও এই দেশ। রপ্তানির আপাতসুযোগ সৃষ্টি হওয়ার মতো শিল্প এসব ক্ষেত্রে নেই। সিমেন্ট শিল্পে (রসায়ন খাত) ব্যাপক বিদেশি বিনিয়োগ হলেও, তা দেশীয় বাজার দখল কেন্দ্র করে। অধিকন্তু সিমেন্ট শিল্পে ভ্যালু অ্যাডিশন নেই বললেই চলে। কাঁচামাল আমদানি-উত্তর গুণমান বজায় রেখে, বিদেশে সিমেন্ট রপ্তানি করার সম্ভাবনা সুদূরপরাহত মনে হতে পারে। ফিনিশড সিমেন্ট আমদানি ব্যয় হ্রাস পেলেও, সিমেন্টের কাঁচামাল (জিপসাম ও ক্লিংকার) আমদানি ব্যয় তো
থাকছেই। বিদেশি বিনিয়োগ, দেশের বাজারে পুঁজি প্রবেশের পাঁজি-পুঁথি ঘাঁটলে এবং টেকনোলজি ট্রান্সফারের প্রকৃত অবস্থার শুমার ও স্থানীয় শ্রমিকের কর্মসংস্থানের জরিপ ফলাফল বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে মিশ্র ফল লাভ ঘটেছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে। বিদেশি পুঁজির নগদ প্রবাহ সামান্য। বিনিয়োগকৃত সিংহভাগ পুঁজি দেশি-বিদেশি ব্যাংকের ঋণ, যা চড়া সুদ ও শর্তযুক্ত। বেসরকারি খাতে প্রদত্ত বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক ঋণের দায়দায়িত্ব বহনের ঝুঁকি থাকছে দেশের অর্থনীতিতে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিদেশি ঋণ প্রবাহিত হয়েছে কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন যথাযথ সময়ে শুরু করা সম্ভব হয়নি। ফলে ওই ঋণ রীতিমতো ঝুঁকিতে পরিণত হতে চলেছে। এমন সংখ্যা বাড়ছে। জয়েন্টভেনচারের কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটাও দেখা গেছে, স্থানীয় অংশীদারের বিদেশি ঋণের দায় বেড়েছে। সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট প্রকৃতির সরবরাহগুলোয় সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতির মূল্য বেশি ধরা হয়েছে যন্ত্রপাতির স্থায়িত্ব ও গুণমান পূর্বাহ্ণে যথাযথ যাচাই সম্ভব না হওয়ায়, পরবর্তী সময়ে এগুলো ‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’ প্রতীয়মান হয়েছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসনের ঘোষিত সহজ সুবিধাদির আওতায় বিদেশি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে স্থাপিত কোম্পানির মালিকানা কেনাবেচার সমুদয় অর্থ বিনিময় হয়েছে বিদেশে।
হুন্ডির মাধ্যমে প্রত্যাবাসিত হয়েছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কোম্পানির অর্থ। এমনও দেখা গেছে, কোরিয়ান হুন্দাই কোম্পানি যমুনা সেতু প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োজিত হওয়ার সুবাদে, সহজ শর্ত ও নামমাত্র মূল্যে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জমি লিজ নিয়ে সিমেন্ট কারখানা স্থাপন করেছে। বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে দেখিয়ে পরে ওই কারখানার বাণিজ্যিক উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে, বিদেশি আরেক কোম্পানি হোলসিম সিমেন্টের কাছে চড়া দামে সমুদয় কোম্পানির মালিকানা ও জমিসহ কারখানা হস্তান্তর করেছে। তাও আবার বাংলাদেশ কর্র্তৃপকক্ষকে যথাযথভাবে অবহিত না করে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশ কর্র্তৃক ঘোষিত সুযোগ-সুবিধা, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেকাংশে সহজ ও লোভনীয়। আর সুচতুরতার সঙ্গে এসব সদ্ব্যবহার করেছে সুযোগসন্ধানী অনেক বহুজাতিক কোম্পানি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। বাংলাদেশের অপ্রতুল অবকাঠামো-সুবিধা, সরকারের ঘোষিত নীতি-পদ্ধতিতে বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার অনুযোগ আনা হলেও, বাংলাদেশের স্বার্থ নিশ্চিতকারী নীতি-নিয়মকানুনগুলো উপেক্ষা করে সুযোগ-সুবিধাগুলোই ব্যবহার করা হয়েছে। ওয়ার্ক পারমিট প্রদান প্রথাকে পাশ কাটিয়ে, বাংলাদেশে অদক্ষ বহু বিদেশি শ্রমিক টেকনিশয়ান ছদ্মবেশে কর্মরত রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে, তাদের বেতন যথাযথভাবে ঘোষণা করা হয় না এবং তাদের অর্জিত আয় বৈদেশিক মুদ্রায় পাচার হয় দেশীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ অপারগতা, অনীহা কিংবা কখনো যোগসাজশে। ঠিক এ প্রেক্ষাপটে, নতুন সরকারের সময় তাদের সুবিবেচনায় কী ধরনের বিদেশি বিনিয়োগ আসবে বা তাদের স্থানীয় অংশীদাররা কী ধরনের অনুকম্পা আদায়ে কীরূপ তৎপর হবেন, তার ওপর আগাম সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। না হলে নিকট অতীতের মতো দেশ ও দেশের অর্থনীতি, স্বার্থ পরিপন্থী বিদেশি বিনিয়োগের ভারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো কঠিন হবে।
লেখক : সাবেক সচিব ও কলাম লেখক