মানুষের জীবনের প্রথম চাহিদা খাদ্য। জন্মের পর শিশু চিৎকার দেয় খাবারের জন্য। মা তখন মুখে দুধ তুলে দেন। এই খাবার খাওয়ার কতগুলো আদব রয়েছে। সেগুলো জেনে নিলে খাওয়াটাও ইবাদত বলে গণ্য হবে।
খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা : হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতেন এবং সাহাবিদেরও বিসমিল্লাহ বলতে বলতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর নাম নিয়ে ও ডান হাত দ্বারা খানা খাও এবং তোমার দিক থেকে খাও।’সহিহ বোখারি : ৫১৬৭
দস্তরখানা বিছানো : হজরত রাসুল (সা.) খাওয়ার সময় দস্তরখানা বিছিয়ে খেতেন। তিনি এ ব্যাপারে অনেক যতœশীল ছিলেন। হজরত আনাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) পায়াবিশিষ্ট বড় পাত্রে খাবার খেতেন না। হজরত কাতাদা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, তাহলে কীসের ওপর খানা খেতেন? তিনি বললেন, ‘চামড়ার দস্তরখানের ওপর।’সহিহ বোখারি : ৫৩৮৬
হাত ধুয়ে খাবার শুরু করা : খাবার গ্রহণের আগে হাত ধোয়া আবশ্যক। অন্যথায় বিভিন্ন অসুখ দেখা দিতে পারে, এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) খাওয়ার আগে হাত ধোয়ার আদেশ দিয়েছেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলে করিম (সা.) পানাহারের আগে উভয় হাত কবজি পর্যন্ত ধুয়ে নিতেন।মুসনাদে আহমাদ
ডান হাত দিয়ে খাওয়া : হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সব সময় ডান হাত দিয়ে খেতেন এবং ডান হাত দিয়ে খেতে সাহাবিদের উপদেশ দিতেন। তিনি বাম হাত দিয়ে খাবার খাওয়া পছন্দ করতেন না। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা বাম হাত দ্বারা খাবার খেয়ো না ও পান করো না। কেননা শয়তান বাম হাতে খায় ও পান করে।’সহিহ বোখারি : ৫৩৭৬
আঙুল ও হাত চেটে খাওয়া : আঙুল ও হাত চেটে খাওয়া সুন্নত। এর ফলে অধিক বরকত লাভ করা যায়। কেননা খাবারের বরকত কোথায় আছে তা কেউ জানে না। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা যখন খাবার গ্রহণ করো তখন আঙুল চেটে খাও। কেননা বরকত কোথায় রয়েছে তা তোমরা জানো না।’ইবনে মাজাহ : ১৯১৪
হেলান দিয়ে না খাওয়া : হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো কিছুর ওপর হেলান দিয়ে খাবার খেতে নিষেধ করেছেন। এর মাধ্যমে দাম্ভিকতা প্রকাশ পায় এবং আল্লাহর নেয়ামতের অপমান করা হয়। হজরত আবু হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হজরত রাসুলে কারিম (সা.)-এর দরবারে ছিলাম। তিনি এক ব্যক্তিকে বলেন, ‘আমি টেক (হেলান) লাগানো অবস্থায় কোনো কিছু ভক্ষণ করি না।’সহিহ বোখারি : ৫১৯০
খাবারের দোষ-ত্রুটি না ধরা : খাবারে দোষ-ত্রুটি থাকা স্বাভাবিক। রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো খাবারের দোষ ধরতেন না। তার পছন্দ হলে খাবার খেতেন নতুবা উঠে যেতেন। তিনি খাবারের দোষ বের করতে নিষেধ করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) কখনো খাবারের দোষ-ত্রুটি ধরতেন না। তার পছন্দ হলে খেতেন, আর অপছন্দ হলে খেতেন না।’সহিহ বোখারি : ৫১৯৮
খাবারে ফুঁ না দেওয়া : খাবার বা পানিতে ফুঁ দিলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নবী করিম (সা.) কখনো খাবারে ফুঁ দিতেন না। তিনি ফুঁ দিয়ে খাবার বা পানি পান করতে নিষেধ করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) কখনো খাবারে ফুঁ দিতেন না। কোনো কিছু পান করার সময়ও তিনি ফুঁ দিতেন না।’ইবনে মাজাহ : ৩৪১৩
পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাওয়া : পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাওয়া সুন্নত। রাসুল (সা.) পড়ে যাওয়া খাবার তুলে পরিষ্কার করে খেতেন। রাসুল (সা.)-এর খাবারকালে যদি কোনো খাবার পড়ে যেত, তাহলে তিনি তুলে খেতেন। হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের খাবার আহারকালে যদি লুকমা পড়ে যায়, তাহলে ময়লা ফেলে তা ভক্ষণ করো। শয়তানের জন্য ফেলে রেখো না।’ইবনে মাজাহ : ৩৪০৩
খাবার শেষে দোয়া পড়া : খাবার আল্লাহতায়ালার নেয়ামত। আর খাবারের
কৃতজ্ঞতা আদায় করলে আল্লাহ তার নেয়ামত বাড়িয়ে দেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা আদায় করো তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।’সুরা ইবরাহিম : ৭
খাবার শেষে রাসুল (সা.) আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন এবং দোয়া পাঠ করতেন। হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) খাবার শেষ করে বলতেন, ‘আলহামদুলিল্লাহি হামদান কাসিরান ত্বয়্যিবান মুবারাকান ফিহি, গায়রা মাকফিইন, ওলা মুয়াদ্দায়িন ওলা মুসতাগনা আনহু রাব্বানা।’
তিনি আবার কখনো এই দোয়া পড়তেন, ‘আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আতআমানা ওয়াছাকানা ওয়াজাআলানা মিনাল মুসলিমিন।’সহিহ বোখারি : ৫৪৫৮