সীতাকুণ্ডের কদম রসুল এলাকায় বিএম কনটেইনার ডিপোর বিস্ফোরণের ক্ষত না শুকাতেই একই এলাকায় আবারও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটল অক্সিজেন প্ল্যান্টে। ‘সীমা অক্সিজেন অক্সিকো লিমিটেড’ নামের প্ল্যান্টে গতকাল শনিবার বিকেল ৪টার দিকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে কেঁপে ওঠে প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার এলাকা। দুর্ঘটনার পর প্ল্যান্টের ভেতরে পাঁচজনের মরদেহ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া প্ল্যান্টের বাইরে একজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে আরও ২২ জন। এ ঘটনায় ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। দুর্ঘটনার কারণ এখনো জানা যায়নি।
বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল প্ল্যান্টটিতে অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। আর পুরো প্ল্যান্টের ওপরের ছাউনি উড়ে গেছে। স্থাপনার লোহার রডগুলো বেঁকে রয়েছে।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্ল্যান্টের মধ্যে একটি বড় সিলিন্ডার রয়েছে যেখানে অক্সিজেন উৎপাদিত হয়ে জমা হয়। পাইপের মাধ্যমে একটি স্পটে আসে। সেই স্পট থেকে ছোট আকারের অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলোতে অক্সিজেন রিফিল করা হয়। পুরো প্ল্যান্টে অক্সিজেন রিফিল করার দুটো স্পট রয়েছে। প্রতিটি স্পটে ৬ জন করে দুই স্পটে ১২ জন ডিউটিরত ছিলেন। বিস্ফোরণের পরপরই ওপরের ছাউনিগুলো উড়ে যায় এবং পাশের অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলোর নিচে চাপা পড়ে ওখানে কর্মরত শ্রমিকরা।
এ ঘটনায় নিহত পাঁচজনের নাম পাওয়া গেছে। তারা হলেন শামসুল ইসলাম (৪০), ফরিদ (৩৬), রতন লকরেট (৪৫), আবদুল কাদের (৫০) ও সালাহউদ্দিন (৩৫)। বাকি একজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও একজনের মরদেহ ভাটিয়ারি বিএসবিএ হাসপাতালে রয়েছে বলে সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফায়েল আহমেদ জানান। এ ছাড়া ২২ জন আহত হলেও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মো. নূর হোসেন ( ৩০), মো. আরাফাত (২২), মোতালেব (৫২), ফেনসি (৩০), মো. জসিম উদ্দিন (৪৫), নারায়ণ (৬০), মো. ফোরকান দাদা (৩৫), নাসিম শাহরিয়ার (২৬), মো. জাহিদ হাসান (২৬), মাকসুদুল আলম (৩০), মোহাম্মদ ওসমান (৪৫), মোহাম্মদ সোলায়মান (৪০), মোহাম্মদ রিপন (৪০) ও রোজী বেগম (২০)।
পুরো প্ল্যান্ট ঘুরে দেখা যায়, অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলো যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এ ছাড়া পাশের একটি ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখা গেছে। কারখানার সীমানা দেয়ালটি ভেঙে গেছে। প্ল্যান্টের বাইরে আরেকটি কারখানা ছিল সেটিও লোহার পাতের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া আশপাশের মানুষের ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্ফোরণের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে এক শ্রমিক বলেন, ‘প্ল্যান্টের এই পাইপটি (চিমনি) ১০০ ফুট উঁচু ছিল। এর ওপরে ছিল ছাউনি। নিচ থেকে কী পরিমাণ শক্তিতে বিস্ফোরণ হলে তা পুরো উড়ে গিয়ে ঢাকা ট্রাঙ্ক রোডে পড়ে চিন্তা করে দেখেন।’ আর পুরো প্ল্যান্টটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
এদিকে বিস্ফোরণে অক্সিজেন প্ল্যান্ট থেকে একটি লোহার খণ্ড প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে উড়ে গিয়ে শামসুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির মাথার ওপর পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এমনিভাবে আশপাশের সকল বাড়িঘরের গ্লাসও বিস্ফোরণের শব্দে ভেঙে যায় এবং আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে লোহার খণ্ড।
কীভাবে হয়েছে এই দুর্ঘটনা?
দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে কেউ কথা বলতে নারাজ। এখনই চটজলদি কোনো মন্তব্য করতে চায় না কেউ। ঘটনাস্থলে শুরু থেকে উপস্থিত থাকা সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘এখন আমাদের প্রধান কাজ হলো উদ্ধার করা। উদ্ধার কার্যক্রম শেষ করার পর কী কারণে হয়েছে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হবে।’
অক্সিজেন প্ল্যান্টের একাধিক শ্রমিক জানান, প্ল্যান্টের মধ্যে কারিগরি কোনো সমস্যা হয়েছে হয়তো। অথবা যে পয়েন্টে সিলিন্ডারে রিফিল করা হয় সেখানে কোনো সমস্যা হলো কি না সেটাও দেখার বিষয়। তবে এখনই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নয় কেউ।
তবে এখনই কারণ বলতে নারাজ ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের উপসহকারী পরিচালক আবদুল হামিদ মিয়া। তিনি বলেন, ‘আগে উদ্ধার শেষ করি, পরে কারণ অনুসন্ধান করব। তবে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে সিলিন্ডার থেকে বিস্ফোরণ হয়েছে।’
কিন্তু ধ্বংসস্তূপের নিচে কী পরিমাণ লোক চাপা রয়েছে? এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে কারখানার লোকজন জানান, এখনই এ বিষয়ে কিছু বলা যাবে না। সাধারণত পুরো কারখানায় ২০০ শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু বিস্ফোরণের সময় কতজন কাজ করছিলেন তা জানা নেই।
গাউছিয়া কমিটির সদস্যদের একজন মোহাম্মদ ফারুক বলেন, ‘বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকায় আগুনের কু-লী ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে তা নিভে যায়। তবে এখান থেকে লোহার পাতগুলো আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে।’
স্থানীয় বাসিন্দা আসাদুল আলম বলেন, ‘অক্সিজেন কারখানা থেকে আমার বাড়ি অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে আমার ঘরের দরজা এবং জানালা ভেঙে নিচে পড়ে যায়।’
শিল্পে ব্যবহৃত অক্সিজেন উৎপাদিত হতো কারখানাটিতে শিল্পে ব্যবহৃত অক্সিজেন উৎপাদিত হতো কারখানাটিতে। এটি সীমা গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রয়াত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শফি শিল্পগোষ্ঠীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। জাহাজভাঙা শিল্পে লোহা কাটার জন্য যে অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় সেখানে এবং অন্যান্য কারখানায় অক্সিজেন সরবরাহ করা হয় প্রতিষ্ঠানটি থেকে। ১৯৯৭ সালে কারখানাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কারখানাটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ সিলিন্ডার অক্সিজেন উৎপাদিত হতো। মূলত বাতাস থেকে অক্সিজেন পৃথককরণ করে সিলিন্ডারে অক্সিজেন সংরক্ষণ করা হয়। তাদের মালিকানাধীন সীমা স্টিল রিরোলিং মিলস রয়েছে। সেই কারখানায় বছর দশেক আগেও একবার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল।
জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি
এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাশার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান। এ সময় তিনি আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা খরচ সরকারের পক্ষ থেকে বহন করা হবে বলে ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রাকিব হাসানকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেবে। কমিটির অপর সদস্যরা হলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদপ্তরের কর্মকর্তা ও সীতাকুন্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৪ জুন সীমা অক্সিজেন প্ল্যান্ট থেকে প্রায় ৬০০ মিটার উত্তরের বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছিল।