স্থানান্তরযোগ্য ঘরে কষ্ট ঘুচল চরবাসীর

কুড়িগ্রামের নদ-নদীময় চরের নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত গৃহহীন মানুষের জন্য মুজিববর্ষে বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেছেন আশ্রয়ণ-০২ প্রকল্পের আওতায় চর ডিজাইন ঘর। স্থানান্তর করা যায় এমন ডিজাইনের ঘর পেয়ে খুশি চরাঞ্চলবাসী।

প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, চরের বালুময় জমিতে সেমিপাকা ঘর নির্মাণ প্রায় অসম্ভব। ফলে বৃহৎ চরাঞ্চলের গৃহহীনদের আবাসন নিশ্চিত করতে চর ডিজাইনের প্রাথমিক ধারণার প্রস্তাব করে চিলমারী উপজেলা প্রশাসন। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক টাস্কফোর্স থেকে প্রাথমিক ডিজাইন প্রস্তুত করে এলজিইডির কেন্দ্রীয় ডিজাইন ইউনিট থেকে এর চূড়ান্ত ডিজাইন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নেওয়া হয়।

গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী আশ্রয়ণ-০২ প্রকল্পের আওতায় এই চরাঞ্চলের ডিজাইনের নকশা ও বাজেট অনুমোদন করেন এবং ওই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকল্প কার্যালয় থেকে চরাঞ্চলের গৃহ ‘ক’ তালিকাভুক্ত পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রথম ধাপে কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা জেলার ১৪টি উপজেলায় মোট ১ হাজার ৪২টি পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।

জেলার ১৬টি নদ-নদীতে সাড়ে ৫ শতাধিক চরাঞ্চলের ৫-৬ লাখ মানুষের বসবাস। চর ডিজাইন বাস্তবায়নের কারণে নদীভাঙন আর আগুনে পুড়ে নিঃস্ব হওয়া পরিবারের গৃহ নিশ্চিত করছে স্থানীয় প্রশাসন। প্রায় ২ লাখ ৩৩ হাজার টাকা বরাদ্দকৃত দৈর্ঘ্য-সাড়ে ১০ ফুট এবং প্রস্থ ১৯ ফুট ৬ ইঞ্চির আয়তনের চর ডিজাইনের ঘরে রয়েছে ২১টি আরসিসি প্রিক্যাস্ট পিলার। মেঝে পাকাসহ টিনের শেড ও বেড়া এবং টিনের সিলিংযুক্ত এই ঘরে রয়েছে দুটি শয়নকক্ষ, রান্নাঘর, ল্যাট্রিন, চারটি জানালা ও একটি বারান্দা। ঘরগুলো পিলারের সঙ্গে নাট-বল্টু দিয়ে সংযুক্ত টিন, পিলার, ইটগুলো সহজেই আলাদাভাবে খুলে ফেলা যায়। ফলে নদীভাঙনের মুখে পড়লে খুব সহজেই অন্যত্র স্থানান্তর ও পুনঃস্থাপন করতে পারবে সুবিধাভোগীরা।

কুড়িগ্রাম চিলমারী উপজেলার সদর ইউনিয়নের শাখাহাতি চরে দুস্থ প্রতিবন্ধী লতিফা বেগম। দরিদ্র বোনের সংসারে বসবাস তার। দরিদ্র পরিবারে থাকার জায়গার সংকটের কারণে শীত-বর্ষা হাজারো কষ্ট করে দিন কেটেছে লতিফার। খাবারের কষ্টের পাশাপাশি থাকার সংকটও ছিল তার।

এমন চিত্র একই এলাকার বিধবা মরিয়ম বেওয়ার (৫০)। স্বামী মারা গেছে প্রায় ১০ বছর আগে। আর গত বছর ছেলে মারা যায় অসুস্থতার কারণে। এর মধ্যে গত বছর আগুন লেগে বসতবাড়ি পুড়ে যায়। কিছুই রক্ষা করতে পারেনি। ফলে খোলা আকাশের নিচে দিন-রাত কেটেছে মরিয়ম বেওয়ার। ঝড়-বৃষ্টিতে মানুষের বাড়িতেই আশ্রয় জুটলেও নিজের থাকার কোনো বন্দোবস্ত ছিল না। প্রতিবেশী বিধবা বিজলী বেওয়ার (৪৫) অবস্থাও একই। আগুনে পুড়ে ঘরবাড়ি হারিয়ে খেয়ে না খেয়ে বৃদ্ধ মা এবং একমাত্র সন্তানকে নিয়ে কষ্টে দিন কেটেছে। স্বামী মারা যাওয়ার প্রায় ১৭ বছর হয়ে গেলেও। সেই থেকে জীবনযুদ্ধে কাটছে দিন বিজলী বেওয়ার। ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের লতিফা, মরিয়ম বেওয়া, বিজলী বেওয়ার মতো শত শত ভূমিহীন কিংবা দরিদ্র পরিবার সরকারের চর ডিজাইন ঘর পেয়ে এখন দিন কাটছে নিশ্চিন্তে।

লতিফা বেগম বলেন, ভাঙাচোরা ঘরের মধ্যে আছলং। সেখানে একটু বৃষ্টিতে কাপড়চোপড় সব ভিজে যেত। খুব কষ্ট করে শীত পার করতে হয়েছে। বিনা পয়সায় সরকারি ঘর পেয়ে এখন আর সেই কষ্ট নেই। মরিয়ম বেওয়া বলেন, স্বামী-সন্তান হারিয়ে দিশেহারা হয়ে দিন কেটেছে। এর মধ্যে আগুনে পুড়ে একমাত্র থাকার ঘরটি শেষ হয়ে যায়। ঝড়-বৃষ্টি আর শীতের মধ্যে মানুষের বাড়িতে আশ্রিত হয়ে থাকতে হয়েছে। সরকারের এই ঘর পেয়ে এলা খাই না খাই অন্তত রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারছি।

স্থানীয় বাসিন্দা মকবুল হোসেন বলেন, মেঝে পাকা টিনশেড ঘরটি ভবিষ্যতে নদীভাঙনের মুখে পড়লে নাট-বল্টু খুলে অনায়াসে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া যাবে।

চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহাবুবুর রহমান বলেন, সরকারের ভিশন বাস্তবায়নের জন্য চরাঞ্চলবাসীকে এই সুবিধার আওতায় আনতে চর ডিজাইন প্রাথমিক উদ্যোগ নিই। পরবর্তীকালে জেলা প্রশাসক প্রাথমিক অনুমোদনের পর প্রধানমন্ত্রী এই চর ডিজাইন প্রকল্পটি অনুমোদন দেন। এতে করে সমতল জনপদের পাশাপাশি চরের গৃহহীন পরিবারের বাসস্থান শতভাগ নিশ্চিত হয়েছে। এ জন্য আমরা এটিকে আশ্রয়ণের কুড়িগ্রামের মডেল হিসেবে মার্কেটিং করতে চাই। এ প্রকল্পের আওতায় চরাঞ্চলের ঘরগুলো বিতরণ হয়ে গেছে। অন্যান্য এলাকায় এটির কাজ এখনো চলমান রয়েছে।