দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট কয়েক মাস ধরেই। চাপ সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ধার নেওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণে। চলতি বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে হাঁটছে এ খাতের ঋণ। মুদ্রানীতিতে ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও সাত মাসেও ওই অঙ্ক স্পর্শ করতে পারেনি ব্যাংক খাত। গত জানুয়ারিতে এই খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ১২ দশমিক ৬২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ছোট ও মাঝারি শিল্পের দিকে নজর না দিয়ে বড়দের ঋণ দেওয়ার মানসিকতা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর। ফলে বেসরকারি খাতের বিস্তার ঘটছে না।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে ঋণের চাহিদা আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করেছে। নতুন করে বিনিয়োগ করছেন ব্যবসায়ীরা। তা ছাড়া ডলারের দাম বাড়ার কারণে বেশি ঋণের প্রয়োজন হচ্ছে। এতে নভেম্বরে কিছুটা বেড়েছে ঋণ প্রবৃদ্ধি। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটসহ নানা কারণে প্রবৃদ্ধিতে আবারও পতন দেখা গেছে। তবে এটি বেশি দিন অব্যাহত থাকবে না বলে প্রত্যাশা তাদের।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ১২ লাখ ৬৬ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৬২ শতাংশ। আর বর্তমানে বেসরকারি ঋণের স্থিতি ১৪ লাখ ২৬ হাজার ২৬ কোটি টাকা। আগের মাস ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১২ দশমিক ৮৯ শতাংশ। অর্থাৎ আগের মাসের চেয়েও জানুয়ারিতে প্রবৃদ্ধি কমেছে শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের অর্থনীতির এ সময়ে ব্যাংকগুলোর উচিত নিম্ন ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী নয়। কারণ কম সুদে এসব খাতে বিনিয়োগ করে বেশি পরিশ্রম করতে চায় না ব্যাংকগুলো। তারা শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতেই বিনিয়োগে আগ্রহী। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়গুলো নিয়ে ঠিকভাবে মনিটর করছে না, অনেক সময় মনিটর করলেও তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। এতে এই খাতগুলো বিকশিত হচ্ছে না। এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট ও দেশের ডলার সংকটে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়েই তাদের উৎপাদন কমিয়েছে। যে কারণে তাদেরও ঋণের প্রয়োজন হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করা প্রাক্কলনের চেয়েও কম। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। এর আগের অর্থবছর ২০২১-২২-এ প্রাক্কলন করেছিল ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। যদিও প্রাক্কলিত হারের চেয়ে তা ছিল অনেক কম।
জানা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৯৫ শতাংশে। আগস্টে ঋণ প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশে। এরপরের মাস সেপ্টেম্বরে এই প্রবৃদ্ধি কমে ১৩ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে আসে। অক্টোবরে ১৩ দশমিক ৯১ ও নভেম্বরে ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে দাঁড়ায়। ডিসেম্বর মাসে তা কমে হয় ১২ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং জানুয়ারিতে আরও শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৬২ শতাংশ।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি বছর থেকে এমনিতেই ঋণের চাপ বেড়েছে। কারণ, ঋণের সুদহার ৯ শতাংশের মধ্যে। এজন্য অনেকেই নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ উৎপাদনক্ষমতা বাড়াচ্ছেন। গত কয়েক মাসে ডলারের দাম ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ফলে আমদানিকারকদের ঋণপত্রের মূল্য বেড়ে গেছে। এ কারণে ঋণের পরিমাণ বাড়ার কথা থাকলেও তা কমেছে। এতে বেসরকারি খাতে প্রভাব তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
সাধারণভাবে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের ঘরে থাকে। তবে ২০১৯ সালের নভেম্বরে প্রথমবারের মতো তা নেমে যায় ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশে। করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরুর পর ব্যাপক হারে কমে গিয়ে ২০২০ সালের মে মাসের শেষে প্রবৃদ্ধি নামে ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশে। তবে পরের মাস জুন থেকে তা অল্প অল্প করে বাড়তে থাকে।
চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ২০২২ সাল জুড়েই দেশের বেশির ভাগ অর্থনৈতিক সূচকে অস্বস্তি বিরাজ করে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ সব ধরনের পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ পণ্য সরবরাহে ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণে মূল্যস্ফীতি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অনেক ওপরে রয়েছে। এতে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ খুবই কষ্টে আছে। এর মধ্যেই বাজারে টাকার প্রবাহ আরও বাড়াতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মাধ্যমেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চিন্তা তাদের। যদিও এটি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, যেসব জিনিস দিয়ে মূল্যস্ফীতিকে পরিমাপ করা হয়, সেগুলোর বাইরে অন্য কারণে এবার মূল্যস্ফীতি বেশি হচ্ছে। অন্য কারণগুলো হলোÑ আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে আমদানি খরচ বেড়ে গেছে। আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ বেড়ে গেছে, অন্তঃপ্রবাহ কমে গেছে। আর অন্তঃপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য নেতিবাচক হয়ে পড়েছে। এতে টাকার বিনিময় হারের ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে নতুন মুদ্রানীতিতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাজারভিত্তিক বিনিময় হারের ওপরও জোর দেওয়া হবে।