যেভাবে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ আজ। ১৮ মিনিটের কালজয়ী এ ভাষণের শেষ কটি শব্দমালা ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম... এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ঐতিহাসিক ভাষণের আটটি শব্দের শেষ দুটি লাইন হয়ে গেল সাত কোটি মানুষের মনের ভাষা। হয়ে গেল মুক্তিকামী বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র।

দিনটি ছিল রবিবার। ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (রেসকোর্স ময়দান) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অপেক্ষায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ। তিনি আসলেন মহাসমুদ্রে আর শুরু হলো গগণবিদারী স্লোগান, ‘ভুট্টোর মুখে লাথি মার, বাংলাদেশ স্বাধীন কর; পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা; তোমার দেশ, আমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ।’ এই সেøাগানগুলো জনতার কাছ থেকে আসল। এগুলো কোনো নেতা দেয়নি, তার আগেই মুক্তিপাগল কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-জনতা এ স্লোগান তুলে ধরল।

২টা ৪৫ মিনিটে ডায়াসে এসে দাঁড়ালেন ইতিহাসের মহানায়ক, স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুহূর্তেই মহাসমুদ্রের গর্জন থেমে পিনপতন নীরবতা। মাইকে বজ্রকণ্ঠে রাজনীতির কবি যখন সম্বোধন করলেন, ‘ভাইয়েরা আমার’, আবার রেসকোর্সের মহাসমুদ্র সেস্লোগানে স্লোগানে গর্জন তুলল, মহানায়ক বজ্রকণ্ঠে শোষণ-বঞ্চনা, অত্যাচার-নির্যাতনের বর্ণনা যেমন দিলেন, দিয়ে গেলেন নির্দেশনাও।

বক্তব্যের শেষে তিনি বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’, কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল তার বজ্রকণ্ঠের ধ্বনি; কিন্তু মহাসমুদ্রে উপস্থিত কৃষক, শ্রমিক ছাত্র জনতা থামল না; তাদের গগনবিদারী গর্জন আরও বেড়ে গেল। মুক্তিকামী বাঙালি জানান দিল বজ্রকণ্ঠে আরও কিছু শুনতে চায় তারা। অতৃপ্ত বাঙালির আকাক্সক্ষা বুঝেই থেমে যাওয়া বজ্রকণ্ঠ বেজে উঠল আবার। বঙ্গবন্ধু শোনালেন পরের লাইন, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ৭ মার্চের পড়ন্ত বিকেলে বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠে কয়েকটি শব্দমালায় গাঁথা দুটি লাইন অপ্রতিরোধ্য দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছিল ৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে।

এ ভাষণের ব্যাখ্যায় প্রবীণ রাজনীতিকরা দাবি করেন, মুক্তির সংগ্রাম ও স্বাধীনতার সংগ্রামের ঘোষণা বঙ্গবন্ধু মূলত পরোক্ষভাবে দেন। কীভাবে জয়ী হতে হবে সে ব্যাপারেও দিকনির্দেশনা দেন বঙ্গবন্ধু। রাজনীতিকরা বলেন, দেশি-বিদেশি পত্রপত্রিকা অথচ লিখেছিল ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু হয়তো পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। ৫ মার্চ লন্ডনের গার্ডিয়ান, সানডে টাইমস, দি অবজারভার ও ৬ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় স্বাধীনতা ঘোষণার পূর্বাভাস দিয়ে প্রতিবেদন ছাপে। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের পূর্বাপর ঘটনা নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা হয় দেশের প্রবীণ দুই রাজনীতিকের সঙ্গে। একজন হলেন তৎকালীন বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফের) অন্যতম সদস্য সিরাজুল আলম খান ও তৎকালীন বাম রাজনৈতিক নেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য। প্রবীণ রাজনীতিক সিরাজুল আলম খান ওতপ্রোতভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পঙ্কজ ভট্টাচার্য ভেতরে-বাইরে থেকে বিভিন্ন বিষয়ে জানতেন।

ব্রিটিশ গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর একটি সাক্ষাৎকারের উদ্ধৃতি দিয়ে পঙ্কজ ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৯৭২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এনডব্লিউ টিভিতে একটি সাক্ষাৎকার দেন। ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট সেখানে বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চান ৭ মার্চের ভাষণে যুদ্ধের ঘোষণা আপনি দেননি কেন? জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি জানতাম এর পরিণতি কী হবে, তাই ভাষণে আমি ঘোষণা করি যে এবারের সংগ্রাম মুক্তির, শৃঙ্খল মোচন এবং স্বাধীনতার।’

ফ্রস্ট প্রশ্ন করেন, আপনি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘোষণা করছি বললে কী ঘটত? জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বিশেষ করে ওইদিনটিতে আমি এটা করতে চাইনি। কারণ, বিশ^কে পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে চাইনি। এমন কিছু হলে পাকিস্তান বিশ্বের সমর্থন পেত বাঙালির ওপর আঘাত হানার, সেই সুযোগটি তারা নিত। আমি চেয়েছিলাম তারাই আগে আঘাত হানুক, জনগণ তো প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত ছিল। ওই ভাষণের ১৮ দিন পর ২৫ মার্চ আঘাত হানে পাকিস্তান। মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত বাঙালি তা প্রতিরোধ করে। ওই ভাষণই বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে।’

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ সম্পর্কে আলোচনায় পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান পর্বের শেষ ধাপ হলো ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। আমি মনে করি এর আগে গণজাগরণ ঘটে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় বাঙালিদের ওপর গুলিবর্ষণ ও হত্যাকা- শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেই সময় ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান যখন বলে দিলেন ৩ তারিখ সংসদ বসবে না; তখন আওয়ামী লীগের প্রেস কনফারেন্স করছিলেন বঙ্গবন্ধু পূর্বাণী হোটেলে। প্রেস কনফারেন্স অর্ধসমাপ্ত রেখে তারা রাস্তায় নেমে পড়লেন। ৩ মার্চ সংসদ না বসার বিষয়টি মুহূর্তের মধ্যে মুখে মুখে রটে গেল, জনতার মধ্যে ছড়িয়ে গেল, জনারণ্য হয়ে গেল, মানুষ নেমে গেল রাস্তায়।’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এত সহজ-সরল ও সাদামাটা ছিল যে, সবার হদয়ে গ্রথিত হয়ে গেল। উজ্জীবিত-উদ্বেলিত করল শেষ দুটি লাইন। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম... তারপর থেমে গেল বজ্রকণ্ঠ। অতৃপ্ত মুক্তিপাগল বাঙালি থামেনি, গর্জন উঠল। আবার বাজল এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জনসমুদ্রের আকাক্সক্ষা বুঝেই বঙ্গবন্ধু শেষ লাইনটি বলে জয় বাংলা দিয়ে শেষ করলেন অমর কবিতা।’

পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, ‘ভুট্টোর মুখে লাথি মার, বাংলাদেশ স্বাধীন কর; পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা; তোমার দেশ, আমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ। এসব স্লোগানে মেতে উঠল চারদিক। এই স্লোগানগুলো জনতা থেকে এলো। এগুলো কোনো নেতা দেয়নি, দেওয়ার আগেই মানুষ এই স্লোগান ধরে ফেলল। ভুট্টোর মুখে লাথি মার এমন ক্ষোভ-বিক্ষোভে ফেটে পড়া অবস্থা আমার জীবনে ওই প্রথম দেখেছিলাম। সে জন্য আমি বলছি এটা গণজাগরণের ঊর্ধ্বতন ধাপ, গণঅভ্যুত্থানে পৌঁছে গিয়েছিল। সরকারি দলের একপক্ষ মিছিল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণ দেবেন আমরা শুনলাম। সেদিনের মহাসমুদ্রে আমি সহস্রাধিক ন্যাপকর্মীসহ উপস্থিত ছিলাম।’

সিরাজুল আলম খান এক ঘরোয়া আড্ডায় বলেন, ‘১৯৭১ সালের ৪/৫ ও ৬ মার্চ পর্যন্ত ২/৩ ঘণ্টা অন্তর অন্তর আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড ও বিএলএফ হাইকমান্ডের সঙ্গে পৃথক পৃথকভাবে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ নিয়ে বঙ্গবন্ধু আলোচনা করতেন। প্রতিটি বৈঠকেই প্রসঙ্গ থাকত ৭ মার্চের বক্তৃতা। ৬ মার্চ সন্ধ্যায় বিএলএফ বঙ্গবন্ধুর কাছে দাবি করে, ভাষণে সংক্ষেপে অতীত ইতিহাস, অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহতভাবে পরিচালনা করা ও স্বাধীনতার আহ্বান উল্লেখ করে বক্তৃতা শেষ করা। তবে আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড স্বাধীনতার সংগ্রাম লাইনটি বলার বিষয়ে আপত্তি তোলে।’ বিএলএফের অন্যতম এ নেতা বলেন, ‘৫ মার্চ ৭ মার্চের ভাষণের বিষয় নিয়ে বিএলএফের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু আলোচনা করেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, “তোদের প্রস্তাব নিয়ে আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডের সঙ্গে আলাপ করেছি”। ভাষণের চূড়ান্ত পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুকে বিএলএফ সদস্যরা অনুরোধ করেন এ ভাষণ খুবই আবেগময় হতে হবে। তারা সে সম্পর্কিত তিনটি ভাগ করে দিলেন।’

তিনি বলেন, ‘এর আগে ৬ মার্চ সকাল থেকে বিএলএফ ও আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড নেতাদের সঙ্গে বারবার বৈঠক করে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড মুক্তির বিষয়টি দিয়ে বক্তৃতা শেষ করার পরামর্শ দেয়। তবে বিএলএফ দাবি করে দুটি প্রসঙ্গই থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধুর হস্তক্ষেপে বিএলএফ ও আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডে আপস হয়। তবে মুক্তি ও স্বাধীনতার বিষয়টি বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যে থাকতে হবে অনুরোধ করে ৬ মার্চ রাত সাড়ে ১২টায় কয়েকটি বিষয় নোট দিয়ে চলে যায় বিএলএফ সদস্যরা।’

টাঙ্গাইলের ফজলুর রহমান ফারুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ৭০-এর নির্বাচনে গণপরিষদ মেম্বার হন তিনি। ওই জেলার আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এই অনুভূতি বলে বোঝানো যাবে না। এ ভাষণ অমর এক কীর্তি। পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না। এর আবেদনও শেষ হওয়ার নয়।’ তিনি বলেন, ‘সেদিনের রেসকোর্স ময়দান বঙ্গবন্ধুর ১৮ মিনিটের মহাকাব্যে মুক্তিকামী জাতিকে শৃঙ্খলমুক্ত হতে গেলে কী করতে হবে তার সবই তুলে ধরা হয়েছে। ভাষণের শেষ অংশে বজ্রকণ্ঠ থেমে গেলেও থামেনি বীরজনতা। তারা বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠে শুনতে চেয়েছেন এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

প্রসঙ্গত, বিএলএফের সদস্য ছিলেন সিরাজুল আলম খান, প্রয়াত শেখ ফজলুল হক মনি, প্রয়াত আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। পরে আরও অনেকেই যুক্ত হন এ সংগঠনে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের সদস্য ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত খুনি খন্দকার মোশতাক।