৪০ হাজার রোগীর ডায়ালাইসিসে ২ হাজার মেশিন

দেশে দুই কোটির বেশি মানুষ কিডনি রোগে ভুগছেন। তাদের মধ্যে বছরে কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ছে ৪০ হাজার মানুষের। এ ছাড়া আকস্মিক কিডনি বিকলের শিকার হচ্ছেন আরও ১৫-২০ হাজার মানুষ। কিডনি বিকল এসব রোগীর বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হলো কিডনি প্রতিস্থাপন অথবা কিডনি ডায়ালাইসিস।

এমন তথ্য জানিয়ে দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, দেশে ব্রেন ডেথ রোগীদের কিডনিদান ও আত্মীয়স্বজনের থেকে কিডনি সংগ্রহের পরিমাণ খুবই সামান্য। এমনকি কিডনি প্রতিস্থাপন ব্যবস্থাও দেশে খুবই অপ্রতুল ও ব্যয়বহুল। এমন অবস্থায় বেঁচে থাকতে এসব কিডনি বিকল রোগীর শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ায় কিডনি ডায়ালাইসিস। কিন্তু দেশে কিডনি ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থাও অপ্রতুল ও ব্যয়বহুল হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ডায়ালাইসিসও করাতে পারেন না এসব রোগী।

এমন অবস্থায় দেশের কিডনি বিকল রোগীদের মাত্র ১০ শতাংশ কিডনি ডায়ালাইসিস করাতে পারছেন বলে জানিয়েছে কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটি (ক্যাম্পস) ও বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন।

এ ব্যাপারে ক্যাম্পস প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি এবং আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কিডনি রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন সংখ্যা এখনো অনেক কম। কারণ কিডনিদাতা পাওয়া যায় না। পৃথিবী জুড়েই কিডনিদাতার সংকট। আমেরিকাসহ আরও কিছু দেশ যত কিডনি প্রতিস্থাপন হয়, তার ৬০ শতাংশ নেওয়া হয় ব্রেন ডেথ রোগীদের থেকে। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো সেটা হচ্ছে না। এ পর্যন্ত সারাহ নামের মাত্র একটা মেয়ে কিডনি দান করল। সে জন্য কিডনি বিকল রোগীদের বাঁচাতে নির্ভর করতে হয় ডায়ালাইসিসের ওপর।

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও বলেন, ডায়ালাইসিসের খরচ এত বেশি যে কিডনি বিকল রোগীর ৯০ শতাংশই এই ব্যয় বহন করতে পারে না। মাত্র ১০ শতাংশ রোগী বহন করতে পারে। আবার যে ১০ শতাংশ বহন করতে পারে, এই ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে তাদের ৯০ শতাংশের পরিবার দেউলিয়া হয়ে যায়।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব কিডনি দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় ‘সুস্থ কিডনি সবার জন্য, অপ্রত্যাশিত দুর্যোগের প্রস্তুতি, প্রয়োজন ঝুঁকিপূর্ণদের সহায়তা’।

প্রয়োজন ৩০ হাজার ডায়ালাইসিস মেশিন, আছে ২ হাজারের কম : এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতি বছর ৪০ হাজার কিডনি রোগীর কিডনি বিকল হচ্ছে। এসব রোগীর সবার ডায়ালাইসিস দিতে হয়। সে হিসেবে এক বছরে যাদের কিডনি বিকল হচ্ছে তাদের জন্য কমপক্ষে ছয় হাজার মেশিনের দরকার। কিন্তু যখন ডায়ালাইসিস করবে, তখন তারা কয়েক বছর বেঁচে থাকে। সে হিসেবে একজন কিডনি বিকল রোগী ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে যদি পাঁচ বছর বাঁচে, তাহলে পাঁচ বছরের জন্য ৩০ হাজার মেশিন দরকার। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি মিলে দুই হাজারের কম মেশিন আছে। এটা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এর মধ্যে বেশির ভাগই বেসরকারি পর্যায়ের মেশিন এবং সেখানে ডায়ালাইসিস ব্যয় বেশি।

সরকারি মেশিন ৩৮৭, ঢাকায় ২৫১ : সরকারের হাসপাতাল ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেস এবং সরকারি হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১১টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাত্র ৩৮৭টি ডায়ালাইসিস মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে ২৫১টি মেশিন ঢাকার ছয় প্রতিষ্ঠানে এবং বাকি ১৩৬টি মেশিন ঢাকার বাইরে পাঁচটি মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালে। এর বাইরে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে কিছু ডায়ালাইসিস মেশিন রয়েছে।

অন্যদিকে, এই ১১টি প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ৪১টি ডায়ালাইসিস মেশিন বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় আটটি ও ঢাকার বাইরে ৩৩ মেশিন দিয়ে ডায়ালাইসিস করা যাচ্ছে না।

ঢাকায় বেশি মেশিন কুর্মিটোলা হাসপাতালে, কম মিটফোর্ডে : এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার ছয় সরকারি হাসপাতালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মেশিন ৫০০ শয্যা কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৬৬টি। এখানে দুটি মেশিন নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে। এমন তথ্য জানিয়ে হাসপাতালের ৬৬টি ডায়ালাইসিস মেশিন আছে। দু-তিনটি নষ্ট আছে। সেগুলো ঠিক করছি। দৈনিক দুই শিফটে প্রায় ১০০ জনকে ডায়ালাইসিস দিই।

অন্যদিকে সবচেয়ে কম ডায়ালাইসিস মেশিন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মিটফোর্ড হাসপাতাল)। এ ব্যাপারে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. কাজী মো. রশীদ উন নবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানে ২৭টি মেশিন আছে ডায়ালাইসিস করার জন্য। এখানে রোগী কম। দৈনিক গড়ে ৪০টার মতো ডায়ালাইসিস হয়। কিন্তু আমাদের সক্ষমতা বেশি আছে। ৭-৮ বছরের পুরনো ৪টি মেশিন আছে। সেগুলো ঠিক করার জন্য কর্র্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এগুলো ঠিক করতে পারলে সেগুলো ব্যবহার করা যায়। আগে ছিল আটটি মেশিন। এক বছর আগে ১৯টি নতুন যুক্ত হয়েছে। কিডনি বিভাগের ওয়ার্ডে ১৪টি বেড আছে। ডায়ালাইসিস ফি ৪১৪ টাকার মতো লাগে। ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ঠিক আছে।

কিডনি হাসপাতালে মেশিন ৫৮ : দেশের কিডনি রোগীদের একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল ‘জাতীয় কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে’ ডায়ালাইসিস মেশিনের সংখ্যা ৫৮টি বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের নতুন পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. বাবরুল আলম। এই কর্মকর্তা জানান, সরকারি-বেসরকারি পার্টনারশিপের অধীনে ৫০টি ডায়ালাইসিস মেশিন চালু আছে। হাসপাতালের নিজস্ব মেশিন আছে আটটি। এগুলো দিয়ে হাসপাতালের ইমার্জেন্সি রোগীদের ডায়ালাইসিস করা হয়।

এ ছাড়া শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩০টি ডায়ালাইসিস মেশিন চালু আছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, দুটি মেশিন নষ্ট। সেটা ঠিক করতে দিয়েছি। আগে ১০টি মেশিন ছিল। ২০২২ সালে আরও ২০টি মেশিন এসেছে। আরও ২০টি মেশিন বসানোর জায়গা রেখেছি। সেটা শিগগির চালু করতে পারব।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় ৪০টি ডায়ালাইসিস মেশিন চালু আছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. নাজমুল হক। তিনি বলেন, দু-একটা মেশিন নষ্ট থাকতে পারে, সেগুলো আবার ঠিক করি। প্রতিদিন দু-তিন শিফটে একশোর বেশি ডায়ালাইসিস হয়। চাপ অনেক বেশি। তিন-চার মাস, অনেক সময় রোগীদের ছয় মাসও অপেক্ষা করতে হয় ডায়ালাইসিসের জন্য।

তবে এখানে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানরা জানিয়েছেন, ৩২টি মেশিন চালু আছে। কোনো মেশিন নষ্ট নেই। এর মধ্যে ২০২২ সালের দিকে ৪-৫টি নতুন যুক্ত হয়েছে। ২০২১ সালেও আনা হয়েছে কয়েকটি। প্রতিদিন ১০০-এর বেশি ডায়ালাইসিস হয়। সিরিয়ালে অনেক লম্বা তালিকা। চাপ বেশি।

বাইরে বেশি মেশিন চট্টগ্রাম মেডিকেলে : ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি মেশিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৮টি। এর মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্যানডোরের আছে ৩১টি। সেখানে দৈনিক ৯০ জনকে ডায়ালাইসিস করা হয়। বাকি ১৭টি মেশিন হাসপাতালের নিজস্ব।

এরপর সর্বোচ্চ মেশিন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০টি। এ ব্যাপারে হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, নতুন আসা ১০টি মেশিন এক মাস আগে চালু হয়েছে। দুই শিফটে দৈনিক ৪০টি ডায়ালাইসিস হয়। কিন্তু এত কম মেশিন দিয়ে হয় না। আমরা সব মিলে ৫০টি ডায়ালাইসিস মেশিন চালু করতে চাই। সে জন্য জায়গাও বরাদ্দ করে রেখেছি। পুরনো একটা ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট আছে। ওটা দিয়ে কোনো মতে চলছে। অসুবিধা হচ্ছে। কোনো রোগী তিন মাসের বেশি ডায়ালাইসিস পাবে না। তিন মাস পর তাকে আবার আবেদন করতে হবে।

বেশি নষ্ট রংপুর ও দিনাজপুরে : প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি মেশিন বিকল দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ৪১টি কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি সচল ও নষ্ট ১৪টি। প্রতিদিন গড়ে ৩০-৪০ জনের ডায়ালাইসিস করা হচ্ছে।

এরপর রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ৩৯টি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে সচল রয়েছে ২৬টি ও নষ্ট ১৩টি। অচল মেশিনের মধ্যে ৪টি মেরামতযোগ্য। এ ছাড়া ডায়ালাইসিসের জন্য প্রয়োজনীয় তিনটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট সচল রয়েছে। তবে একমাত্র রিপ্রোসেসর মেশিনটিও অচল।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২১টি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে চালু আছে ১৫টি। নষ্ট আছে ছয়টি। এসব মেশিন দেড় থেকে দুবছর ধরে নষ্ট। আর যে চালু ১৫টির মধ্যে সাতটি এক মাস হলো এসেছে। অর্থাৎ এর আগে মাত্র আটটি মেশিন দিয়ে চলত ডায়ালাইসিসের কাজ।

ডায়ালাইসিস সেবা বাড়ানোর পরামর্শ : এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ বলেন, সরকারিপর্যায়ে থানা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস বাড়ানো দরকার। ডায়ালাইসিসকে সর্বজনীন চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার অধীনে এনে সেবা দিতে হবে। বেসরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ডায়ালাইসিস সেন্টারকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। কন্টিনিউয়াস অ্যাম্বুলেটরি পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস বা সিএপিডি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। অর্থাৎ যার ডায়ালাইসিস লাগে, তিনি বাড়িতে বসে নিজের ডায়ালাইসিস নিজে করতে পারবেন। শুধু ডায়ালাইসিসের ফ্লুইড নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে ৫০ শতাংশ কিডনি বিকল রোগী তাদের রোগপ্রতিরোধ করতে পারেন বলেও জানান এই বিশেষজ্ঞ।