পৃথিবীতে অনেক দার্শনিক সমস্যা আছে যার সমাধান দার্শনিকরা দিতে চেষ্টা করেন। এই যেমন জীবন কোথা থেকে এলো, কোথায় যাবে, জীবনের পরমার্থ কী, মন কী? চেতনা কী, ভাষা এবং চিন্তার জোড়া লাগার প্রক্রিয়াটা কী ইত্যাদি। এরমধ্যে কিছু কিছু সমস্যাকে একটি ধারার দার্শনিকরা অসমাধানযোগ্য সমস্যা বা রহস্য বলে মনে করেন। যেমন সংজ্ঞা বা চেতনার প্রকৃত স্বরূপ কী? সেই প্রাচীন গ্রিক কিংবা ভারতের দার্শনিকরা থেকে শুরু হালের বেশকিছু নামকরা দার্শনিক মনে করেছেন চেতনার প্রকৃত স্বরূপ পুরপুরি জানা যাবে না। চেতনার স্বরূপ পুরোপুরি জানা সম্ভব না মানে মনের পরিপূর্ণ প্রকৃতিও জানা যাবে না। কেননা মন এবং চেতনা একে অপরের সঙ্গে এমন ভাবে সম্পর্কিত যে একটির স্বরূপ বুঝতে অন্যটির স্বরূপ সম্পর্কে বুঝ হাজির থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের মনের স্বরূপ সম্পর্কে আমরা কতটাই-বা বুঝি? মনকে আমরা জানি মনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। অর্থাৎ মনের বাইরে মনের যে কর্ম প্রতিফলিত হয় তার মাধ্যমে। কিন্তু মন নিজকে ভেতর থেকে প্রত্যক্ষভাবে বুঝতে পারব না। মনের এটা জন্মগত সীমা। এইরকম বিবিধ দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর বের করার ক্ষেত্রে সীমা দাগানো দার্শনিকদের বলা হয়ে থাকে রহস্যবাদী দার্শনিক। মহাত্মা লালন ফকিরও সে বিচারে এদের কাতারেই পড়েন। ফকির লালন তার গানে বিভিন্ন রূপকে সেই রহস্যকে দাগিয়ে গেছেন।
ধরা যাক লালনের মনের মানুষ রূপকটির কথা। মনেরই একটি সত্তা বোঝাতে তিনি মানুষ শব্দটি ব্যবহার করেছেন যে সত্তাটির শরীর রক্তমাংসের মানুষের মতো না হলেও আচরণ মানুষের মতোই। কিন্তু সেই সত্তাকে সম্যক বুঝতে হলে আগে মন কী জিনিস তা জানার দরকার। আবার মন কী সেটা জানার জন্য প্রয়োজন মগজের কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা থাকা। আমরা অবশ্য মগজ সম্পর্কে অনেক জানি। জানি যে মগজ কিছু অনুষদ নিয়ে গঠিত। একেক অনুষদের একেক কাজ। এই কাজগুলো তারা বিভিন্ন ইন্দ্রিয় বিভাগের সহায়তায় করে থাকে। কোনো অনুষদ চোখের মাধ্যমে জগৎ থেকে আনা তথ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে মনে সংরক্ষণ করে রাখে, কোনো অনুষদ রাখে কানের মাধ্যমে জগৎ থেকে আনা তথ্যকে। এই তথ্য আদান প্রদান হয় একটা বৈদ্যুতিক-রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। আবার একাধিক অনুষদ একসঙ্গে মিলে সেসব তথ্য প্রয়োজন মতো উদ্ধার করে ব্যবহার করে জাগতিক কাজে। অবশ্য সবক্ষেত্রেই মনের কেন্দ্রীয় তথ্য-প্রক্রিয়াজাতকরণ অনুষদের একটি ভূমিকা থাকে। অনুষদগুলোর এই কর্মকাণ্ডগুলো অংশত ব্যক্তির ইচ্ছানিরপেক্ষ, অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয়। নিতান্তই শরীরবৃত্তীয় ব্যাপার। আর কিছু কর্মকাণ্ড ব্যক্তির মনোযোগ এবং মনের ইচ্ছায় সংঘটিত হয়। তখনই প্রশ্ন ওঠে তাহলে মন কী? মন কি মগজের মতো শরীরী কিছু অর্থাৎ মগজেরই একটা শরীরী অনুষদ? নাকি মগজ এবং জগতের তথ্যের অবিরাম মিথস্ক্রিয়ায় উদ্ভূত এক বিরাজমান বিমূর্ত অনুষদ?
এখন মন যদি হয় একটি বিমূর্ত অনুষদ, তাহলের মনের যে বিষয়সমূহ তারাও বিমূর্ত হতে বাধ্য। এই যেমন মনোবেদনা এবং মনোশ্চেতনা, যাকে সাধারণত বলা হয় চেতনা। আর বিমূর্ত বিষয়কে বুঝতে রূপক খুবই কার্যকরী। এই যেমন, লালন ফকিরের ব্যবহার করা রূপক অচিন পাখি রূপকটি দিয়ে মনের যত অচিন অনিকেত সত্তা আছে তাদের বোঝা যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় মন এবং মনের চেতনা উভয়কেই বোঝা যায়। আমাদের যে খাঁচা বা দেহের অংশ মগজ, সে বাবদে মগজ হচ্ছে দেহ, সেই দেহে অর্থাৎ মগজে মনের আবাস এবং চেতনার কেন্দ্রস্থল। এখন মন কিংবা চেতনা আমাদের মগজে কী করে আসা-যাওয়া করে এটা রহস্যই রয়ে গেছে। এবং রহস্যবাদী দার্শনিকদের মতে এটা রহস্যই রয়ে যাবে। লালন সে কথাই প্রত্যয়ন করেন যখন বলেন চিরদিন পুষলাম এক অচিন পাখি কিংবা হাতের কাছে নড়ে চড়ে খুঁজলে জনমভর মেলে না। অর্থাৎ চিরদিন এবং জনমভর বলে তিনি ওই সীমাটাই দাগাচ্ছেন যে চিরদিন এই পোষা পাখি অচিনই থেকে গেছে।
এবার আসা যাক মনের আরও অচিন সত্তার কথায়। মন বা মনের চেতনা বিমূর্ত হলেও এদের অস্তিত্ব মনোবিদ্যা, স্নায়ুবিদ্যা, দর্শনশাস্ত্রস্বীকৃত বিষয়। লালন রূপকের আশ্রয় নিয়ে মনের আরও একটি সত্তার কথা বলেন যা কেবল বঙ্গের বিবিধ সাধক-সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। দুটি রূপকের কথা বলা যাক ‘মনের মানুষ’ এবং ‘সহজ মানুষ।’ এ দুটি রূপক দুটি মনের একটি সত্তাকে নির্দেশ করেছেন লালন। এবং সত্তাটি বিমূর্ত। রূপক দুটিকে যদি আমরা ভাষার জায়গা থেকে দেখি তাহলে সহজ কথাটির একটি অর্থ পাই। সহজ মানে সঙ্গে জন্মে যা, অর্থাৎ সহজাত। সে বাবদে বলা যায়, লালন মনের সহজ মানুষ বলতে মনের ভেতর মনের একটি সহজাত সত্তাকে বোঝাচ্ছেন যা কথা কয় কিন্তু দেখা দেয় না। যার হাত পা কাঁধ মাথা কিছু নেই। যা ক্ষণেক শূন্যে ভাসে আবার পরক্ষণেই পানিতে ভাসে। অর্থাৎ সেই সত্তা চেতন। তবে এইটুকু বোঝা গেল এই চেতন সত্তা বিশেষ কোথাও থাকে না, আবার সে সামান্য বা বিমূর্ত বিষয়ও নয়। কেবল বিশেষ সময়ে সে আকার লাভ করে, মূর্ত হয়, এবং মুহূর্তেই সে আবার নিরাকার হয়ে যায়, নাই হয়ে যায়। তো আমাদের অভিজ্ঞতায় এমন কিছু আছে যা এই সত্তার রূপক হিসেবে, কিংবা তুলনা হিসেবে আসতে পারে? লালন দেখাচ্ছেন পারে।
মনের সেই সহজ মানুষ হচ্ছে মেঘের বিদ্যুৎ যে থাকে মেঘে, কিংবা পাথরে থাকা আগুনের মতো। এক মেঘের মধ্যে সারা জীবন খুঁজলে যেমন বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে না, একটি পাথরে সারা জীবন খুঁজলে আগুন পাওয়া যাবে না। কিন্তু বিদ্যুৎ দুটি মেঘের সংঘর্ষে উদ্ভূত হয়, আবার অগ্নি আবির্ভূত হয় পাথরে ঠুকনি ঠুকলে। এই কথার মর্ম এমন যে, একা পাথরে বা মেঘে আগুন বা বিদ্যুৎ থাকে না, অন্য পাথর বা মেঘের সঙ্গে সংঘর্ষই আগুন বা বিদ্যুতের আবির্ভাব হয়। যা নাই, তাই বিদ্যমান হয়। লালনের ভাষায় “কখনো ধরে আকার কখনো হয় নিরাকার।” তিনি বলছেন মনের মধ্যে মনের সহজাত মানুষটি অনুরূপ প্রক্রিয়াতেই আবির্ভূত হয়। মনের মানুষের আবির্ভাব হয় পুরুষ এবং প্রকৃতির অবিরত সংঘর্ষে, অর্থাৎ মিথস্ক্রিয়ায়। এখানে পুরুষ ও প্রকৃতি দুটোই রূপক, পুরুষ হচ্ছে মন এবং প্রকৃতি হচ্ছে দেহ। তবে এই দেহ যেহেতু পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রকৃতি থেকে তথ্য সংগ্রহ করে, ফলে দেহ আর প্রকৃতিকে এক করে দেখা হয়। সেই তথ্যের সঙ্গে মনের মিথস্ক্রিয়ায় উৎপন্ন হয় ব্যক্তির ব্যক্তিসত্তা বা আমিত্ব। এই আমিত্বেরই আরেক নাম আমার আমি। আমার এই আমিই হচ্ছে মনের সহজাত মানুষ।
এখন কথা থেকে যায় সেই আমিকে নিয়ে যে আমার নয়। আমার ভেতর তাহলে কয় আমি বাস করে? এক আমি তো হলো আমার আমি। আমার ভেতর আরেক আমি আছে, যা হলো আমার শরীরের আমি। সে আমি স্বয়ংক্রিয়। আমার হাত আগুনের স্পর্শে এলে সেই স্বয়ংক্রিয় শারীরিক আমি ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে নেয়। উলটো দিকে আমার আমি হচ্ছে সেই আমি যে পুড়বে জেনেও আগুনে হাত বাড়ানোর ক্ষমতা রাখে। আবার আরেক আমি আছে তা আমার ভেতর অন্যের আমি। যেমন সমাজের আমি। জাতের আমি। বর্ণের আমি। সমাজের কোথায় আমি হাত রাখতে পারব কোথায় পারব না তা আমার ভেতর বসে থাকা সেই সমাজের আমি ঠিক করে দেয়। উলটো দিকে আমার আমি সমাজকে দুহাতে ভেঙেচুরে নতুন করে গড়ে তোলার ক্ষমতা রাখে। সাধকরা সেই সার্বভৌম আমার আমিকেই সন্ধান করেন। শরীরের আমি, সমাজের আমিকে ফানা করে দিয়ে আমার আমি হয়ে ওঠেন। আত্ম বলে বলীয়ান হয়ে ওঠেন। তখনই অনেক অসম্ভব সম্ভবপর হয়ে ওঠে। কিন্তু এই ফানার প্রক্রিয়াটি গোপন এবং রূপকে বর্ণিত। সেই গোপনকে আপন করে নিতে সাধু-গুরুর প্রয়োজন। কিন্তু লালনের রূপক থেকে একটি ধারণা অবশ্যই পাওয়ায় যায়, সাধক কী বলতে চান। গুণীজনের রূপকের ক্ষমতা এমনই।