প্রসঙ্গ নারী : জনরুচি তৈরিতে গণমাধ্যমের দায়

ক’দিন আগেই বিশ্ব নারী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের একটি শীর্ষ টেলিকম প্রতিষ্ঠানের করা বিজ্ঞাপন নিয়ে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিজ্ঞাপনটিতে একজন ব্যবসাসফল নারীকে দেখানো হয়েছিল, যিনি দাবি করছেন ব্যবসার পাশাপাশি ঘর সামলাতেও তিনি সমান সফল। আমাদের চারপাশে এখন এমন নারীর সংখ্যা কম নয়। বস্তুতপক্ষে, সফলভাবে না হোক, মোটামুটি ঘর না সামলিয়ে বাংলাদেশের কোনো নারীর পক্ষে এখনো বাইরে যাওয়ার মতো বাস্তবতা নেই। তাহলে যে নারী দুই দিকটাই সফলভাবে সামলাতে পারছে, তাকে মহিমান্বিত করে নারী দিবসে বিজ্ঞাপন বানালে সমস্যা কী? সমস্যা হলো, এমনিতেই মেয়েদের ওপর সমাজের চাপিয়ে দেওয়া নানা বাধানিষেধ আর গৎবাঁধা কিছু প্রত্যাশা আছে, যার চাপে নারী ঠিকমতো শ্বাসটুকুও নিতে পারে না। চাকরিজীবী নারীর কাছ থেকে ঘরও ঠিকঠাক সামলানো এমনই একটা অন্যায্য চাওয়া। যেটা অধিকাংশ কর্মজীবী নারী পূরণ করছেও, তবে নিজের প্রাণশক্তির বিনিময়ে। নারী দিবসে বিজ্ঞাপন দিয়ে এই বিষয়টি মহিমান্বিত করলে সেই অন্যায্য চাওয়ার চাপ থেকে বের হওয়া নারীর জন্য আরও কঠিন হয়ে যাবে। গণমাধ্যম সমাজে শুভ পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে, এই প্রত্যাশা থেকে বলা যায়, এক্ষেত্রে নারী দিবস উপলক্ষে বিজ্ঞাপন নির্মাণে আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল।

গণমাধ্যম বলতে যদি মোটা দাগে চলচ্চিত্র, টিভি, বিজ্ঞাপন, পত্র-পত্রিকা বোঝানো হয়, তাহলে বরাবরই জনরুচি নির্মাণে তাদের একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। যেহেতু এসব মাধ্যমে সমাজের বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছ পৌঁছানোর সক্ষমতা রাখে, এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল না হওয়ার বা দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। গণমাধ্যমে যেমন সমাজেরই প্রতিফলন ঘটে, তেমনি উলটো দিকে সমাজকে দিকনির্দেশনাও দিয়ে থাকে গণমাধ্যম। শিল্পের জন্য জীবন না জীবনের জন্য শিল্প সেই বিতর্কে না গিয়েও এ কথা বলাই যায়।

বিশেষ করে লিঙ্গ বৈষম্যের মতো এমন একটি বিষয়, যেখানে আইনকানুন পরিবর্তনের চেয়েও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে গণমাধ্যমের কাঁধে বাড়তি দায়িত্ব এসেই পড়ে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের অধিকাংশ সিনেমায় নারী-পুরুষের প্রেমকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়ে এসেছে, তা নারীর প্রতি মোটা দাগে অবমাননাকর, এবং বৈষম্যমূলক। নায়িকাকে উত্ত্যক্ত করছে নায়ক, আর নায়িকা মুখে বিরক্তি দেখালেও শেষ পর্যন্ত ঠিকই নায়কের প্রতি প্রেম জেগে উঠেছে তার, এমন গল্প পাওয়া যাবে শত শত চলচ্চিত্রে। এখন যে কিশোর সিনেমায় এই প্রেম দেখে দেখে তারুণ্যে পৌঁছাল, সে তো ধরেই নেবে নারীর মন পেতে তাকে উত্ত্যক্ত করাই নায়কোচিত। আর স্কুলপড়–য়া যে মেয়েটি নিয়মিত ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছে, সেও এই অপরাধকে অপরাধ বলে চিহ্নিত করতে পারছে না, বরং হয়তো সিনেমার ছক মেনে সেই উত্ত্যক্তকারীকেই আরাধ্য পুরুষ হিসেবে মেনে নিচ্ছে। কিংবা নারীকে যে সর্বংসহা মাতৃরূপে আমরা যুগে যুগে দেখে এসেছি সিনেমায়, বাস্তবে কোনো নারী সেই রূপে না ধরা দিলেই তাকে গালমন্দ করছি। যদি খুব সাম্প্রতিক উদহারণ টানা যায়, তাহলে বলা যায় গত বছরের ব্যবসাসফল ছবি পরাণের কথা। এই ছবি সত্যিকারের একটি ঘটনাকে ভিত্তি করে বানানো হয়েছে, চাঞ্চল্যকর সেই খুনের মামলার আসামি হিসেবে সাজাপ্রাপ্ত এক নারী, মিন্নি। এখানে ভিকটিম নয়, নারী নিজেই খুনি। এই ঘটনার শুরু থেকেই সংবাদ মাধ্যমে মিন্নিকে যেভাবে দেখানো হয়েছে তা খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। প্রথমে মনে করা হয়, সে স্বামী হত্যা ঠেকাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছে, পরে আবিষ্কার হয় নিজের প্রেমিকের সঙ্গে এই খুনের পরিকল্পনাকারী সে নিজেই। আর যায় কোথায়, মিন্নির বহুগামিতা, লোভ এবং নিষ্ঠুরতার সব দায় এসে পড়ে যেন পুরো নারীজাতির ওপরে। মিন্নিকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তো বটেই, মূলধারার গণমাধ্যমেও মামলার রায় হওয়ার আগেই মিন্নিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, অপরাধের পরিবর্তে তার চরিত্র নিয়েই কাটাছেঁড়া চলে বেশি। তো এহেন একটি ঘটনা নিয়ে নির্মিত সিনেমা পরাণেও মিন্নির আদলে যে নারী চরিত্র অনন্যা, তাকে আমরা দেখি আগাপাশতলা স্বার্থপর, লোভী, ছিনাল এবং নিষ্ঠুর একটি নারী চরিত্র হিসেবে। সত্যিকারের মিন্নির বেড়ে ওঠার পরিবেশ, নয়ন বন্ডের মতো সন্ত্রাসীর সঙ্গে তার প্রেম, কিংবা রিফাত-নয়নের মাদক সংশ্লিষ্টতা কতখানি সহায়ক হয়েছিল মিন্নির খুনি হয়ে ওঠাতে, তার কোনো আলোচনা নেই কোথাও। নারীর যে কোনো অপরাধে, তার অপরাধের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে তার ‘চরিত্র’, যা কিনা পুরোপুরিই নির্ভরশীল নারীর সমাজ নির্ধারিত যৌন আচরণের ওপর। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা অন্তত করতে পারে গণমাধ্যম। এমনকি, যখন আমাদের চারপাশের নারীরা বদলে যাচ্ছে, এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চাপিয়ে দেওয়া নিয়মের বাইরে গিয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হচ্ছে, তখনো কিন্তু সিনেমায় আমরা তুলনামূলকভাবে তার কমই প্রতিফলন দেখছি।

একই কথা প্রযোজ্য টিভি নাটক, বিজ্ঞাপন আর সংবাদের ক্ষেত্রেও। নারী প্রশ্নে নারী নিজে যত এগুচ্ছে, সেই মাত্রায় আমাদের গণমাধ্যম কিন্তু এগুতে পারছে না। নারী আজ সমাজের সব ক্ষেত্রে সমানতালে অবদান রাখছে, কিন্তু নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনে এখনো তাকে কামনার বস্তু, শান্তি প্রদায়িনী, আর গৃহব্যবস্থাপনার মূল ভূমিকাতেই আমরা বেশি দেখতে পাই। অথচ বৃহত্তর সমাজের কল্যাণের সঙ্গে নারীর এই অগ্রযাত্রার যে কোনো বিরোধ নেই, সে কথা মানুষকে বোঝাতে ভীষণ কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে এই নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনই। এরকম ইতিবাচক ভূমিকার উদহারণ দিতে বলা যায়, ইদানীং কিছু কিছু নাটক-সিনেমা অথবা বিজ্ঞাপনে গৃহকর্মে পুরুষের অংশগ্রহণ দেখা যায়। সমাজে এমন পুরুষের সংখ্যা কম হলেও, কর্মজীবী নারীর অবস্থান শক্ত করতে এদের ভূমিকা বেশি করে তুলে আনা উচিত গণমাধ্যমের। 

গণমাধ্যমের আরেকটি বড় অংশ হলো সংবাদ মাধ্যম। সংবাদ মাধ্যমে নারীকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, সেখানেও হতাশা প্রকাশ করা ছাড়া উপায় নেই। কি টেলিভিশন নিউজ, কি সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, নারীর উপস্থিতিই সেখানে আশঙ্কাজনকভাবে কম। যদিও বা থাকে, তা সাধারণত ভিকটিম হিসেবে, যেখানে নারী নিজে কোনো সহিংসতা বা নির্যাতনের শিকার। এমনকি বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংকট বা বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ক্ষেত্রেও আমরা এর ভুক্তভোগী হিসেবে নারীকেই বেশি দেখি সংবাদ মাধ্যমে। আবার বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে স্বজন হারিয়ে যেন নারীই শুধু কাঁদে।

সাংবাদিক কিংবা সংবাদ ব্যবস্থাপকদের এ নিয়ে কিছু বলতে গেলে প্রায়ই যে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, সেটা হলো সংবাদে যদি নারী ইস্যু না থাকে, তাহলে কি জোর করে তা আরোপ করতে হবে? এটা তো সাংবাদিকের দায়িত্ব নয়। কিন্তু সত্যটা হলো, লিঙ্গবৈষ্যম এড়ানোর সচেতন চেষ্টা কোনো নারী ইস্যু নয়, এটা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতারই একটা অংশ। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের নারীদের সংখ্যা পুরুষেরও সামান্য বেশি, অথচ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে সংবাদে তার উপস্থিতি শতকরা ২০ ভাগেরও কম। এ দায় কি গণমাধ্যমের ওপরেই বর্তায় না? শুধু নারী ইস্যুতেই নারীর উপস্থিতি থাকতে হবে কেন? যে কোনো সংবাদ প্রতিবেদনে বিষয় বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমরা নারীকে কেন খুঁজে পাই না? হ্যাঁ, এক্ষেত্রেও যুক্তি আসতে পারে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে হয়তো সত্যিই নারী বিশেষজ্ঞ কম। কিন্তু সেই কমসংখ্যককেও খুঁজে বের করে এনে, প্রতিবেদনে নারীর উপস্থিতি, তার দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে দেখার চেষ্টা করার দায়িত্ব নিতে হবে গণমাধ্যমকেই।