মৌলভীবাজারের জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় অবস্থিত পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্ট। বনের বড়লেখা রেঞ্জের সমনভাগ সংরক্ষিত বনের আয়তন ১৮৫০ হেক্টর। এই এলাকার ধলছড়ি ও মাকাল জোরায় প্রায় ৪০ হেক্টর জায়গার বন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এখনও বনে আগুন রয়েছে। নেভানোর কোনো প্রদক্ষেপ নেয়নি স্থানীয় বন বিভাগ। অবশ্য বন বিভাগ বলছে, এটি বড় কোনো বিষয় নয়। এটা বাদ দেন! অথচ আগুন নেভানোর ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ উদাসীন।
এদিকে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো কয়েক হাজার গাছ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পরিবেশগতভাবে মিশ্র চিরসবুজ সমনভাগ বনাঞ্চলের এ অংশটি ইন্দো-বার্মা জীববৈচিত্র্য হটস্পটের একটি অংশ এবং এটি ভারত-বাংলাদেশের আন্তসীমান্তব্যাপী ছয়টি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে একটি।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উক্ত সমনভাগ বনাঞ্চলে প্রায় ৬০৩ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং উভচর সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপ্রায়ী প্রাণীর সমন্বয়ে মোট ২০৯ প্রজাতির মেরুদণ্ডী বন্যপ্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে ২০ প্রজাতির উভচর, ৪৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ১১৩ প্রজাতির পাখি ও ৩১ প্রজাতির স্তন্যপায়ীসহ অসংখ্য বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র। সমনভাগ বনাঞ্চলটি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মিলে চিরসবুজ একটি বনাঞ্চল এবং উদ্ভিদ ও প্রাণী বৈচিত্র্য রক্ষায় বাংলাদেশের মধ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অবস্থান অন্যতম।
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিনের নির্বাচনী এলাকায় প্রকাশ্যে বনের ভেতর এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও তা দেখার কেউ নেই। 'বন রক্ষায় কর্মকর্তাদের নিষ্ঠার সাথে কাজ করতে হবে' পরিবেশমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি থাকলেও এক শ্রেণির অসাধু বন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর যোগসাজশে তা বাস্তবায়ন না করে বন পুড়িয়ে পরিবেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
জানা যায়, সমনভাগ বিটের ধলছড়ি ও মাকাল জোরা এলাকায় এলাকায় প্রায় ৪০ হেক্টর বনভূমি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এক পাশে এখনও দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। আগুনে পুড়ে অজগর সাপ, চশমাপরা হনুমান, মায়া হরিণ, কচ্ছপ, বনরুই, সজারুসহ বিভিন্ন সরীসৃপ প্রজাতির বিরল কীটপতঙ্গ এবং বেশ কিছু প্রজাতির বৃক্ষের ক্ষতি হয়েছে। এদিকে বনের একপাশে অবাধে চলছে বাঁশ কাটার মহোৎসব। প্রায় ৪০ শ্রমিক দিয়ে সরকারি সম্পত্তিগুলোকে বিনষ্ট করা হচ্ছে। এসব বাঁশ পরবর্তীতে আগুন দিয়ে পোড়ানো হবে।
সেখানে নিয়মিত যাওয়া আসা করা কামাল আহমদ নামে একজনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহ আগে বনে আগুন দেখতে পাই। আগুনের তীব্রতা বেশি থাকায় বনের অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিষয়টি বন বিভাগকে জানালেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। যার ফলে এখানকার বিভিন্ন বিরল প্রজাতির প্রাণীসহ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এই বিটের প্রায় অর্ধেক জায়গা এখন খাসিয়াদের দখলে। তারা প্রায় ৯০০ হেক্টর বনভূমি দখল করে গড়ে তুলেছে পানের জুম। দিনদিন বাঁশ ও ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে ধ্বংস করেছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। এখন বন্যপ্রাণীগুলো এই এলাকা থেকে সরে যাচ্ছে।
ইদ্রিস আলী নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, আমি জ্বালানি কাঠ ও নিজের কাজের জন্য বাঁশ নিতে মাঝে মধ্যে বনে যাওয়া-আসা করি। এই বনটি এমন ছিল না। এটি প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো। বনটি পরিপাটি ছিল। তবে এখন আর আগের মতো নেই! সব বনখেকোরা খেয়ে ফেলছে। বনে হাতিও থাকে না। কারণ থাকার কোনো পরিবেশ নেই। আগে অনেক ধরনের বন্যপ্রাণী ও মায়াহরিণ দেখা যেত। এখন কিছু নেই তারা অনিরাপদ।
পাথারিয়া বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ টিমের সদস্য পরিবেশকর্মী সুনিত বলেন, একটি বন কেউ তৈরি করতে পারবে না- কিন্তু ধ্বংস করা যায় খুব সহজে। প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছপালা লতাপাতা হচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। এগুলো যখন আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে তখন প্রাণীগুলো কোথায় যাবে? বন বিভাগের উচিত এ রকম গভীর বনকে প্রাকৃতিকভাবে রাখা। এখানে বনায়ন করলে বন থাকবে না। বন্যপ্রাণী এখন হুমকির মুখে। অচিরেই হারিয়ে যাবে এখানকার সকল বন্যপ্রাণী।
'এটি বড় কোনো বিষয় নয়' জানিয়ে সমনভাগ বিট কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. নুরুল ইসলাম বলেন, উপকারভোগীদের মাধ্যমে ২০ হেক্টর জায়গায় একটি বাগান করা হবে। সে জন্য বন কেটে পরিষ্কার করা হচ্ছে। আগুন লাগার ব্যাপারটি এখানে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। হয়তো কেউ বিড়ি খেয়েছে এখানে। আর এটা থেকেই আগুন লেগে বনের চার-পাঁচ হেক্টর আগুনে পুড়ে গেছে।
বড়লেখা রেঞ্জ কর্মকর্তা শেখর রঞ্জন দাস বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেব।
সিলেট বন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান তৌফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি অবগত। যেকোনো অসাবধানতায় হয়তো এই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। ঝোপঝাড়, গাছের ডালপালা কাটা হয়েছে। সে জন্য এখানে আগুন লেগে এই এলাকা পুড়ে গেছে। আমরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছি।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগুন লেগেছিল ঠিকই- তবে বর্তমানে তা নিয়ন্ত্রণে আছে।