সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (সুপ্রিম কোর্ট বার) এবারের নির্বাচন যে সুষ্ঠু ও বিতর্কমুক্ত হচ্ছে না তা অনুমিতই ছিল। সেই আশঙ্কা সত্যি হলো গতকাল বুধবার। ভোটের প্রথম দিনে সংবাদ সংগ্রহ করতে আসা গণমাধ্যমকর্মী ও আইনজীবীদের ওপর পুলিশের হামলা, ভোটকেন্দ্র ভাঙচুর, আওয়ামী লীগ-বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের হট্টগোল, হাতাহাতি, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, আইনজীবীদের চেম্বার ভাঙচুর, বিচারপ্রার্থীদের আতঙ্ক সব মিলিয়ে নজিরবিহীন পরিস্থিতি ছিল সুপ্রিম কোর্টে। হতবিহ্বলতায় বিচারপ্রার্থীরা আতঙ্কে দিগবিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন।
গতকাল সকালে সুপ্রিম কোর্ট ও ভোটকেন্দ্রের (সুপ্রিম কোর্ট বার মিলনায়তন) আশপাশে কয়েকশ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়, যা অতীতে কখনো হয়নি বলে জানান উচ্চ আদালতের আইনজীবীরা। সুপ্রিম কোর্টের মতো সুরক্ষিত জায়গায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর এমন হামলায় নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের পরিবেশ সচরাচর থাকে উৎসবমুখর। কিন্তু গতবার থেকে (২০২২-২৩) সেই পরিবেশ অনেকটাই আর নেই। এবারের নির্বাচন নিয়েও কয়েক দিন ধরে সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যে নানা শঙ্কা ছিল। গত সোমবার পদত্যাগ করেন নির্বাচন পরিচালনা সাব-কমিটির আহ্বায়ক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। ভোটের আগের রাতে (মঙ্গলবার) আওয়ামী লীগপন্থি ও বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা পাল্টাপাল্টি সাব-কমিটির আহ্বায়কের নাম ঘোষণা করলে পরিস্থিতি উত্তেজনাকর পর্যায়ে চলে যায়। ওইদিন রাতে সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনে ব্যালটে সিল দেওয়া ও ব্যালট ছিনতাইয়ের মতো অভিযোগ তোলেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগপন্থি সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ (সাদা প্যানেল) থেকে সভাপতি পদে অ্যাডভোকেট মোমতাজ উদ্দিন ফকির ও সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট আবদুন নূর দুলাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপিপন্থি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য পরিষদ (নীল প্যানেল) থেকে সভাপতি পদে ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং সম্পাদক পদে সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল নির্বাচনে লড়ছেন।
গতকাল সকাল ১০টায় ভোটগ্রহণ শুরুর কথা থাকলেও তা শুরু হয় অন্তত দুই ঘণ্টা পর। সাদা প্যানেলের আইনজীবীরা তাদের মনোনীত নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মো. মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্ট বার মিলনায়তনের ভোটকেন্দ্রে ভোট শুরুর চেষ্টা করেন। তবে, তারা নীল প্যানেলের আইনজীবীদের বাধার মুখে পড়েন। এ সময় উভয় পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এরপর অন্তত দুই ঘণ্টার বেশি সময় নির্বাচনে অচলাবস্থা চলে। ভোটকেন্দ্রের বাইরে চলতে থাকে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের সেøাগান-পাল্টা সেøাগান। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে নীল প্যানেলের প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস কাজল কেন্দ্রের বাইরে এসে অভিযোগ করেন, তাদের কোনো প্রার্থী ও এজেন্টদের কেন্দ্রে থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। তাকে ও সভাপতি প্রার্থীসহ (মাহবুব উদ্দিন খোকন) বেশ কয়েকজনকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের বেধড়ক মারধর পুলিশের : বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সুপ্রিম কোর্টে নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ করেন এমন কয়েকজন সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহ করতে ভোটকেন্দ্রে যান। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুলিশ তাদের বেধড়ক লাঠিপেটা ও অকথ্য ভাষায় গালাগাল শুরু করে। বুট দিয়ে লাথি মারে। পরিচয়পত্র দেখানোর পরও ক্ষান্ত হয়নি পুলিশ। এ সময় এটিএন নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাবেদ আক্তার, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জান্নাতুল ফেরদাউস তানভী, আজকের পত্রিকার নিজস্ব প্রতিবেদক এস এম নূর মোহাম্মদ, অনলাইন পোর্টাল জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ফজলুল হক মৃধা, মানবজমিনের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার আবদুল্লাহ আল মারুফ, বৈশাখী টিভির ক্যামেরাপারসন ইব্রাহিম হোসেন, এটিএন বাংলার ক্যামেরাপারসন হুমায়ুন কবির, সময় টিভির ক্যামেরাপারসন সোলাইমান স্বপন, প্রথম আলোর ফটো সাংবাদিক শুভ্র কান্তি দাসকে বেধড়ক পেটায় পুলিশ। এর মধ্যে এটিএন নিউজের জাবেদ আক্তারকে মেঝেতে ফেলে পেটানো হয়। এ ছাড়া বৈশাখী টিভির ক্যামেরাপারসন ইব্রাহিমকে লাঠিপেটাসহ গায়ের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় জাবেদ আক্তারকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে সেখান থেকে নিয়ে ভর্তি করা হয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে। অন্যরা প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
জাবেদ আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রের ভেতরে গন্ডগোল হচ্ছে শুনে এগিয়ে যাই। কিন্তু অতর্কিতে আমাদের ওপর হামলা করে পুলিশ। দীর্ঘদিন ধরে আমার পায়ে সমস্যা। হাঁটতে কষ্ট হয়। হাতজোড় করলেও তারা ক্ষান্ত হয়নি।’
সাংবাদিক নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমরা নিয়মিত সুপ্রিম কোর্টে সংবাদ সংগ্রহ করি। আজকে (গতকাল) সেখানে (ভোটকেন্দ্রে) ঝামেলা হচ্ছে শুনে খবর সংগ্রহে যাই। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের ওপর হামলা চালায় পুলিশ। সুপ্রিম কোর্টের মতো জায়গায় সাংবাদিকরা কেন অনিরাপদ থাকবেন?’
এ সময় নির্বাচনে নীল প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী মাহবুব উদ্দিন খোকন, সম্পাদক প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস কাজল, সহসভাপতি প্রার্থী হুমায়ুন কবির মঞ্জুসহ অন্তত ১৫ আইনজীবী পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হন বলে অভিযোগ করেন। অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নী, অ্যাডভোকেট আয়েশা আক্তারসহ বেশ কয়েকজন নারী আইনজীবীকেও মারধর করা হয় বলে জানান তারা। গতকাল প্রথম দিনের বিশৃঙ্খল ভোটে ৮ হাজার ৬০২ জন ভোটারের মধ্যে ২ হাজার ২১৭ জন ভোট দিয়েছেন বলে দেশ রূপান্তরকে জানান নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য আসাদুজ্জামান মনির।
সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সুপ্রিম কোর্টে সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা। ঘটনার পর প্রতিকার চেয়ে প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন আইন, আদালত ও মানবাধিকার-বিষয়ক সংগঠন ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের (এলআরএফ) সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ নেতারা। সংগঠনের সাবেক সভাপতি এম বদিউজ্জামান, বর্তমান সভাপতি আশুতোষ সরকার, সাধারণ সম্পাদক আহম্মেদ সরোয়ার হোসেন ভূঁঞা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। তারা সাংবাদিক নিপীড়নের বিষয়টি লিখিতভাবে প্রধান বিচারপতিকে অবহিত করেন। প্রধান বিচারপতি এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
নির্বাচন অলিখিতভাবে বর্জন বিএনপিপন্থিদের : ভোটের সার্বিক পরিস্থিতি অবগত করতে বিকেল ৩টার দিকে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অ্যানেক্স ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। এ সময় সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, অ্যাডভোকেট এ জে মোহাম্মদ আলী, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, সভাপতি প্রার্থী মাহবুব উদ্দিন খোকন, সম্পাদক প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস কাজলসহ শতাধিকের বেশি আইনজীবী ছিলেন। ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচনে কত ব্যালট থাকবে এবং কতগুলো ব্যবহার হবে তা সব প্রার্থীকে জানানো হয়। সে অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু আগের রাতে (মঙ্গলবার) আমাদের চোখের সামনে ব্যালটে সাদা প্যানেলের প্রার্থীদের পক্ষে সিল দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, উচ্চ আদালতে পুলিশ মোতায়েন করতে হলে প্রধান বিচারপতির অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু প্রধান বিচারপতির অনুমতি ছাড়াই এত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যে সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে কখনো দেখিনি।’
রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘যেহেতু এটি কোনো ভোটের পর্যায়ে পড়ে না তাই বর্জনের প্রসঙ্গ আসছে না। আমাদের কথা হলো এই নির্বাচন বাতিল করে নতুন করে নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলন শেষের কিছুক্ষণ পর অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জন আইনজীবী সরকারবিরোধী সেøাগান দিয়ে ভোটকেন্দ্রে ও কেন্দ্রের বাইরে হামলা চালায়। এ সময় কেন্দ্রের বাইরে থাকা প্যান্ডেল ও চেয়ার ভাঙচুর করা হয়। এরপর সেখান থেকে মিছিল করে সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের নিচতলায় অন্তত দুটি আইনজীবী চেম্বারের দরজা ও জানালার গ্লাস ভাঙচুর করেন তারা। এর একটু পর পুলিশ তাদের ধাওয়া দিলে তারা সটকে পড়েন। কিছুক্ষণ পর সরকারপন্থি আইনজীবীরা সংগঠিত হয়ে মিছিল নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন। সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের নিচতলায় অবস্থান নিয়ে বিএনপিবিরোধী সেøাগান দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন তারা। এ সময় একজন আইনজীবীর চেম্বারের দরজার কাচ ভাঙচুর করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টে সংঘর্ষের ঘটনায় আইনজীবীদের বিরুদ্ধে মামলা : সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের ব্যালট পেপার চুরি ও ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগে শাহবাগ থানায় মামলা হয়েছে। এতে মাহবুব উদ্দিন খোকন, রুহুল কুদ্দুস কাজল, কামরুল হাসান সজলসহ ১২ আইনজীবীর নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
গতকাল সন্ধ্যায় জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সমিতির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মনিরুজ্জামান বাদী হয়ে এ মামলা করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন শাহবাগ থানার ওসি নুর মোহাম্মদ।
মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহাবুব উদ্দিন খোকনকে।
সাংবাদিক নিপীড়ন নিন্দার ঝড় : সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে পৃথক বিবৃতি দিয়েছে এলআরএফ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)। ডিআরইউ সভাপতি মোরসালিন নোমানী, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল, ডিইউজের সভাপতি সোহেল হায়দার চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক আকতার হোসেন বিবৃতিতে দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে সৃষ্ট পরিস্থিতি ও সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে গণতন্ত্র মঞ্চ। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি জানায় সংগঠনটি।
এদিকে সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের হামলার নিন্দা জানিয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। গতকাল কমিশনের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে এ ধরণের হামলা স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যমের অন্তরায়। হামলাকারী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে কমিশন।