দেশে গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে করোনায় কোনো মৃত্যু নেই। সর্বশেষ ১ জন মারা গেছে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি। এমনকি এ বছর এখন পর্যন্ত মারা গেছে পাঁচজন। তাদের মধ্যে গত জানুয়ারিতে দুজনের ও ফেব্রুয়ারিতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। অথচ একসময় করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা ছিল উদ্বেগজনক। গত বছরও মাসে গড়ে ১১৪ ও দিনে ৪ জন করে মারা গেছে। আগের বছর ২০২১ সাল ছিল করোনায় সর্বোচ্চ মৃত্যুর বছর। সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি সে বছর সর্বোচ্চ ২০ হাজার ৫১৩ জনের মৃত্যু হয়।
এখন করোনার সংক্রমণও কমে এসেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে মাত্র পাঁচজন। পরীক্ষা অনুপাতে শনাক্তের হার ছিল শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ। এ বছরের জানুয়ারিতে দৈনিক গড়ে শনাক্ত হয়েছে ১৪ জন এবং পরের মাসে তা আরও কমে ১০ জনে নেমে আসে। আর ১৭ দিন ধরে দৈনিক গড় শনাক্তের সংখ্যা ছিল ৭; অর্থাৎ দেশে করোনা মহামারীর আতঙ্ক তেমন নেই। মানুষ এখন অনেকটাই করোনামুক্ত বলে ধরে নিয়েছে। তবে মহামারী পরিস্থিতি মানুষকে অনেক বেশি সতর্ক করেছে। পরিস্থিতির দিকে তীক্ষè নজর রাখছে সরকারও।
করোনা পরিস্থিতির এমন নি¤œমুখী প্রবণতার মধ্যেই আজ করোনায় মৃত্যুর তিন বছর পার করল বাংলাদেশ। ৮ মার্চ ছিল করোনা মহামারীর তিন বছর। ২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ দেখা দেয়। প্রথম শনাক্ত হয় তিনজন। এর ১০ দিন পর করোনায় প্রথম একজনের মৃত্যু হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণে মোটামুটি সফল ছিল বাংলাদেশ। আর মৃত্যু নিয়ন্ত্রণে দেশের সাফল্য ছিল মাঝামাঝি ধরনের। এর কারণ হিসেবে করোনা টিকা প্রয়োগের সফলতাকে বড় করে দেখছেন। পাশাপাশি গ্রামপর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থা, বয়স্ক জনসংখ্যার সংখ্যা কম, নিয়ন্ত্রণে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ও সতর্কতাকেও কারণ বলে মনে করছেন তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত গত তিন বছরে দেশে করোনায় মোট মারা গেছে ২৯ হাজার ৪৪৫ জন এবং শনাক্ত হয়েছে ২০ লাখ ৩৭ হাজার ৯৫৯ জন। রোগটিতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ৫১ থেকে ৭০ বছর বয়সী মানুষের। সর্বোচ্চ মৃত্যু দেখেছে ঢাকা বিভাগের মানুষ।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনায় মৃত্যু নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ মোটামুটি সফল ছিল। কারণ মৃত্যুর হারটা ১-২ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে যে মৃত্যুহার, সেটা গ্রহণযোগ্য। আমাদের যদি অন্য দেশের মতো অসংখ্য লোক মারাত্মক লক্ষণ নিয়ে আক্রান্ত হতো, তাহলে ভয়াবহ দুর্যোগ হতো।’
বাংলাদেশ করোনায় মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে বলে মনে করেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের করোনা টিকার হার ভালো। এটাই মৃত্যু কমার বড় কারণ। টিকার কারণে এখানে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার সংখ্যা অনেক কমে গেছে। সরকার, স্বাস্থ্য কর্র্তৃপক্ষ গুরুত্ব দিয়েছে। নতুন ধরন এলেও টিকার কারণে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা কমে গেছে। কো-মর্বিডিটির কারণে বাংলাদেশে মৃত্যুতে বেশি মারা গেছে বয়স্ক মানুষ।
প্রথম মৃত্যু ২০২০ সালের ১৮ মার্চ : চীন থেকে প্রথম উৎপত্তি হওয়ার পর বাংলাদেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে ২০২০ সালের ৮ মার্চ। সেদিন তিনজনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এর ১০ দিন পর এই প্রথম মৃত্যু ঘটে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ। এর পরের দুই মাস দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা ৩ অঙ্কের মধ্যে ছিল। পরে তা বাড়তে বাড়তে ওই বছরের জুলাই মাসে সর্বোচ্চে পৌঁছায়। ২ জুলাই সর্বোচ্চ ৪ হাজার ১৯ জনের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। ২০২০ সালের নভেম্বরে সংক্রমণের গতি কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হলেও ডিসেম্বর থেকে সেটা দ্রুত নিচের দিকে নামতে থাকে। সে বছরের মাঝামাঝি সময়ে সংক্রমণের হার ৩ শতাংশের নিচে নেমে এসেছিল আর দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা ছিল ৩০০ জনেরও কম।
বেশি মৃত্যু ৬১-৭০ বছরের : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোট মৃত্যুর ৩১ শতাংশই ছিল ৬১-৭০ বছর বয়সী মানুষ। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মারা যায় ৫১-৬০ বছর বয়সী মানুষ, যা মোট মৃত্যুর ২৩ শতাংশ। তৃতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে ৭১-৮০ বছর বয়সী মানুষের, যা মোট মৃত্যুর ১৮ শতাংশ। এ ছাড়া ৪১-৫০ বছরের মধ্যে ১২ শতাংশ, ৮১-৯০ বছর ও ৩১-৪০ বছরের মধ্যে ৬ শতাংশ করে মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
ঢাকায় বেশি, ময়মনসিংহে কম : সর্বোচ্চ মানুষ মারা গেছে ঢাকা বিভাগে, যা মোট মৃত্যুর ৪৪ শতাংশ ও কম মারা গেছে ময়মনসিংহ বিভাগে, ৩ শতাংশ। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ২০, খুলনায় ১৩, রাজশাহীতে ৭, রংপুরে ৫, সিলেটে সাড়ে ৪ ও বরিশালে ৩ শতাংশ মানুষ মারা গেছে।
বৈশ্বিক মানেও মাঝারি সফলতা বাংলাদেশের : ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে বয়স্ক লোকদের আনুপাতিক সংখ্যা কম। এ কারণে মৃত্যুটা কোনো কোনো দেশের তুলনায় কম। ইউরোপ, আমেরিকায় যারা সিনিয়র সিটিজেন আনুপাতিক সংখ্যা অনেক বেশি। সে কারণে সেখানে মৃত্যুটা বেশি। বাংলাদেশে বৈশ্বিক মান অনুযায়ী সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ন্ত্রণে মাঝারি মানের সাফল্য। আমাদের চেয়ে পূর্বের দেশ অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর বেশি সফল। সেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থা খুব ভালো। তা ছাড়া ওদের প্রথম সার্স মহামারীর অভিজ্ঞতা আছে। ফলে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে ওখানকার নাগরিকরা আগে থেকেই অভ্যস্ত। যেসব দেশে সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ভালো, তারা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। কিন্তু আমাদের দেশে সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নেই। শহরে এটা শূন্য। কমিউনিটি লেভেলে যেটুকু প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আছে, বড় বড় শহরে তা নেই। এখানে বেসরকারি পর্যায়ের বড় বড় হাসপাতাল আছে।’
এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশে মোটামুটি কাছাকাছি মৃত্যুর হার। গ্রীষ্মপ্রধান ও অনুন্নত দেশগুলো যেখানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা কম, সেই দেশগুলোতে মারাত্মক সংক্রমণ কম হয়েছে। আনুপাতিক হারে মৃত্যুও কম হয়েছে। যেমন করোনা টিকার উদ্যোগ বাংলাদেশের চেয়ে অন্যান্য দেশ দেরিতে নিয়েছে। সুতরাং এটা বলা যায়, বাংলাদেশ যা করেছে তা দক্ষিণ এশিয়ার দেশের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কাছাকাছি।
মহামারী ব্যবস্থাপনা রাখার পরামর্শ : অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রথমদিকে একটু সমস্যা হয়েছিল। যখন রোগী বাড়তে থাকল, তখন হাসপাতাল পাওয়া যাচ্ছিল না, প্রশিক্ষিত চিকিৎসা জনশক্তি ছিল না, আইসিইউ সেবা কম ছিল। কিন্তু পরে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়েছে এবং ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের একটা পর্যায়ে এসেছে। চিকিৎসা সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা যুক্ত হলো। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ন্ত্রণে খুব যে খারাপ করেছে বলা যাবে না। ভালোই করেছে। তবে অনেক ঘাটতি ছিল। সুতরাং এখান থেকে আমাদের উচিত শিক্ষা নেওয়া। এটাই শেষ প্যানডেমিক বা মহামারী নয়। এখন বার্ড ফ্লু দুয়ারে কড়া নাড়ছে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ ব্যবস্থা নিচ্ছে। করোনা থেকে শিক্ষা নিয়ে যে সব জায়গায় ঘাটতি, সেগুলো পূরণে সচেষ্ট হওয়া দরকার।’
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘করোনা মোকাবিলায় আমরা যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিস্তৃত করেছি, সেটা গুটিয়ে আনা ভালো হবে না। পরীক্ষার সুযোগ-সুবিধিা টিকিয়ে রাখতে হবে। আরটিপিসিআর ব্যবস্থ্য, হাইফ্লো অক্সিজেনব্যবস্থা, আইসিইউ এগুলো টিকিয়ে রাখতে হবে। সামনের দিকে এগোতে হবে। যত স্বেচ্ছাসেবক কর্মী তৈরি হয়েছে, তাদের রাখতে হবে। স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এদের আত্তীকরণ করতে হবে। এদের যেন মাঝে মাঝে কাজে লাগানো যায়, সে ব্যবস্থা রাখতে হবে। করোনা মহামারী মোকাবিলার ব্যবস্থা যেন সরকার কোনোভাবেই ফেলে না রাখে।’