মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময় মহান আল্লাহ কর্র্তৃক বান্দার ওপর ফরজ করা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান হলো রোজা। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারো।’ সুরা বাকারা : ১৮৩
বর্ণিত আয়াতে আল্লাহ ইমানদারদের আহ্বান করে বিভিন্নভাবে তাদের এই ইবাদতের মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এর কয়েকটি হলো আল্লাহতায়ালা এই ইবাদতকে পূর্ববর্তী সব উম্মতের ওপর ফরজ করেছেন। এতে রয়েছে এই ইবাদতকে ধারণ করার প্রতি উৎসাহ, তার ফজিলত ও মর্যাদার প্রতি জোরদান, তা আদায়ে অগণিত কল্যাণ লাভের প্রতি ইঙ্গিত এবং রোজা ও রোজা পালনকারীর প্রতি আল্লাহর ভালোবাসার প্রমাণ।
মহান আল্লাহ বান্দার ওপর রোজা ফরজের কারণ হিসেবে তাকওয়াকে নির্ধারণ করেছেন। তাকওয়া অবলম্বন করা আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি তার উপদেশ। ইরশাদ হয়েছে, ‘আসমানে যা আছে ও জমিনে যা আছে সব আল্লাহরই, আর তোমাদের আগে যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের এবং তোমাদের আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো।’ সুরা আন নিসা : ১৩১
কোরআন মাজিদের অসংখ্য আয়াতে আলোচিত হয়েছে, একমাত্র মুত্তাকিদের থেকেই তাদের সৎ আমলগুলো কবুল করা হবে ও পরকালে তারাই মুক্তি পাবে। যেহেতু রোজা তাকওয়া অর্জনের অন্যতম মাধ্যম, তাই তিনি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সব বান্দার ওপর এটাকে ফরজ করেছেন। তিনি এই ইবাদতের ক্ষেত্রে এমন প্রতিদান নির্ধারণ করেছেন, যা প্রমাণ করে, তিনি এটাকে ভালোবাসেন এবং রোজা পালনকারীরা দুনিয়া ও আখেরাতে এমনসব ফজিলত লাভ করবেন, যা তাদের আনন্দিত করবে ও অধিক পরিমাণে এই ইবাদত পালনে উৎসাহিত করবে।
হাদিসে কুদসিতে এসব ফজিলতের কিছু বর্ণিত হয়েছে, যা হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহতায়ালা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘রোজা ছাড়া আদম সন্তানের প্রতিটি কাজই তার নিজের জন্য, কিন্তু রোজা আমার জন্য। তাই আমি এর প্রতিদান দেব।’ অতঃপর রাসুল (সা.) বলেন, ‘রোজা ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ যেন রোজা পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সঙ্গে ঝগড়া করে, তাহলে সে যেন বলে, আমি একজন রোজাদার। যার কবজায় মুহাম্মদের প্রাণ, তার শপথ! অবশ্যই রোজা পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের গন্ধের চেয়েও সুগন্ধিময়। রোজা পালনকারীর জন্য রয়েছে দুটি খুশি, যা তাকে আনন্দিত করে। যখন সে ইফতার করে, সে খুশি হয় এবং যখন সে তার রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তখন রোজার বিনিময়ে আনন্দিত হবে।’ সহিহ বোখারি ও মুসলিম
সহিহ মুসলিমের অপর বর্ণনায় এ হাদিসের অর্থ ও ব্যাখ্যা এসেছে এভাবে, ‘আদম সন্তানের প্রত্যেক সৎকর্ম কয়েক গুণ বাড়ানো হয়। একটি নেকি দশ গুণ থেকে নিয়ে সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। মহান আল্লাহ বলেন, কিন্তু রোজা ছাড়া। কেননা তা আমার জন্য। আর আমি নিজেই তার পুরস্কার দেব। সে পানাহার ও কামপ্রবৃত্তি আমার উদ্দেশ্যেই বর্জন করে।’
এখানে আল্লাহতায়ালা সংবাদ দিয়েছেন, রোজা পালনকারীর সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতশ গুণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তিনি তাকে গোপনে অগণিত প্রতিদান দান করবেন, কেননা রোজা পালনকারী তার ইবাদতকে গোপন রেখেছিল তার রবের প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে, তার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে, সওয়াবের আশায় ও তার শাস্তির ভয়ে। তার নিয়তের মাঝে কোনো লৌকিকতার মিশ্রণ ছিল না এবং সে দুনিয়ার কিছু পাওয়ার আশাও করেনি যে, মানুষরা তার প্রতি আকৃষ্ট হবে কিংবা তার প্রশংসা করবে।
হাদিসে রোজার যেসব ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, তার একটি হলো এটি ঢালস্বরূপ, তথা রোজা পালনকারীর জন্য জাহান্নাম থেকে রক্ষাকবচ। কেননা জাহান্নাম প্রবৃত্তি দ্বারা বেষ্টিত। আর পরিতৃপ্তিতে প্রবৃত্তি জেগে ওঠে। রোজা পালনকারী প্রবৃত্তিকে বর্জন করে তার শয়তান ও নফসে আম্মারাকে দুর্বল করার জন্য। সুতরাং সে তার রবের অবাধ্য হয় না। ফলে সে যেন এর মাধ্যমে পাপ থেকে বেঁচে থাকল। তাই রোজা তার জন্য দুনিয়ায় আল্লাহর অবাধ্য থেকে ঢালস্বরূপ ও পরকালে জাহান্নাম থেকে ঢালস্বরূপ।
হাদিসে উল্লিখিত আরেকটি ফজিলত হলো, রোজা পালনকারীর ইফতারের সময় ও তার রবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় আনন্দ লাভ। ইফতারের সময় আনন্দ, কেননা মানুষ স্বভাবত তার প্রয়োজনীয় আহার, পানীয় ও সহবাসের প্রতি আকৃষ্ট। তাই যখন তাকে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তা থেকে নিষেধ করা হয়, অতঃপর তার জন্য তা বৈধ করা হয় তখন তাতে সে আনন্দিত হয়।
রোজা পালনকারীর তার রবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ের আনন্দ, এটা এ জন্য যে, কিয়ামতের দিন কঠিন প্রয়োজনীয় মুহূর্তে আল্লাহর পক্ষ থেকে গচ্ছিত মহাপুরস্কার সে অর্জন করবে। হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছে, ‘কিন্তু রোজা ছাড়া। কেননা, তা আমার জন্য, আর আমি নিজেই তার পুরস্কার দেব।’ কেননা এর একটি অর্থ হলো কেউ রোজা পালনকারীর নেকি কিসাস বা অন্য কোনো কারণে নিতে পারবে না। বরং রোজা পালনকারীকে তার পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে এমনকি সে জান্নাতে প্রবেশ করে তার প্রতিদান ভোগ করবে।
রোজার আরেকটি ফজিলত হলো, রোজা পালনকারীর জন্য জান্নাতের একটি নির্দিষ্ট দরজা রয়েছে, যা দিয়ে অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। রোজার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত হলো, যে ব্যক্তি এর আবশ্যকীয়তায় বিশ্বাস করে এবং সওয়াবপ্রাপ্তির আশায় রমজানের রোজা পালন করবে ও অন্য সময় নফল রোজা পালন করবে তার জন্য ক্ষমা অবধারিত। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানসহ সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা পালন করে, তার আগের গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ সহিহ বোখারি
সহিহ মুসলিমে হজরত হুজাইফা বিন ইয়ামান (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ, নিজ সত্তা, সন্তানসন্ততি এবং প্রতিবেশীর ব্যাপারে মানুষ যে ফিতনায় আক্রান্ত হয়, রোজা, নামাজ, সদকা এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের বাধাদান এগুলোকে মিটিয়ে দেয়।’ এই হাদিসের অর্থ হলো, অধিকাংশ সময় মানুষ তার সম্পদ, সন্তান, নিজে ও তার প্রতিবেশীর ব্যাপারে পরীক্ষিত হয় ও ফেতনায় পড়ে। সে তাদের ওয়াজিব হকের ক্ষেত্রে ত্রুটি করে বা এর মাঝে মগ্ন থেকে আল্লাহর আনুগত্যের কথা ভুলে যায়। সুতরাং এমন কিছু তার দ্বারা সংঘটিত হলে তখন রোজা হবে তার জন্য কাফফারাস্বরূপ।
বলা হয়, ওই ব্যক্তিই তার রোজার অধিক সংরক্ষণকারী যে স্বীয় জিহ্বার অধিক হেফাজতকারী, যে স্বীয় রবের আনুগত্যে ব্যস্ত ও অনর্থক বিষয় বর্জনকারী। এ জন্য নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন রোজা পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা আর মূর্খতা পরিত্যাগ করল না আল্লাহর কাছে তার পানাহার ত্যাগের কোনোই প্রয়োজন নেই।’ সহিহ বোখারি
বর্ণিত হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহতায়ালা রোজা পালনকারী থেকে শুধু বৈধ বিষয় তথা আহার, পানীয় ও সহবাস বর্জন চাননি। বরং তিনি চান, সে সব ধরনের সত্য বর্জিত হারাম কথা যেমন মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, মিথ্যা বলা, গিবত ও পরনিন্দা চর্চা করা ইত্যাদি পরিত্যাগ করবে। প্রত্যেক মিথ্যার অন্তর্গত কাজ যেমন ব্যবসা ও লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতারণা এবং হারাম বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত ত্যাগ করবে। সব ধরনের নির্বুদ্ধিতা যেমন গালাগাল, অপবাদ দেওয়া এবং অশ্লীল ও নোংরা কথা বর্জন করবে। সুতরাং যে ব্যক্তি রোজা পালনরত অবস্থায় এসব কাজ পরিত্যাগ করবে সে রোজার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবে এবং কল্যাণ লাভ করবে। ফলে সে নিষ্কলুষ হবে, তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আল্লাহর প্রিয় বিষয়ের দিকে সঞ্চালিত হবে এবং তার আত্মা আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে ধাবিত হবে। ফলে সে ইবাদতের স্বাদ ও সান্নিধ্য পাবে এবং তা পালনে মজা অনুভব করবে।
১৭ মার্চ মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা।
অনুবাদ মোহাম্মদ আতিকুর রহমান