ওয়াটার গ্রিডের কথা ভাবছে সরকার : তাজুল

দেশ রূপান্তর : দেশে সুপেয় পানির তীব্র সংকট চলছে। উত্তরণে সরকার কী করছে?

মো. তাজুল ইসলাম : সরকার প্রায় ৯৯ ভাগ মানুষকে পানি সরবরাহের আওতায় আনতে পেরেছে। তবে সুপেয় পানির সংকট রয়েছে, এটা সত্য। দেশের সব এলাকার মানুষের সুপেয় পানি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সব এলাকায় প্রয়োজনের আলোকে নিরাপদ পানির উৎস না থাকায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। এ জন্য ওয়াটার গ্রিড স্থাপনের কথা ভাবছে সরকার। তাই পানির ইনটেক পয়েন্ট অনুসন্ধানের কাজ শুরু হয়েছে। পদ্মায় দুটো ইনটেক পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। মেঘনাতেও দুটো ইনটেক পয়েন্ট পাওয়া গেছে। মিরসরাইতে পানি দেওয়া হবে মেঘনা থেকে। এজন্য প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে আমাদের দেশে প্রচুর শিল্প হবে। এসব শিল্পের জন্য বিদ্যুৎ, গ্যাসের পাশাপাশি পানিও লাগবে। এজন্য ওয়াটার গ্রিড স্থাপন করার বিষয়ে ভাবছি আমরা। যেখানে সুপেয় পানির উৎস আছে, সেখান থেকে পানি নিয়ে যেখানে কম সেখানে দেওয়া হবে। গ্রিডলাইন থাকলে এক জায়গায় কম পড়লে, অন্য জায়গা থেকে সেখানে সেটা দেওয়া সম্ভব হবে।

দেশ রূপান্তর : এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ২০৩০ সালের সুপেয় পানি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কতটুকু সম্ভব?

মো. তাজুল ইসলাম : টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার সব নাগরিককে সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। সরকারের নেতৃত্বে গ্রাম থেকে শহর পর্যায়ে সবার জন্য পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে সুপেয় পানি নিশ্চিত করার বিষয়ে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এরই মধ্যে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সামনে এগোচ্ছে সরকার। গত সোমবার পানিবিষয়ক একটি সেমিনারে অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে বলা হয়েছে, এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমাদের কাজের গতি বাড়াতে হবে। যেসব খাতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার, আমরা সেখানে বিশেষ গুরুত্ব দেব। তবে করোনা পরিস্থিতি ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এশিয়ার অনেক দেশ এবং ইউরোপেরও অনেক দেশ এসডিজির সুপেয় পানি সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এটা অর্জনে আমরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব।

দেশ রূপান্তর : আর্সেনিক সমস্যার সমাধানে সরকারের কী কোনো কার্যক্রম রয়েছে?

মো. তাজুল ইসলাম : নানা কারণে পানির মানের তারতম্য হয়। বাংলাদেশে পানি সরবরাহ সেবা নিশ্চিত করতে এককভাবে সরকারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আমাদের আপস্টিম যে নদীগুলো এসেছে সেখানে পানি সরবরাহ কমে গেলে পানির স্তর নিচে নেমে যায়। তখন নানাভাবে পানি দূষিত হয়। সালফার, আর্সেনিক, কপার ইত্যাদির পরিমাণ পানিতে বেড়ে যায়। এখান থেকে উত্তরণ ঘটাতে সময়ের প্রয়োজন। পরিবেশ, পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করা হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় পানির সুপেয় উৎস না থাকলে বিকল্প উপায়ে সরবরাহ করা হবে। সেটা হতে পারে ওয়াটার গ্রিড পদ্ধতিতে। এ জন্য আরও সময়ের প্রয়োজন রয়েছে।

দেশ রূপান্তর : ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-তে দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকাকে সুপেয় পানির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওইসব এলাকায় সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যাপারে সরকারের কোনো উদ্যোগ আছে?

মো. তাজুল ইসলাম : বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডেল্টা (ব-দ্বীপ) এলাকা। ডেল্টা অঞ্চলের অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ২১০০ সাল পর্যন্ত মেয়াদের জন্য ব-দ্বীপ পরিকল্পনা করা হয়েছে। ওই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অর্থ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য দুটোর সমন্বয় করে কাজ করছে সরকার। এভাবে কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে সময়ের ব্যবধানে সব এলাকার মানুষকে সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

দেশ রূপান্তর : ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। প্রতিকারে সরকারের ভাবনা কী?

মো. তাজুল ইসলাম : পানি পেতে বাংলাদেশ বেশির ভাগই ভূ-গর্ভস্থ উৎসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর সারফেস (ভূ-উপরিস্থ) উৎস থেকে পানি সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ঢাকা ওয়াসার মাধ্যমে সায়েদাবাদে দেশের প্রথম ওয়ার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ শুরু করে। সেখানে ১ ও ২ নম্বর ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়। সেখানে ৩ নম্বর প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য কাজ চলছে। মেঘনা থেকে পানি আনতে গন্ধপুরে এবং পদ্মা নদী থেকে পানি আনতে যশলদিয়ায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এর বাইরেও বেশ কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামেও কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এসডিজির চাহিদা অনুযায়ী ৭০ ভাগ সারফেস (ভূ-উপরিস্থ) উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে হবে। সেটা কার্যকর করতে হলে বড় বিনিয়োগ করতে হবে এ খাতে। পাশাপাশি সহজে পানিপ্রাপ্তিরও ব্যাপার রয়েছে। পানির উৎস থাকতে হবে।

দেশ রূপান্তর : কৃত্রিমভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ভরাটের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে আপনার চিন্তা কী?

মো. তাজুল ইসলাম : কৃত্রিমভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর পূরণ করা কতটুকু সম্ভব সেটা আমার বোধগম্য নয়। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিলেই তো হবে না। বাস্তবতাও বিবেচনা করতে হবে। আমাদের মতো দেশের সে সক্ষমতা আছে কি না, সেটাও ভাবতে হবে। এটা করতে হলে ব্যাপক পরিমাণ বাজেট দরকার, বর্তমান বাস্তবতায় সেটা কতটুকু সম্ভব।