পুকুর খননের নামে বালু উত্তোলন, বিলীনের পথে ৩৫ হিন্দু বাড়ী

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায় সামসুজ্জামান মানিক নামে কথিত এক আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে পুকুর খননের নামে নদী থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। নদী থেকে অবৈধ ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর পাশে অবস্থান করা ৩৫টি হিন্দু পরিবারের বসতবাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে চলে এসেছে।

ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছে।

তবে অভিযুক্ত সামসুজ্জামান মানিক নিজেকে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতা দাবি করলেও উপজেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাকে চেনে না। আর উপজেলা প্রশাসন থেকে অনুমতি নিয়েই পুকুর খনন করছেন বলে দাবি করেছেন কথিত আওয়ামী লীগ নেতা সামসুজ্জামান মানিক।

সম্প্রতি ঘোড়াঘাটের পৌর এলাকার লালমাটি গ্রামের ৩টি হিন্দু পরিবার জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। আর সেই অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সুপারিশ করেছেন দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর পানিতে একটি ড্রেজার মেশিন রাখা আছে। নদীর পাড়েই হিন্দু সম্প্রদায়ের আবাদি জমি ও ফলের বাগানসহ তাদের বসবাসের ঘরবাড়ি। নদীর পাশেই বিশাল একটি জায়গায় কয়েক হাজার ট্রাক বালু স্তূপ করে রাখা আছে। সেখানে এস্কেভেটরের সাহায্য ৫ থেকে ৭টি ছোট ছোট ট্রাকে বালুগুলো উঠানো হচ্ছে। এসব ট্রাকে বালু যাচ্ছে আশপাশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়।

বালু বোঝাই এসব ট্রাক গ্রামের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার ফলে রাস্তায় লালমাটির বালুর সৃষ্টি হচ্ছে। এতে যাতায়াতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে গ্রামবাসীদের। এ ছাড়া রাস্তার এসব লাল বালু বাতাসে উড়ে রাস্তার পাশের আম ও লিচুর গাছ লাল হয়ে যাচ্ছে। মরে যাচ্ছে আম-লিচুর মুকুল। ফলে লোকসানের শঙ্কায় বাগান মালিকরা।

জানা গেছে, নিজেকে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতা দাবি করা সামসুজ্জামান মানিকের বাবা জহুরুল হক একজন জামায়াত নেতা। তিনি নিজেকে আওয়ামীলীগ নেতা বলে দাবি করলেও, ভুক্তভোগী এবং স্থানীয় আওয়ামীলীগের অভিযোগ মানিক ও তার পরিবার বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত। তার বাবা সাবেক জামায়াত নেতা জহুরুল হক মাওলানা নাশকতা ও অর্থ আত্মসাৎসহ বেশ কয়েকটি মামলায় সাজা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় গত বছর পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে দিনাজপুর জেলা কারাগারে রয়েছেন।

অভিযোগকারী অসহায় হিন্দু পরিবারগুলোর দাবি, ৩ বছর আগে মানিক ও এতাউল নামের দুজন ব্যক্তি নদীর পাড়ে কিছু জমি কিনে নেয়। এরপর তারা ব্যক্তিগত জমিতে পুকুর খননের নামে সেখানে দুটি ভারী ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন শুরু করে। এর কিছুদিন পর নিজের পুকুরের জায়গার বাইরে নদীতে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন শুরু করেছেন। আর নদী থেকে উত্তোলিত বালু নিজের কেনা জমিতে স্তূপ করে বিক্রি করছেন।

২০২২ সালের জুলাইতে স্থানীয়রা লিখিত অভিযোগ দিলে ওই মাসে স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশে সেখানে অভিযান চালিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে উপজেলা প্রশাসন। এরপর আবারও ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বালু উত্তোলন শুরু করে এই নেতা।

নদী গর্ভে বিলীন হবার শঙ্কায় থাকা দেওয়া বিশ্বনাথ রায় বলেন, ‘নদীর পাড়ের কিছু আবাদি জমি ও বসতভিটা ছাড়া আমাদের কিছু নেই। নদীর গভীর থেকে নিয়মিত বালু তোলা হচ্ছে। বর্ষাকালে আমাদের বাড়িঘরসহ সবকিছু নদীতে তলিয়ে যাবে। আমরা একাধিকবার অভিযোগ দিয়েছি। প্রশাসন এসে বন্ধও করে দিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার জোরে মানিক আবারও বালু উত্তোলন শুরু করে। আমাদের শেষ সম্বল ভিটেমাটি রক্ষা করতে আমরা সংখ্যালঘু লোকজন প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগ নেতা বলেন, ‘মানিক কোন সময় আওয়ামীলীগ করত না। তাকে কোন দিন দলীয় মিছিল মিটিং এ দেখা যায়নি। তার বাবা জামায়াতের তুখোড় নেতা ছিলেন। মামলা থেকে বাঁচতে সে এখন আওয়ামীলীগ সাজার চেষ্টা করছে। আর স্থানীয় কিছু পাতি নেতা ও আওয়ামীলীগে অনুপ্রবেশকারী টাকা খেয়ে মানিককে নেতা বানানোর চেষ্টায় মেতে আছে।’

ঘোড়াঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং বুলাকীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সদের আলী খন্দকার বলেন, ‘আমি মানিককে কোন দিন কোন দলীয় প্রোগ্রামে দেখিনি। আওয়ামী লীগের কোন পদপদবিতেও তিনি নেই।’

অভিযুক্ত সামসুজ্জামান মানিক বলেন, ‘আমি আমার নিজের জমিতে পুকুর খনন করছি। উপজেলা প্রশাসন থেকে আমি পুকুর খননের লিখিত আদেশ নিয়ে এসেছি। হিন্দু পরিবারের দু'একজন আমাকে নিয়ে চক্রান্ত করছে।’

ঘোড়াঘাট পৌরসভার মেয়র আব্দুস সাত্তার মিলন বলেন, ‘এর আগে আমার কাছে অভিযোগ এসেছিলো। প্রশাসনের সহযোগিতায় বালু উত্তোলন আমি বন্ধ করে দিয়েছিলাম। নতুন করে অভিযোগ পেলে আবারও ব্যবস্থা নেব।’

এদিকে ঘোড়াঘাট উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘পুকুর খননের বা শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। এটি কেবলমাত্র জেলা প্রশাসক দিতে পারে। তবে এই বালু উত্তোলনের বিষয়ে আমি জানি না। তিনি যদি অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন করে, তবে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’