অব্যাহত ডলার সংকট কাটাতে প্রতিনিয়তই বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে দেশের রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বাড়লেও রিজার্ভের খরা কাটছে না। এমনকি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রথম কিস্তির ঋণ বাবদ ডলার পাওয়ার পরও উল্টো পথে হাঁটছে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সূচক। গত একমাসে রিজার্ভ থেকে কমেছে অন্তত এক বিলিয়ন ডলার। এ নিয়ে চলতি অর্থবছরের রিজার্ভ থেকে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার বিক্রয় করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডলার সাশ্রয়ী নানা পদক্ষেপের পরেও সর্বশেষে গতকাল (২৭ মার্চ) বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। যা গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ছিল ৩২ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে রিজার্ভ কমেছে ১ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার। যদিও গত বছরের জুলাই শেষে রিজার্ভ ছিল ৪১ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে প্রায় নয় মাসে রিজার্ভ কমেছে ১০ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছর বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছিল বাংলাদশ ব্যাংক।
ব্যাংকারদের মতে, বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে স্বস্তি ফেরাতে আমদানি কমানোর উদ্যোগের মধ্যেও সংকট যায়নি। নতুন এলসি কমলেও আগের দায় পরিশোধের চাপ রয়েছে বিদেশি মুদ্রাবাজারে। এ কারণে সংকট কাটছে না অর্থনীতিতে। তবে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা উদ্যোগের কারণে দ্রুত সময়ের মধ্যে ডলার সংকট কেটে যাবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী জ¦ালানি ও নিত্যপণ্য আমদানির জন্য ডলার বিক্রি অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে অর্থবছরের নয় মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে ৩১ বিলিয়নের ঘরে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, ‘দেশে ডলারের সংকট চলছে। এরপরও নিত্যপণ্যের আমদানি দায় মেটাতেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে প্রতিনিয়ত ডলার সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডলার সংকটে আমদানিকারকদের চাহিদা মেটাতে চলতি অর্থবছরে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।’
জানা গেছে, গতবছরের ১ মার্চ দেশের রিজার্ভ ছিল ৪৫ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের শুরুতে তা নেমে দাঁড়ায় ৪১ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারে। চলতি বছরের প্রথম মাস তথা জুলাই শেষে রিজার্ভ ছিল ৩৯ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার ও তার পরের মাস অর্থাৎ আগস্টে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক শূণ্য ৭ বিলিয়ন ডলার। একইভাবে সেপ্টম্বর ও অক্টাবরে যথাক্রমে কমে হয়েছে ৩৬ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ও ৩৫ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার। আর নভেম্বর মাসে রিজার্ভ ছিল ৩৩ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ও ডিসেম্বরে এসে আরও কমে হয় ৩৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। এরপরে জানুয়ারি মাসে রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার। তবে গত ২ ফেব্রুয়ারি আইএমএফের ঋণের প্রথম কিস্তি বাবাদ ৪৭৬ দশমিক ১৭ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা হয়েছে। এতে ওইদিন রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত বছরের শুরু থেকে দেশের রপ্তানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় বাড়তে থাকে। বিশেষ করে মার্চে রেকর্ড ৯৮০ কোটি ডলারের এলসি বা ঋণপত্র খোলে আমদানিকারকরা। দ্রুত বাড়তে থাকা চাহিদার বিপরীতে ডলার সংকট তৈরি হলে তা কাটাতে অপেক্ষাকৃত কম প্রয়োজনীয় ও বিলাসী পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণে গতবছরের এপ্রিলে কড়াকড়ি আরোপ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই মাসে এলসি বা ঋণপত্র খোলা হয়েছিল ৮৪২ কোটি ডলারের। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে কমতে থাকে আমদানি ব্যয়। নভেম্বরে তা কমে দাঁড়ায় ১২২ কোটি ডলারে।
সরকারের এমন পদক্ষেপে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে আমদানির এলসি খোলা কমেছে ২৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এলসি খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫৯ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। আমদানি ব্যয়ে লাগাম টানায় এক বছরের ব্যবধানে এলসি খোলার পরিমাণ কমেছে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার।