রাজধানীর মহাখালীর সাততলা বস্তি এবং ওয়ারীর সুইপার কলোনিতে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। রবিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে সুইপার কলোনিতে এবং গতকাল সোমবার সকাল পৌনে ৭টার দিকে সাততলা বস্তিতে পৃথক অগ্নিকা-ের ঘটনা দুটি ঘটে। আগুনে সুইপার কলোনির ২০টি এবং সাততলা বস্তির ১৫০টি ঘর পুড়ে গেছে। সাততলা বস্তির ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও সুইপার কলোনির আগুনে শিশুসহ সাতজন দগ্ধ হয়েছে। তাদের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে।
সাততলা বস্তিবাসীর তথ্যমতে, গতকাল সকাল ৬টা ৪৮ মিনিটের দিকে বস্তির এক কোণে দোতলা একটি ঘর থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। মুহূর্তে ধোঁয়া ও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তখনো বস্তির অধিকাংশ বাসিন্দা ঘুমাচ্ছিলেন। যে ঘরে আগুন ধরে, সেই ঘরের বাসিন্দাদের চিৎকারে সবার ঘুম ভাঙে। বস্তির বাসিন্দারা চেষ্টা করেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হন। এরই মধ্যে খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে এর আগেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় একতলা, দোতলাবিশিষ্ট অনেক ঘর।
বুয়ার কাজ করেন জুলেখা বেগম। বস্তির একটি ঘরে স্বামী-সন্তান নিয়ে ভাড়া থাকেন। সকালে কাজে যাওয়ার জন্য ঘুম থেকে উঠতেই চিৎকার শুনতে পান। দেখেন, তার ঘরের কাছাকাছি একটি ঘরে আগুন ধরে গেছে। স্বামী-সন্তানকে জাগিয়ে খালি হাতেই ঘর থেকে বের হয়ে যান তিনি। রবিবার রাতে স্বামী কাজের সাড়ে ৪০০ টাকা এনে তার হাতে দিয়েছিলেন। সেই টাকাও নিতে পারেননি। শুধু বিছানার ওপর থেকে বাটন মোবাইলটা হাতে নিতে পেরেছেন। জুলেখার ধারণা, বস্তির অনেকে আশপাশে বুয়ার কাজ করেন। তারা সকাল সকাল শিশুসন্তানদের জন্য রান্না করে রেখে যান। তেমনি কোনো একটি ঘরে রান্না করার সময় এ ঘটনা ঘটতে পারে। তবে যে ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত, সেই ঘরের গ্যাসের চুলা রয়েছে বলে জানিয়েছেন জুলেখাসহ একাধিক বস্তিবাসী। তাদের ধারণা, হয়তো চুলার লাইন লিকেজ ছিল কিংবা চুলা থেকেই আগুন লাগতে পারে।
ছায়েরা বেগম নামের আরেক বাসিন্দা জানান, গ্যাসের লাইন অফ করো, গ্যাস অফ করো এমন চিৎকারে তার ঘুম ভাঙে। ঘর থেকে বের হতেই দেখেন দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তিনিও হাতের কাছে যা ছিল তা নিয়েই ঘর থেকে এক কাপড়ে বেরিয়ে যান।
ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা বলছিলেন, ঘুমে থাকার কারণে তারা কোনো মালামালই বের করতে পারেননি। কেবল হাতে বহন করা যায়, এমন মালামাল নিয়ে এক কাপড়ে বেরিয়ে গেছেন। ভোরবেলায় হালকা বাতাস থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে বস্তিতে অবৈধ গ্যাস, বিদ্যুতের লাইন রয়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক বস্তিবাসী।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, তখনো পুড়ে যাওয়া ঘর থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। বস্তির ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা পোড়া টিন, খাট, আসবাব বের করার চেষ্টা করছেন। বস্তির অধিকাংশ ঘরই দোতলাবিশিষ্ট। একটি ঘরের মধ্যে বেশ কয়েকটি কক্ষও রয়েছে। মূলত চতুর্দিক ইটের দেয়াল আর ওপরে টিন, আর ঘরের ভেতরের কক্ষগুলো কাঠ দিয়ে সাজানো। রয়েছে হরেক রকমের আসবাবও। পুড়ে যাওয়া একটি ঘরের ভেতরে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের ‘কিশোর-কিশোরী ক্লাব স্থাপন প্রকল্পের’ কয়েক শ সনদ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। অধিকাংশ সনদের কিছু অংশ পুড়ে গেছে। আবার অনেকগুলো বান্ডিল আকারে পড়ে রয়েছে। কেউ টিন আর পলিথিন দিয়ে সনদগুলো ঢেকে রেখেছেন, যাতে কারও নজরে না পড়ে। মূলত কিশোর-কিশোরী ক্লাব স্থাপন প্রকল্পের অধীনে এক বছরের জন্য যেসব কিশোর-কিশোরী দক্ষতামূলক প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা নিয়ে থাকে, কোর্স সম্পন্ন হওয়ার পর তাদের মহিলা অধিদপ্তর থেকে এই সনদ দেওয়া হয়। কিন্তু বস্তিতে পুড়ে যাওয়া এবং ভালো সদনগুলোতে কোনো প্রশিক্ষণার্থীর নাম-পরিচয় উল্লেখ নেই। নাম-ঠিকানার জায়গা খালি রয়েছে। অথচ প্রতিটি সনদে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফরিদা পারভীন এবং কিশোর-কিশোরী ক্লাব স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক মো. তরিকুল আলমের স্বাক্ষর রয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয়, বস্তির কোনো একটি চক্র এই সনদগুলো সংগ্রহ করে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে আসছিল। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের জোন কমান্ডার আব্দুল আলিম জানান, সাততলা বস্তিতে আগুন লাগার খবরে হেডকোয়ার্টার্স, মহাখালী, বনানী থেকে ৯টি ইউনিটের প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। প্রাথমিকভাবে আগুন লাগার কারণ জানা যায়নি। তবে আগুনে বস্তির অনেক টিনশেডের ঘর পুড়ে গেছে। আগুনে কয়েক শ ঘর পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ওই বস্তির বাসিন্দারা। তবে কন্ট্রোল রুমের ডিউটি অফিসার খালেদা ইয়াসমিন জানান, তাদের হিসাবে আগুনে ১৫০টি ঘর পুড়ে গেছে।
এদিকে, অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতি পরিবারকে ৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম। ডিএনসিসি জনসংযোগ কর্মকর্তা মকবুল হোসাইন জানান, অগ্নিকান্ডের ঘটনা জানার পর মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম সার্বক্ষণিক তদারকি করেছেন। তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে অগ্নিকা-ের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রণয়ন করে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে ৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া অগ্নিকান্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের নির্দেশও দিয়েছেন।
সুইপার কলোনিতে আগুন : সাততলা বস্তির আগুনের আগে রবিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে ওয়ারীর জয়কালী মন্দিরের হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে সুইপার কলোনিতে আগুন লাগে। এতে নারী-শিশুসহ সাতজন দগ্ধ হয়েছেন। দগ্ধ ব্যক্তিরা হলেন ৬৫ বছর বয়সী গীতা রানী দে, ৬০ বছর বয়সী কান্তা রানী, ৩৬ বছর বয়সী রাজু ও ৫২ বছর বয়সী আফজাল হোসেন, ৭ বছর বয়সী কৃষ্ণ, ২৭ বছর বয়সী শান্তি এবং ৩ বছর বয়সী লক্ষ্মণ। তাদের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে।
ডিউটি অফিসার খালেদা ইয়াসমিন জানান, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে ওই কলোনিতে রবিবার রাত ৩টা ২০ মিনিটে আগুন ধরার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে ভোররাতের দিকে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. বাচ্চু মিয়া জানান, দগ্ধ অবস্থায় চারজনকে উদ্ধার করে বার্ন ইনস্টিটিউটে নিয়ে এসে অবজারভেশনে রাখা হয়েছে। তাদের চিকিৎসা চলছে। একই ঘটনায় তিনজনকে দগ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলের বার্নে নিয়ে আসা হয়েছে। তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিসের ধারণা, সিগারেটের আগুন বা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে সুইপার কলোনির আনুমানিক ২০টি টিনশেড ঘরে আগুন লেগেছিল। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় পাশের কয়েকটি মুরগির দোকান। আগুনে ফ্লাইওভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তাও পরীক্ষা করে দেখা হবে বলে জানান তারা।
বাটা সিগন্যালে বহুতল ভবনে আগুন : রাজধানীর বাটা সিগন্যাল এলাকার শেলটেক কম্পিউটার সিটি ভবনে আগুন লেগে কয়েকটি দোকান পুড়ে গেছে। ভবনটির পঞ্চমতলায় লাগা আগুনে তিনটি দোকান পুরোপুরি পোড়ার পাশাপাশি আরও কয়েকটি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সেখানে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট আগুন নেভাতে কাজ করে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় রাত সাড়ে ৯টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেটর) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, নয়তলা ভবনটির পঞ্চমতলায় আগুন লাগে। আগুন অন্য কোনো তলায় ছড়াতে পারেনি। তার আগেই নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। এতে তিনটি কম্পিউটার ও এর যন্ত্রাংশের দোকান ব্যাপকভাবে পুড়ে গেছে। এ ঘটনায় একজন সামান্য আহত হয়েছেন জানিয়ে ফায়ার সার্ভিসের এ কর্মকর্তা বলেন, অন্য কারও দগ্ধ বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
বাটা সিগন্যাল মোড় থেকে শাহবাগের দিকে কিছুটা এগোলে হাতের ডান দিকেই রাস্তার পাশে নয়তলা শেলটেক কম্পিউটার সিটি ভবন। এর পাঁচতলা পর্যন্ত দোকান। তার ওপরের তলাগুলো আবাসিক। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আগুন লাগার পর পাঁচতলা থেকে নিচের তলার লোকজন দ্রুত নেমে আসেন। আর ওপরের তলাগুলোর বাসিন্দারা ছাদে চলে যান।
ওই ভবনের দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন বলেছেন, পাঁচতলায় একটি মোবাইল সার্ভিসিংয়ের দোকানে আগুন লাগে, পরে তা পাশের কয়েকটি দোকানে ছড়িয়ে পড়ে।