সভ্যতার আড়ালে বন্দুক সহিংসতা

যুক্তরাষ্ট্রের বন্দুক সহিংসতা কোনো নতুন সমস্যা নয়, তবে তা কখনো সমাধান হয়নি। একদিকে ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান দুটি দল জরুরি সামাজিক এ সমস্যাকে দলীয় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আর অন্যদিকে লবিস্টদের প্রভাবে মার্কিন বন্দুক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির বহু বছর ধরে কোনো অগ্রগতি হয়নি। অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় বছরের জানুয়ারিতে বন্দুক সহিংসতায় রেকর্ড গড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ৩১ জানুয়ারি দেশটির গান ভায়োলেন্স আর্কাইভ জানায়, ওই মাসের ২৯ তারিখ পর্যন্ত দেশটিতে ৪৪টি বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে। ২০১৪ সালের পর আর কোনো বছর জানুয়ারিতে এত বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সহিংসতা নিয়মিত বিষয় হয়ে উঠেছে। নতুন বছরের শুরুটাও হয় বন্দুক হামলা দিয়ে। জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে শুধু ক্যালিফোর্নিয়াতেই অন্তত তিনটি বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ২০ জন প্রাণ হারায়। শুধু তা-ই নয়, ৩০ জানুয়ারি একই দিন টেক্সাস, ইলিনয় ও আলাবামা অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে। দেশটির গণমাধ্যম জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো জায়গাই এখন আর নিরাপদ নয়। আগ্নেয়াস্ত্র সংক্রান্ত ঘটনায় প্রতিদিনই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, আহত হচ্ছে দুই শতাধিক। এমনকি আমেরিকান শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ আগ্নেয়াস্ত্র বলে গান ভালোলেন্স আর্কাইভের তথ্যে উঠে এসেছে।

মহামারী দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায়, সামাজিক চাপ তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, জাতিগত বিদ্বেষের মামলা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রে পদ্ধতিগত বর্ণবাদের সমস্যাও বাড়ছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ স্তরের রাজনীতিবিদ, কিছু সেলিব্রিটি এবং পণ্ডিত বর্ণবাদী মন্তব্য প্রকাশ আমেরিকান সমাজ আরও বিভক্ত হয়ে পড়েছে, দ্বন্দ্ব আরও গভীর হয়েছে এবং জাতিগত বিদ্বেষের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।

শুধু তাই নয়, আমেরিকায় অপ্রতিরোধ্য গতিতে বেড়ে চলেছে ম্যাস শুটিংয়ের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা। এভাবে অযাচিত বন্দুক ব্যবহারের বাতিক অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এর পরিণতি কী হতে পারে তা নিয়ে চিন্তিত সেখানকার বিশ্লেষকরা! অনেক আমেরিকানই তাদের অস্ত্র বহনের অধিকারকে পবিত্রতা হিসেবে বিবেচনা করে। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বর্তমানে নতুন ক্রেতার পরিমাণই বেশি এবং অনূর্ধ্ব ২১ বছর বয়সীদের দ্বারাই অপরাধ বেশি সংঘটিত হচ্ছে। তাই ১৮-২০ বছর বয়সী আমেরিকানের কাছে অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে তাদের যাচাই করার আইন জারি করা হয়েছে। আইনটি প্রতিটি অঙ্গরাজ্য মানতে শুরু করলেও, ক্যালিফোর্নিয়া আদালতের মাধ্যমে এটি বাতিল করে। ফলে অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের জন্যও আইনটি হুমকির মুখে পড়েছে। আমেরিকায় স্কুল, পার্ক, রাস্তা, রেস্তোরাঁ, উপাসনালয়, এমনকি বাসা সবখানেই যেন নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগ হানা দিচ্ছে। কারণ, স্থান-কাল নির্বিশেষে প্রতিনিয়ত আগ্নেয়াস্ত্র হামলায় অহরহ মানুষ আহত বা নিহত হচ্ছে।

তা ছাড়া অনেকেই বলছেন, স্কুল, সরকারি অফিস, হাসপাতাল ও পরিবহনে বন্দুক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হোক। কিন্তু সমীক্ষায় দেখা যায়, যেসব জায়গায় বন্দুকের ব্যবহার কম, সেখানে সহিংসতার হার বেশি। চারপাশে এত এত বন্দুক-সহিংসতার ঘটনা বিবেচনায় এনে কঠোর বন্দুক আইন প্রয়োগ করা জরুরি। ২০২২ সালের অক্টোবরে গ্যালাপের একটি জরিপে দেখা যায়, ৫৭ শতাংশ আমেরিকান এমনটাই ভাবছে। তবে ৩২ শতাংশ আমেরিকান বর্তমান আইনগুলোকে বহাল রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করেছে। ১০ শতাংশ আমেরিকানের মত বন্দুক আইন আরেকটু শিথিল করা হোক। বন্দুক আইনের ব্যাপারে কূটনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ জনতা সবার মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। গ্যালাপের আরেকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৯১ শতাংশ ডেমোক্র্যাট কঠোর বন্দুক আইনের পক্ষে থাকলেও, মাত্র ২৪ শতাংশ রিপাবলিকান তাদের সঙ্গে একমত পোষণ করেছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের একটি স্কুলে বন্দুকধারীদের গুলিতে অন্তত ১৯টি শিশুসহ একুশজন নিহত হয়েছে। তবে হামলাকারী কেন এই ঘটনা ঘটিয়েছে তা এখনো পরিষ্কার নয়।

অন্যদিকে যেসব শিশু মারা গেছে তাদের বয়স ছিল সাত থেকে দশ বছরের মধ্যে এবং তারা দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রেডের শিক্ষার্থী ছিল। দেশটিতে বন্দুক-সহিংসতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান আলোচনার মধ্যেই এ ঘটনা ঘটল। অবশ্য এ ধরনের ঘটনা এড়াতে একটি গ্রহণযোগ্য বন্দুক নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। বিশেষ করে স্কুলে এভাবে গুলির ঘটনা দেশটিতে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। শিক্ষাবিষয়ক একটি প্রকাশনার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরেই এ ধরনের অন্তত ২৬টি ঘটনা ঘটেছে। এমনকি স্কুলের পাঠক্রমে এ ধরনের ঘটনা হলে তা থেকে কীভাবে উদ্ধার পাওয়া যাবে তা শেখানো হয়। এর আগে ২০১২ সালে স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলে বিশ বছর বয়সী এক ব্যক্তির গুলিতে ২৬ জন নিহত হয়েছিল, যার মধ্যে  বিশজনই ছিল পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সী। আমেরিকার সহজ বন্দুক আইনের কারণে বাড়ছে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাও। ফলে আমেরিকাজুড়ে বন্দুক আইন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চেয়েও বর্ণ-গোত্র বিদ্বেষ প্রভাব ফেলছে এমন অপরাধে। এর আগে মিনেসোটায় জর্জ ফ্লয়েডকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভ চরমে উঠেছিল। ক্ষমতায় এসেই অস্ত্র আইন কঠোর করতে উদ্যোগী হয়েছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। আদৌ তার বাস্তবায়ন হবে কি না তা নিয়ে যদিও প্রশ্ন রয়েছে। আমেরিকায় দিন দিন বেড়েই চলেছে বন্দুক হামলাসহ সহিংসের ঘটনা। দেশটিতে বিগত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে সাতটি বন্দুক হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। কলোরাডোতে বন্দুক হামলা হয়েছিল। বোল্ডার শহরে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা নিরাপদে থাকলেও একের পর এক হামলার ঘটনায় আতঙ্কিত তারা। বন্দুক নিয়ন্ত্রণ আইন যথাযথভাবে কার্যকর করার ওপর জোর দিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিসহ অন্য বিদেশিরাও।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

raihan567@yahoo.com