মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ও এর সাত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সরকারের পক্ষ থেকে গত দেড় বছর ধরে ‘লবিং’ চলছে। এ নিয়ে আলাপ-আলোচনার একপর্যায়ে র্যাবে সংস্কারের বিষয়টিও এসেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা সরকারপক্ষের ভাবনা ছিল, র্যাবের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা শিথিল অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে নওগাঁ শহর থেকে আটকের পর র্যাব হেফাজতে এক নারীর মৃত্যুর ঘটনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তবে এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা ওঠেনি, এরই মধ্যে র্যাব হেফাজতে সুলতানা জেসমিনের মৃত্যুতে ঢাকার সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না এ প্রশ্নের জবাবে ড. মোমেন গত বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিশ্চয়ই না। আপনারা দেখেন আমেরিকায় প্রতিদিনই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে।’
এ সপ্তাহেও তাদের দেশে (যুক্তরাষ্ট্র) স্কুলের বাচ্চা মেরে ফেলেছে এ প্রসঙ্গটি তুলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান, ‘এ নিয়ে কি কারও সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে? হঠাৎ এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে।’ র্যাব হেফাজতে মৃত্যু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পত্রিকার মাধ্যমে ঘটনাটা জানলাম। সত্য-মিথ্যা জানি না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও র্যাব বলতে পারবে।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক সূত্র বলছে, নওগাঁর ঘটনা র্যাবের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা সরকারপক্ষ বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও র্যাবের বিরুদ্ধে নতুন করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে উঠবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। র্যাবের উচ্চপর্যায় থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় খোঁজখবর রাখছে। ঘটনার পর থেকেই এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘র্যাবের নিষেধাজ্ঞা ওঠানোর ব্যাপারে সরকার কাজ করছে। এর মধ্যে আরেকটি ঘটনা ঘটেছে। এর তদন্ত চলছে। তদন্তে কী আসে সেটিও দেখার বিষয়। আর যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু এ বাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তাহলে এক ধরনের নজর তো তাদের থাকবেই।’
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বলেন, ‘আগে অভিযোগ ছাড়া জেসমিনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি র্যাবের এখতিয়ারে ছিল না। পুলিশের কার্যক্রম র্যাবের ওপর বর্তায় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কোনো ধরনের অভিযোগ ছাড়াই র্যাব কীভাবে তাকে গ্রেপ্তার করল? আবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজিরের নির্দেশনা থাকলেও সেটি করা হয়নি কেন?’ র্যাবের ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞার মধ্যে এটা নেতিবাচক হবে কি না এ প্রশ্নের জবাবে এই মানবাধিকারকর্মী বলেন, ‘আমরা চাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক। সুষ্ঠু তদন্ত হলে সরকারেরও কথা বলার সুযোগ থাকবে।’
এর আগে গত ২২ মার্চ সকালে নওগাঁর সুলতানা জেসমিনকে র্যাব তুলে নিয়ে যায়। এরপর শুক্রবার সকালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। র্যাব হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ করলেও জেসমিনের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো মামলা করা হয়নি।
র্যাবের ভাষ্য, সুলতানা জেসমিনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ ছিল। সেই অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে আটক করা হয়েছিল। আটকের পর অসুস্থ হয়ে তিনি মারা গেছেন। এরপরও র্যাব বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে।
এদিকে র্যাব হেফাজতে সুলতানা জেসমিনের মৃত্যুর ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও চাওয়া হয়েছে সংগঠনটির পক্ষ থেকে।