মূল : লিডিয়া পলগ্রিন
অনুবাদ : মনযূরুল হক
গত সপ্তাহে মেক্সিকোর ডিটেনশন সেন্টারে যখন আগুন লাগল মনে হলো, শরণার্থীদের ওপর এক মহাজাগতিক দুর্ভাগ্য নেমে এসেছে। ডিটেনশন সেন্টারটি ছিল সিউদাদ জুয়ারেজ থেকে আসা আমেরিকায় অভিবাসন প্রত্যাশী এবং রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের ঠিকানা। বিপদ থেকে পালিয়ে এসে তারা যেন মহাবিপদে পড়েছেন একদিকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সহিংসতা, জলবায়ু পরিবর্তন বা অর্থনৈতিক বঞ্চনার কারণে ঘরছাড়া, অন্যদিকে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়ার কেন্দ্রে বিধ্বংসী আগুন। কমপক্ষে ৩৯ জন মারা গেছে। বিশ্ব চেয়ে চেয়ে দেখেছে। কিন্তু এটা কি স্বাভাবিক ঘটনা? নাকি এই দ্বিমুখী বিপদ বিশ্বের বর্তমান অবস্থার একটি প্রতিচিত্র?
মনে পড়ল দক্ষিণ তুরস্কের কথা। কিছুদিন আগে, ফেব্রুয়ারিতে, বিধ্বংসী ভূমিকম্পের রিপোর্ট করতে গিয়েছিলাম। তুরস্কে ৩.৫ মিলিয়নেরও বেশি সিরিয়ান উদ্বাস্তুর বাস, যারা গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে এসেছে। ভূমিকম্প আঘাত হানলে তারাও একইরকম মহাজাগতিক দুর্ভাগ্যের মুখোমুখি হন বিপদ থেকে মহাবিপদে।
ভূমিকম্পের দায় না-হয় ঈশ্বরের, কিন্তু তাদের পরিস্থিতি তো মানুষের তৈরি। নিজভূমে নৃশংস সংঘাতের ফলেই তারা বাস্তুহারা। আর কোথাও যাওয়ারও উপায় নেই, কারণ তুর্কি সরকার ইইউ থেকে ০৬ বিলিয়ন ইউরো নিয়েছে ইউরোপে ঢোকার সমুদ্রমুখ বন্ধ করতে। যেমন মেক্সিকোর ডিটেনশন সেন্টারও নির্মিত হয়েছে দক্ষিণ কিংবা মধ্য আমেরিকার অভিবাসী প্রত্যাশীদের আটকাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে।
এই ডিটেনশন সেন্টার, কিংবা রিফিউজি ক্যাম্প মূলত নৈতিকভাবে সন্দেহজনক একটি ব্যবস্থা, যা ধনিক-বিশ্ব দরিদ্র-বিশ্বের কয়েক মিলিয়ন মানুষকে আটকে রাখতে গড়ে তুলেছে। যারা পালাচ্ছে, তাদের বলছে ওখানেই থাকো, খরচ আমরা দিচ্ছি। মানুষ ছুটছে দুর্যোগ, সংঘাত বা নিষ্ঠুরতার কবল থেকে বাঁচতে, আর ধনী দেশগুলো চাইছে নিজ উপকূল থেকে তাদের আরও দূরে রাখতে, তথাকথিত ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড’-এর সীমানায় বেঁধে ফেলতে। নিষ্ঠুরতা-সহনশীল একটি চমৎকার ব্যবস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অরক্ষিত মানুষকে সুরক্ষা দিতে বিশ্ব যে মহান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার কি আর কোনো মানে আছে এখন?
তুরস্কে আমার দোভাষী ছিল সিরিয়ার আহমেদ কানজো। যুদ্ধের শুরুতে সে ছিল আলেপ্পোতে একটি আরবি মিডিয়ার সংবাদ উপস্থাপক। পরিবার নিয়ে তুরস্কে পালিয়ে আসার পর জীবিকা নির্বাহে সংগ্রাম করছে। যে ভবনে স্ত্রী ও চারটি সন্তান নিয়ে থাকত, ভূমিকম্পে সেটি ভেঙে পড়েছে। তো পরিবারকে ভাইয়ের সঙ্গে অন্য এলাকায় পাঠিয়ে দিয়ে নিজে রয়ে গেছে গাজিয়ানটেপে। তার বন্ধু আব্দুল কাদির আমাকে জানায়, সে-ও আলেপ্পো থেকে পালিয়েছে সিরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার নির্যাতনের শিকার হয়ে।
এক সন্ধ্যায় আহমেদ, আবদুল কাদির আর তাদের কয়েক বন্ধু মেঝেতে আড়াআড়ি বসে মসলাদার কফি পান করছিল। সিগারেটের ধোঁয়ায় বাতাস ঘন হয়ে আসছে। আমি ভাবছিলাম, একজন প্রতিভাধর টেলিভিশন সাংবাদিক আহমেদের জীবনের কী হাল! সে আমাকে অনেকগুলো ভিডিও ক্লিপ দেখিয়েছে। চারপাশে বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ। আহমেদ আমাকে বলেছিল, সে তার কাজকে খুব মিস করে। বলেছিল, ‘বিশ্ব মনে করে তুরস্কে সিরিয়ানরা ভালো আছে। তারা একটি অভয়াশ্রম খুলে দিয়েছে, আসলে এটা একটি কারাগার।’
আহমেদ ও আমার আরেকটা মিল আছে। আমার শেকড়ও ইথিওপিয়াতে, সিরিয়ার মতোই বাস্তুচ্যুত মানুষের দেশে। নিষ্ঠুর মার্কসবাদী স্বৈরশাসনের কবলে পড়ে আমার মা পালিয়ে একজন আমেরিকানকে বিয়ে করেন। তারা আমাকে একটি গাঢ় নীল পাসপোর্ট দেয়, যা আজ আমাকে বিশ্বে অবাধে চলাফেরার সুবিধা দিয়েছে। ওটাই চাকরির অসিলায় আমাকে তুরস্কে এনেছে। ভৌগোলিক ‘সৌভাগ্য’ না-হলে আমার আর আহমেদের জীবন কাহিনি তো একই হওয়ার কথা। আবদুল কাদিরের পাশে চুপচাপ শুয়ে আছেন তার ৯০ বছর বয়সী দাদি, রাবিয়া। জিজ্ঞাসা করলাম, তুরস্কের জীবন কেমন? বললেন, ‘নিরাপদ, কারণ কোনো ব্যারেল বোমা নেই, গোলাগুলি নেই, যুদ্ধ নেই।’ কিন্তু ভয় না থাকলেই কি জীবন চলে?
জানতে চাইলাম, কী বেশি মিস করেন? বললেন জলপাই তেলের কথা, যা তিনি নিজেই উঠোনের গাছ থেকে পেড়ে তৈরি করেছেন। বললেন, ‘সিরিয়ায় আমাদের সমস্ত স্মৃতি রেখে এসেছি।’ বাড়ির জন্য এই কাতরতা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে যারা ক্ষোভ দেখায় তারা কখনো বুঝবে না। মায়ের কথা মনে পড়ে, কয়েক দশক ধরে তিনি আমেরিকান নাগরিক, অথচ প্রতি মুহূর্তে বলেন ইথিওপিয়াতে নিজের শহরে একটা বাড়ি বানাবেন। যে গরিব দেশে গেছি, দেখেছি, আধখেচড়া ইট-পাটকেলের ঘর প্রবাসীদের ফেরার স্বপ্নে বিভোর। কে চায় বাড়ি ছেড়ে যেতে? কিন্তু সিরিয়ার শরণার্থীরা বাড়িও যেতে পারে না, ইউরোপেও না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, যুদ্ধ ও নিপীড়নের পালাতে বাধ্য হওয়া মানুষকে রক্ষা করতে এই ‘শরণার্থী’ ব্যবস্থা তৈরি করে বিশ্ব। তাই এটা এখন তাদের আইনি পদবি, সাধারণ অভিবাসীদের মতো নয়। যুদ্ধোত্তর অনেক প্রতিশ্রুতির মতো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরণার্থীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিও বাস্তবের চেয়ে বেশি তাত্ত্বিক অনুশীলনে বন্দি। এটা ছিল বৈশ্বিক দায়িত্ব, কিন্তু বাস্তবে, পালন করতে হয় অতি দরিদ্র কিংবা মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে ধনী দেশগুলোর ‘দান-দক্ষিণার’ ভিত্তিতে। ধনী দেশগুলো তাদের দেশে যেতে সুইয়ের চোখের মতো কয়েকটি সরু পথ রেখেছে, গুটিকতক সৌভাগ্যবান ছাড়া যার ফাঁকে মাথা গলাতে পারে না কেউ। শরণার্থীদের জন্য তা-ও বন্ধ। পরিবর্তে, এমন লোক নিতে চায়, যারা যোগ্যতার প্রমাণ দেখাবে।
অভিবাসনের রাজনীতিও সম্পূর্ণ বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। ২০১৫ সালে ইউরোপে উদ্বাস্তুদের নিতে জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল সাহসের সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমরা সামলাতে পারব।’ জার্মানি তখন এক মিলিয়নেরও বেশি লোক নিয়েছে, বেশিরভাগই সিরিয়ার। জার্মানি সামলেছে। কিন্তু ইউরোপ জুড়ে বিদ্রোহ করেছে ভোটাররা। পরের বছরই মার্কেলসহ ইইউ নেতারা অভিবাসীদের আগমন বন্ধ করতে তুরস্কের সঙ্গে দর কষাকষি করেছেন। তারপর আর কেউ পা বাড়ায়নি। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩২ মিলিয়ন শরণার্থীর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোটা মাত্র ১ লাখ ২৫ হাজার; যদিও ২০২২ সালে নিয়েছে মাত্র ২৫ হাজার।
২০১৫ সালে মার্কেল যা করেছেন, সেটুকু সাহসও ধনী বিশ্বেও এখন কোনো নেতার নেই। এমনকি সেখানকার বাহ্যত ‘ভালো’ লোকেরাও শরণার্থী চান না। কানাডা এবং উদারপন্থি প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো দীর্ঘকাল জানিয়েছেন তার দেশ শরণার্থীদের স্বাগত জানাতে ইচ্ছুক। সত্য কথা হলো যে, সীমান্তে ‘অবৈধ’ অভিবাসী ঠেকাতে তারাও অন্যদের মতো তৎপর। গত মার্চের শেষে করা ওয়াশিংটন-অটোয়া চুক্তিতে কানাডাকে আরও বেশি শরণার্থী ফিরিয়ে দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে।
গাজিয়ানটেপে আহমেদের সঙ্গে কফি খেতে বসা আর মেক্সিকোর ডিটেনশন সেন্টার পুড়িয়ে দেওয়ার মধ্যকার কয়েক সপ্তাহে মিডিয়ার ৩টি সংবাদ শিরোনাম ছিল এমন ‘ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র সচিব রুয়ান্ডার সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনন্দময় করমর্দন করেন’ অথচ এ-দেশটির মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘ রেকর্ড রয়েছে; ‘ইতালির উপকূলে একটি নৌকা ডুবে ৮০ জনেরও বেশি অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে’; ‘জাতিসংঘের একটি তদন্ত উপসংহারে পৌঁছেছে যে, ভূমধ্যসাগরে টহল দিয়ে অভিবাসীদের আটকে রাখার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন লিবিয়ান কোস্টগার্ডকে যে-নির্দেশ দিয়েছে, তা মানবাধিকার লঙ্ঘনকে সহায়তা ও উৎসাহিত করেছে।’
নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে অনূদিত
লেখক : প্রধান সম্পাদক, হাফিংটন পোস্ট। সাবেক এডিটরিয়াল ডিরেক্টর, নিউ ইয়র্ক টাইমস