দেশের তৈরি পোশাকের সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজার কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লীতে ভয়ঙ্কর আগুনের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থায় অনীহা, গার্মেন্টস মালিক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলায় এই ঝুঁকি বেড়ে গেছে বহুগুণ।
স্থানীয়রা বলছেন দ্রুত সময়ের মধ্যে কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লী জুড়ে অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা না নিলে যে কোনো সময় ঘটতে পারে বঙ্গবাজারের মতো বড় দুর্ঘটনা।
কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লীতে ১০ হাজার শো রুম এবং ৫ হাজার কারখানা রয়েছে। এই এলাকায় কয়েক লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক প্রতিনিয়ত অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে কাজ করছেন। কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এখানকার ভবন মালিকরা ব্যাঙের ছাতার মতো একের পর ভবন তৈরি করেছেন। গার্মেন্টস পল্লীর অধিকাংশ ভবনে কারখানা থাকলেও কোনো ভবন নির্মাণে কারখানা আইন মানা হয়নি। এছাড়া অধিকাংশ বিল্ডিংয়ের রাজউকের অনুমোদন নেই।
সরেজমিনে কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লীতে গিয়ে দেখা যায় কোনো ফাঁক না রেখেই একটি ভবনের সাথে আরেকটি ভবন লাগোয়া ভাবে তৈরি করা হয়েছে। বেশির ভাগ ভবনের সিড়িই প্রশস্থ না। ভবন মালিকরা রাস্তা না ছেড়ে ভবন নির্মাণ করায় গার্মেন্টস পল্লীর রাস্তাগুলো অনেক সরু ও চিপা। ফায়ার সার্ভিসের যাতায়েতের ব্যবস্থাও নেই।
অধিকাংশ শো রুম বা কারখানায় নেই অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। যে সকল প্রতিষ্ঠানে আছে সেগুলারও হয়তো মেয়াদ নেই কিংবা কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তা কেউ জানে না। প্রতিনিয়ত এক প্রকার মৃত্যু ঝুঁকি নিয়েই কাজ করছে লাখো শ্রমিক।
এছাড়া পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মার গুলো প্রায় বিল্ডিং এর সাথে লাগানো। ফলে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়ে যায়। অধিকাংশ ভবনে নেই জরুরি নির্গমন পথ। কিছু কিছু স্থানে অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
স্থানীয় অনেকেই জানান, প্রায় ৩০/৩৫ বছর আগে গড়ে উঠা কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লী গত এক যুগে অনেক বড় ও বিস্তৃত হয়েছে। উঁচু ভবন নির্মাণ করা হলেও অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব দেয়নি ভবন মালিকরা।
স্থানীয় সাংসদ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু ও উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদের বার বার তাগিদ দেয়ায় ফলে কেউ কেউ অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব আরপ করলেও অধিকাংশ ভবন ও শো রুম মালিকরা এখনও নিয়ম মানছেন না।
আগানগরের নামাপাড়া এলাকার সোহেল নামের এক বাসিন্দা জানান, ১০-১৫ বছর আগেও এখানে এত জনবহুল মার্কেট ছিল না। এখানে শিল্পায়ন দ্রুত হয়েছে, কিন্তু ব্যবসায়ীরা শুধু তাদের নিজেরটাই বুঝেছেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তার কথা বা সুযোগ সুবিধার কথা তারা কখনোই চিন্তা করে না। মালিক সমিতির লোকজনও এই পর্যন্ত পারলো না সঠিক কোন পদক্ষেপ নিতে। তারা একটু শক্ত হলেই সবাইকে বাধ্য করা যায় অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা গ্রহনে।
জিলা পরিষদ মার্কেট এলাকায় জামাল নামে এক দোকানদার বলেন, আমাদের দোকানদারদের সচেতনতার অভাব রয়েছে এছাড়া মালিক সমিতির জোরাল কোনো ভূমিকা নেই। তারা শুধু প্রতিমাসে চাঁদাই নেয় কিন্তু তেমন কোন কাজ ই করে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একজন জানান, গার্মেন্টস ও দোকান মালিক সমিতি কর্তৃপক্ষ অগ্নি ঝুঁকি এড়াতে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। গার্মেন্টস ও দোকান মালিক সমিতির উচিত ব্যবসায়ী ও গার্মেন্টস পল্লীর স্বার্থে অগ্নি ঝুঁকির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা, দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা। ফায়ার সার্ভিসের লোকজনদের ডেকে, অগ্নি নির্বাপক মহড়ার ব্যবস্থা করা উচিত, প্রতিটি মার্কেট ও দোকানে অগ্নি নির্বপক ব্যবস্থার জন্য বিশেষভাবে জোর দেওয়া উচিত। এছাড়া প্রতিটি ট্রান্সফর্মারে বিদ্যুতের লুজ কানেকশন সমস্যার ও সমাধান করা উচিত।
গত দুই/তিন বছরে গার্মেন্টস পল্লীর নূর মার্কেটে, তানাকা সুপার মার্কেট, হেলাল টাওয়ার, গ্রীন টাওয়ারসহ একাধিক ভবনে ছোট ছোট একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে নুরু মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শতাধিক দোকান মুহুর্তেই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তারপরেও টনক নড়েনি এখানকার ব্যবসায়ী, ভবন মালিক কিংবা গার্মেন্টস মালিক সমিতি কর্তৃপক্ষের।
কেরানীগঞ্জ গ্রাজুয়েট সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ও সমাজসেবক ম.ই মামুন বলেন, গার্মেন্টস পল্লীর ব্যবসায়ীদের আরও সচেতন করতে হবে। আগে এগিয়ে আসতে হবে জমিদারদের। কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস মালিক সমিতিকে আরও বেশি সোচ্চার হতে হবে। অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা নিয়ে তাদের আরও গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। গার্মেন্টস মার্কেট ও গার্মেন্টস পল্লীকে ঢেলে সাজাতে হবে।
এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ দোকান মালিক ও গার্মেন্টস ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুসলিম ঢালী বলেন, গার্মেন্টস পল্লীতে অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা রয়েছে। তবে যা আছে তা যথেষ্ট না। কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লীতে আগে বড় ধরনের কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটেনি, তাই অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থায় আগে তেমন জোরও দেওয়া হয়নি। তাছাড়া ফায়ার সার্ভিসেরও তদারকি এখানে ছিল না। আমরা আস্তে আস্তে ব্যবসায়ীদের সচেতন করে তুলছি।
এই বিষয়ে কথা বলার জন্য কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস মালিক সমিতির সভাপতি স্বাধীন শেখ ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
কেরানীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. হিরনের সাথে কথা হলে তিনি জানান, কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লী এলাকা ভিজিট করে বিভিন্ন ত্রুটি দেখতে পেরেছি। ত্রুটিগুলো নিয়ে ইউএনও এবং মালিক সমিতির সাথে কথা বলেছি। আশা করি দ্রুতই এই ত্রুটি সমূহ নির্মূল করা হবে।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফয়সল বিন করিম জানান, আমি ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের নিয়ে গার্মেন্টস পল্লী পরিদর্শন করেছি। এটি খুবই ঘনবসতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ একটি জায়গা। আগুন লাগলে তারা কীভাবে বের হবে কারখানাগুলোতে সেই ব্যবস্থা নেই। পর্যাপ্ত অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রের ব্যবস্থা নেই, ফায়ার সেফটি ট্রেনিং নেই। আমরা ফায়ার সার্ভিস, মালিক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলে দ্রুত সময়ের মধ্যেই কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লীতে সর্বোচ্চ অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলব।