রোজার অর্জনে চাই সংযম

পবিত্র রমজানের মধ্যভাগে উপনীত আমরা। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর বিধান মেনে রোজা পালনের চেষ্টা করছি। তবে সেই বিধান কতটা পালিত হচ্ছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কেননা রোজার যে মৌলিক শিক্ষা সংযম সেটা অনেকাংশে রক্ষা হচ্ছে না। সারা দিন না খেয়ে থাকলেও নিজেকে অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমাদের পাপাচারী প্রবৃত্তি টেনে নিয়ে যায় সংযম পরিপন্থী বিষয়ের দিকে। কথায় কথায় আমরা রোজার ভাব দেখাই, মেজাজ করি। কারণে-অকারণে মানুষের সঙ্গে বাজে আচরণ করি। রোজা রাখার পর কারও মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেলে বুঝতে হবে রোজার প্রকৃত শিক্ষায় তিনি উদ্বুদ্ধ হননি।

রোজা রেখে আমরা পরচর্চায় অনবরত লিপ্ত থাকি। অথচ এটা রোজার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যের কষ্টের কথা অনুধাবন করা, অন্যের উপকারে আসা রোজার অন্যতম দাবি। কিন্তু আমরা রোজা রেখে কতজনের উপকারে এসেছি! গরিব-দুঃখীদের কষ্টের কথা কতটা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছি! আর অন্যায় ও অসততা থেকে আমাদের প্রবৃত্তি কতটা সুরক্ষিত সেটা নিজেরটা নিজেই ভালো বলতে পারব।

সংযমের অনুশীলনের মাধ্যমে বিশ^াসী বান্দাকে পরবর্তী ১১ মাসের জন্য তৈরি করাই রোজার উদ্দেশ্য। কিন্তু আমরা অনুশীলনের সময়ই সংযম অবলম্বন করি না। রোজার মাস এলে খাই খাই ভাবটা আমাদের মধ্যে প্রকট আকার ধারণ করে। আমাদের সমাজে একটা কথার প্রচলন আছে, ‘রমজানে যত খুশি খাও এর কোনো হিসাব নেই।’ কথাটি কি ইসলামসম্মত? যৌক্তিকভাবেও কি এটা ঠিক? সংযমী জীবনাচারে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য যেখানে সিয়ামের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, উপোস থাকার কথা বলা হয়েছে সেখানে ‘যত খুশি খাও’ সেটা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে! ইসলাম ও যুক্তি কোনোটাই এটা সমর্থন করে না। রোজা রাখার মতো সামর্থ্য অর্জনের জন্য যতটা খাবারের প্রয়োজন ততটুকু খাবার তো অবশ্যই খেতে হবে। খাবারের পরিমাণ এত বাড়িয়ে দেওয়া যাবে না যাতে রমজানের অন্যান্য ইবাদতে বিঘœ ঘটে।

রোজা এলে আমাদের সব চাহিদাই বেড়ে যায়। এ চাহিদার জোগান দিতে গিয়ে অনেকে অবৈধ পন্থায় উপার্জনের পথও খোঁজেন। রমজানে আমাদের দেশে ঘুষের বাজার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। অসততার মাত্রা বেড়ে যায়। সরকারি অফিসের বড় কর্তা থেকে শুরু করে ফুটপাতের একজন সাধারণ ব্যবসায়ীও বাড়তি উপার্জনের চেষ্টায় মেতে ওঠেন। যেখানে রমজানে এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা কমে যাওয়ার কথা সেখানে এগুলো আরও বেড়ে যায়। বাহ্যিকভাবে আমরা রোজা রাখছি, ধর্মকর্ম করছি, কিন্তু অবৈধ উপার্জন করতে একটুও কুণ্ঠিত হচ্ছি না। অনেকে ওপরে ওপরে পাক্কা মুসল্লি, রমজানে সেই মুসল্লিগিরির মাত্রা আরও বেড়ে যায়। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখবেন তিনিও রমজানে ‘বাড়তি’ উপার্জন ঠিকই বজায় রেখেছেন।

রমজানের এক মাস সিয়াম মূলত মুসলমানদের অনুশীলনের জন্য। এ মাসে আত্মনিয়ন্ত্রণ, সংযম, পরোপকার, সহানুভূতি, পশুপ্রবৃত্তির দমন এসব বিষয় চর্চা হয়। এ শিক্ষা বছরের বাকি দিনগুলোতেও যেন ধরে রাখতে পারে সে তাগিদই দিয়ে যায় রমজান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আমরা রমজানের আনুষ্ঠানিকতা পালন করি বটে, এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, মহান শিক্ষা ধারণ করি না। আর এ কারণেই জীবনে অনেক রমজান উদযাপন করেও আমরা এর অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারিনি। এবারের রমজান এখনো শেষ হয়ে যায়নি। পবিত্র এ মাসের মধ্যভাগে এসেও আমরা চাইলে জীবনকে সাজিয়ে তুলতে পারি। আসুন, সবাই প্রত্যয়ী হই।

লেখক : আলেম ও ধর্মীয় নিবন্ধকার