পাঁচ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ঘিরে বিএনপিতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন আশঙ্কার কারণ সিটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়ার মতো আলামত। পাশাপাশি ব্যতিক্রমও আছে। সেটা হলো এবার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে বোঝাপাড়ার চেষ্টা করা। দলীয় সূত্র মতে, ‘স্বেচ্ছায় বহিষ্কৃত হতে লন্ডনে দেন-দরবার করা’।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া ছিলেন বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য। গত ডিসেম্বরে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং দলত্যাগ করে উপনির্বাচনে প্রার্থী হন। জিতে আসার পর সংসদ শুভেচ্ছা বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, অনিচ্ছা সত্ত্বেও দলীয় সিদ্ধান্তে তিনি পদত্যাগ করেছেন।
পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে বিএনপিতে এমন পরিস্থিতি রয়েছে জানিয়ে বিএনপি দলীয় সূত্র বলছে, এ কারণে নির্দলীয় সরকারের অধীনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্তে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও বিপাকে পড়তে পারে দলটি।
এ বিষয়ে বিএনপির কয়েকজন নেতা বলছেন, গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জে তৈমূর আলম খন্দকার ও কুমিল্লায় মনিরুল হক সাক্কুর মতো এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে পারেন বিএনপির কয়েকজন নেতা। সেটি হলে নির্বাচন বয়কটে বিএনপির যে অবস্থান তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে দলটিকে। গত মঙ্গলবার দুপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিএনপিতে বিভেদ সৃষ্টি করতে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা চলছে বলেও নেতারা মনে করছেন। ক্ষমতাসীনরা পর্দার অন্তরালে থেকে বিএনপির কিছু নেতাকে বিজয়ী করা বা লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে দু-একটি সিটিতে প্রার্থী করার চেষ্টা করছে বলেও বৈঠকে জানানো হয়। তাই দলের পক্ষ থেকে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতদের নির্বাচনে না যাওয়ার বার্তা আগেই দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরপরও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ নির্বাচনে অংশ নিলে দায় তাকেই নিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার নেতাকর্মীরা যাতে স্বতন্ত্র এসব প্রার্থীকে সহায়তা না করে সেটিও মনিটরিং করতে কেন্দ্রকে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপির কেউ কেউ দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে সরাসরি কিংবা বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন। এখন পর্যন্ত তারা কেউই সাড়া পাননি। কেউ কেউ তার অনুসারীদের বলছেন, দলীয়ভাবে না হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করতে চান তিনি। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, বর্তমানে দলীয় পদপদবি নেই এমন অনেকেই নির্বাচনে অংশ নেবেনÑ এমন তথ্য বিএনপির কাছেও রয়েছে। এ সংখ্যা মেয়রের চেয়ে কাউন্সিলর পদেই বেশি।
জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে আগামীতে সিটি করপোরেশনসহ কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের আগেই ছিল। সেটি এখনো বহাল রয়েছে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ নির্বাচনে অংশ নিলে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে শাস্তির যে বিধান রয়েছে, সে অনুযায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে বিএনপির নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে দলীয় নেতাকর্মীরা বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ধানের শীষ প্রতীকে পাঁচ বছরের বেশি সময় আগে স্থানীয় সরকারের এই ভোটে বিএনপি জয়ের হার ছিল ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ। আর স্বতন্ত্র হয়ে বিএনপি নেতাদের জয়ের হার ৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। প্রার্থী হওয়ার পর তাদের বহিষ্কারের কথা বলা হলেও সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। বরং সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আন্দোলন সফল করার লক্ষ্যে তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
উল্লেখ্য, ২৫ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশন, ১২ জুন খুলনা ও বরিশাল এবং ২১ জুন রাজশাহী ও সিলেটের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তফসিল অনুযায়ী, গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৭ এপ্রিল, বাছাই ৩০ এপ্রিল ও ৮ মের মধ্যে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার। খুলনা ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমার শেষ তারিখ ১৬ মে, বাছাই ১৮ মে ও প্রত্যাহার ২৫ মের মধ্যে। রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২৩ মে পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে, বাছাই ২৫ মে ও প্রত্যাহার ১ জুনের মধ্যে।
এর আগে ২০১৮ সালের নির্বাচনে পাঁচ সিটি করপোরেশনের চারটিতেই মেয়র পদে হেরে কারচুপির অভিযোগ করেছিল বিএনপি। গাজীপুর সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী ছিলেন হাসান উদ্দিন সরকার, রাজশাহীতে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, বরিশালের নির্বাচনে মজিবর রহমান সারোয়ার ও খুলনায় নজরুল ইসলাম মঞ্জু। সিলেটে জয়ী হয়েছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী।
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র বলছে, খুলনায় গতবারের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং সিলেটের বর্তমান মেয়র আরিফুল হক এবার নির্বাচনে অংশ নিতে ব্যাপক আগ্রহী। শুধু তা-ই নয়, নজরুল ইসলাম মঞ্জু দলীয় সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য কেন্দ্রে চিঠিও দিচ্ছেন। আর আরিফুল হক নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সবুজ সংকেত আনতে লন্ডনে গিয়েছেন।
সূত্রগুলো বলছে, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আরিফুল হক নির্বাচনে অংশ নেবেন নাÑ এমনটি বলে এলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সিটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন বলে খোদ দলটির ভেতরেই আলোচনা ছিল। এর মধ্যেই গত ২ এপ্রিল সকালে বিমানের একটি ফ্লাইটে সিলেট থেকে যুক্তরাজ্যে যান আরিফুল হক। মেয়রের ব্যক্তিগত সহকারী মুহিবুল ইসলাম ইমন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এটি তার একান্ত ব্যক্তিগত সফর।
তবে বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্রের দাবি, যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করতেই তিনি সেখানে গেছেন। সিলেটে ক্ষমতাসীনদের শক্তিশালী প্রার্থী নেই। আবার বিএনপির অবস্থান সেখানে ভালো। তাই সরকারি দলকে ওয়াকওভার না দিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারলে দলের পক্ষে কাজ করা যাবে এমনটি বুঝিয়ে তারেক রহমানের সবুজ সংকেত আনতেই লন্ডন গেছেন তিনি। অথচ সম্প্রতি তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সিলেটের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর সেখানকার চিকিৎসকদের পরামর্শে গত ১৫ মার্চ ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হন। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার হার্টে তিনটি ব্লক ধরা পড়ায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রফেসর ডা. মমিনুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে তার হার্টে রিং পরানো হয়। ঢাকায় এক সপ্তাহ চিকিৎসা নিয়ে তিনি ২২ মার্চ সিলেট যান। মেয়র আরিফুর হক দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছিলেন, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তিনি মেয়র নির্বাচন করবেন না।
এদিকে ২০২১ সালে খুলনা জেলা ও মহানগর কমিটি গঠন নিয়ে দলের সিদ্ধান্তে আপত্তি তোলায় পদ হারান নজরুল ইসলাম মঞ্জু। বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক পদ থেকেও তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। দলের প্রাথমিক সদস্যপদে ছাড়া অন্য কোনো পদে না থাকায় তিনি এবার মেয়র পদে নির্বাচন করতে চান বলে জানা গেছে।
সূত্রগুলো বলছে, মেয়র পদে অংশ গ্রহণে অনুমতি চেয়ে মঞ্জু চিঠি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। তার ওপর স্থানীয় নেতাকর্মীদের চাপ রয়েছে এমন কথা জানিয়ে তাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানাবেন তিনি।
জানতে চাইলে গত ৩ এপ্রিল নজরুল ইসলাম মঞ্জু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি দলকে খালি মাঠ ছেড়ে দিলে তারা আরও পেয়ে বসবে। নির্বাচনে থাকলে তারা চাপ প্রয়োগ বোধ করবে। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আগে দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে হলে নির্বাচনের বিকল্প নেই। এ বিষয়গুলো চিহ্নিত করে কেন্দ্রকে আমি চিঠি দেব।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এও জানান, দল না চাইলে তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন না।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনে হাসান উদ্দিন সরকার রাজশাহীর মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, বরিশালের মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সারোয়ার জানিয়েছেন, তারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন না। ২০১৩ সালের এসব সিটি করপোরেশনে বিএনপির প্রার্থীরা মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন।
মেয়র পদপ্রার্থীর বাইরে এবার দুই শতাধিক কাউন্সিল দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে পাঁচ সিটির নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। তাদের অনেকেই বর্তমানে কাউন্সিলর।
জানা গেছে, গাজীপুরের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর ও মহানগর শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমাদ সরকার, মহানগর বিএনপি নেতা ও বর্তমান কাউন্সিলর তানভীর আহমেদ, সদর থানার বিএনপির আহ্বায়ক ও বর্তমান হাসান আজমল ভূঁইয়া, মহানগর বিএনপি নেতা ও বর্তমান কাউন্সিল হান্নান মিয়া হান্নু, বর্তমান শফিউদ্দিন শফিসহ বেশ কয়েকজন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছেন।