বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে এখনো বিশেষ পরিস্থিতি!

জরুরি সংকট মোকাবিলায় ১৩ বছর আগে দুই বছরের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিশেষ আইন করেছিল সরকার। প্রচলিত আইন মেনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতি এবং অপর্যাপ্ততা নিরসন সময় সাপেক্ষ হওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত এক দশকে বিদ্যুৎ ঘাটতির দেশ থেকে উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে শতভাগ মানুষ।

তারপরও বিশেষ আইন চালু রয়েছে এখনো। বিশেষ পরিস্থিতিতে দুই বছরের জন্য করা আইনটি পরে আরও তিন দফা মেয়াদ বৃদ্ধি ও সংশোধনের পর ২০২৬ সাল পর্যন্ত এর কার্যকারিতা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক যুগের বেশি সময় ধরে বিশেষ পরিস্থিতি থাকতে পারে না। বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পরও দীর্ঘদিন ধরে এই আইন কার্যকর থাকায় বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে না। এটি দুর্নীতিকে উৎসাহিত করেছে। ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা এবং তাদের অনিয়ম-দুর্নীতির রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে এই আইন। এটি দ্রুত বাতিল করা দরকার। এতে সরকারের ওপর থেকে বাড়তি ব্যয়ের চাপ কমবে। সাধারণ মানুষও স্বস্তি পাবেন।

জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতের উন্নয়নের জন্যই আইনটি করা হয়েছিল। ইতিমধ্যে দেশে ব্যাপক উন্নয়নও হয়েছে। এর মধ্যে আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। এই আইন না থাকলে যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বে জ্বালানি নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে তা আমাদের দেশে মোকাবিলা করতে পারতাম না। দেশে-বিদেশে যদি পরিস্থিতি স্থিতিশীলতা আসে তাহলে আর এই আইন কন্টিনিউ করা হবে না।’

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলার কথা বলে ২০১০ সালে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বিধান বৃদ্ধি (বিশেষ আইন) আইন’ প্রণয়ন করে সরকার। শুরুতে দুই বছরের জন্য আইনটি করা হলেও পরে ২০১২ সালে ২ বছর, ২০১৪ সালে ৪ বছর, ২০১৮ সালে ৩ বছর এবং সর্বশেষ ২০২১ সালে ৫ বছরের জন্য এর মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়।

আইনটির ৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনের অধীন কৃত বা কৃত বলিয়া বিবোচিত কোনো কার্য, গৃহীত কোনো ব্যবস্থা, প্রদত্ত কোনো আদেশ বা নির্দেশের বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতের নিকট প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’

‘সরল বিশ্বাসে কৃত কাজকর্ম রক্ষণ’ উপশিরোনামে ১০ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইন বা তদধীন প্রণীত বিধি, সাধারণ বা বিশেষ আদেশের অধীন দায়িত্ব পালনকালে সরল বিশ্বাসে কৃত বা কৃত বলিয়া বিবেচিত কোনো কার্যের জন্য কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো প্রকার আইনগত কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না।’

অর্থাৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং এর ফলে জনদুর্ভোগের কারণে যদি কেউ দায়ী থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। এমনকি কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি বা অসংগতি থাকলেও আদালতের দারস্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এসব কারণে এটিকে ‘দায়মুক্তি’ আইন বলে অভিহিত করেন অনেকেই।

বিদ্যুৎ বিভাগের সাবেক সচিব মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি এটা ইললিগ্যাল আইন। কারণ আমাদের সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে মাঝখানে খুচরা এই আইন করে বলা হচ্ছে এর বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়া যাবে না। এটি সাধারণ মানুষের আইনের প্রতিকার পাওয়ার পথ রুদ্ধ করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমার বিবেচনায় এটা একটা অসাংবিধানিক আইন। ইংল্যান্ড, ইন্ডিয়া এমনকি আমাদের দেশের আইনে বলা আছে, সরকারি অর্থ ব্যয় করলে প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করা বাধ্যতামূলক। আমার জানামতে, ব্রিটিশ আদালত দুটো “বিশেষ” বিষয় অনুমোদন করেছে। এর একটি হলো যদি কখনো দেশে দুর্ভিক্ষ বা জীনননাশের সম্ভাবনা আছে এমন পরিস্থিতিতে বিশেষ আইনের সুযোগ নেওয়া যেতে পারে। কারণ এ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গেলে দীর্ঘ সময় লাগবে, তখন মানুষ না খেয়ে মারা যাবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা এভোয়েড করতে হবে। আরেকটি হলো যদি যুদ্ধ হয়।’

ফাওজুল কবির বলেন, বিশেষ ক্ষমতা আইন মানে এই প্রতিযোগিতাকে পাশ কাটানো। বিদ্যুৎ না পেলে তো মানুষ মারা যাবে না। তাহলে কেন এই আইন? এটা তো করতেই পারে না। তা ছাড়া ১২ বছর ধরে জরুরি পরিস্থিতি চলে না। সুতরাং কোনো যুক্তিতেই আইনটির গ্রহণযোগ্যতা নেই। এই আইনের কারণে ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা না থাকায় বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে ব্যয় বাড়ছে। কয়লার দাম দিয়ে আদানির সঙ্গে ঝামেলায় পড়ছে কেন? যদি এখানে প্রতিযোগিতা থাকত, তাহলে এই ঝামেলায় পড়তে হতো না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. ম তামিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই বলছি, বিশেষ ক্ষমতা আইনের কোনো দরকার নেই। আইনটির কারণে বরং প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। জরুরি অবস্থার সময় বিদ্যুতের সংকট কাটাতে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যখন এই আইন করা হয়, তখন এর যৌক্তিকতা ছিল। এখন তো আর জরুরি অবস্থা নেই। তা ছাড়া এত বছর ধরে তো জরুরি অবস্থা চলতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘আইনটির কারণে ক্রয় প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হচ্ছে না। কয়েকটা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রস্তাব নিয়ে যাচাই করা না গেলে সেটা ভালো, না খারাপ, দাম কেমন এ বিষয়গুলো সম্পর্কে তো ধারণা পাওয়া যায় না। সুতরাং এখনই এই আইন বাতিল করা দরকার।’

জ্বালানি খাতের বিশেষ ওই আইনের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও, এই আইনের অধীন কৃত কাজকর্ম বা গৃহীত ব্যবস্থা এমনভাবে অব্যাহত থাকিবে ও পরিচালিত হইবে যেন এই আইনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়নি।’

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহী একক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি করার বিধান রয়েছে এ আইনে। গত এক যুগে এ আইনের আওতায় বিনা দরপত্রে বেসরকারি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়, দফায় দফায় অতিরিক্ত মূল্যে চুক্তি নবায়ন, অতিউচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি, বিনা দরপত্রে গ্যাস-বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণ, অবকাঠামো নির্মাণ করার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অস্বচ্ছতার পাশাপাশি এসব চুক্তির ক্ষেত্রে অতি গোপনীয়তা রক্ষার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিযোগিতা না থাকায় বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো দাম আদায় করছে। যার ফলে সরকারের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। সর্বশেষ ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়ের যে অসম চুক্তি হয়েছে তা নিয়েও দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়, যার রেশ এখনো আছে।

২০১০ সালে আইনটি পাশের সময় সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে যখনই এর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, তখনই আপত্তি উঠেছে। কিন্তু কোনো আপত্তি, বিরোধিতায়ই এ আইন বাতিল হয়নি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর স্বার্থের সুরক্ষা দিচ্ছে এ আইন। এখানে সরকারি ক্রয় বিধিমালা লঙ্ঘন করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের সুযোগ রাখা হয়নি। ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গাটি উপেক্ষিত। ক্রয় প্রক্রিয়ায় অসচ্ছতা কিংবা যেকোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি হলেও আদালতে যাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার অভাবে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের পণ্যের গুণগত মান রক্ষার সুযোগ নেই। এতে ব্যয় বাড়ছে। দিনশেষে সেই বোঝা জনগণকেই বহন করতে হচ্ছে। কাজেই আমরা মনে করি এই আইন এখনই বাতিল করা উচিত।’

তিনি বলেন, ‘ভারতের আদানির সঙ্গে এত বড় একটা অস্বচ্ছ বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি হয়ে গেল কিন্তু আমরা সমালোচনা ছাড়া আইনগত কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছি না। কারণ বিদ্যুৎ-জ্বালানির বিশেষ আইন তাদের সুরক্ষা দিচ্ছে। একই অবস্থা রামপাল ও অন্যান্য আরও বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে। এসব প্রকল্পের বিষয়ে জনগণের জানার সুযোগ নেই, যে কারণে এসব চুক্তিতে নানাবিধ অস্বচ্ছতা পাওয়া যাচ্ছে। এটা একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপও বটে।’

বড় অপরাধকে ধামাচাপা দিতে এবং এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি না করার কৌশল হিসেবেই দায়মুক্তি অধ্যাদেশ ও আইন ব্যবহৃত হয়েছে অতীতে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যার পর ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করা হয়েছিল। হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দিতে সেই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ অর্ডিন্যান্স (অধ্যাদেশ) জারি করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় সংসদ সেটি বাতিল করে। অন্যদিকে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ‘যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন ২০০৩’ পাস করা হয়েছিল। ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামে পরিচালিত অভিযানকে দায়মুক্তি দিতে এ আইন পাস করা হয়। ২০১৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এ আইন বাতিল করে দেয়।