ভ্যাটের বোঝা সাধারণের ঘাড়ে

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের ভ্যাট (ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স) বা মূসক (মূল্য সংযোজন কর) আদায়ের ছক কষা হয়েছে। এর পরিমাণ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মোট লক্ষ্যমাত্রার ৩৫ শতাংশ অর্থাৎ ১ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ঋণদানকারী সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলেরও (আইএমএফ) উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে সুপারিশ আছে।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন, বৈশ্বিক মন্দা ও ডলার সংকটের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। ভ্যাটের ভার বাড়ানো হলে অনেক খাতে খরচ বাড়বে। এতে সাধারণ আয়ের বেশিরভাগ মানুষের ভোগান্তিও বাড়বে।

এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভ্যাট যোগ করে দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করা হয়। সাধারণ মানুষ দামের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে ঠিকই ভ্যাট পরিশোধ করে। বিক্রেতারা কড়ায় গন্ডায় হিসাব কষে তা আদায়ও করে। ভ্যাট বাড়ানোর অজুহাতে দাম বাড়ানো হয়। আদায়কৃত ভ্যাট বেশিরভাগ ব্যবসায়ী সরকারের কোষাগারে জমা দেয় না, অনেক সময় কিছু জমা দেয়। এ ফাঁকি ধরতে এনবিআরের সক্ষমতা এখনো হয়নি। তাই লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলেও আদায় তেমন বাড়ে না। সরকার লাভবান কম হয়। সাধারণ মানুষ কিন্তু ভ্যাট পরিশোধ থেকে রেহাই পায় না। শেষ পর্যন্ত অসাধু ব্যবসায়ীদের পকেট ভারী হয়।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৬ কোটি মানুষের এ দেশে পরোক্ষ করে অর্থাৎ ভ্যাটে নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের অর্থাৎ আয়করের জাল বিস্তারে মনোযোগী হওয়া উচিত। এতে সাধারণ মানুষের ওপর রাজস্বের বোঝা কমবে, সম্পদশালীরা নজরদারিতে আসবে।

লক্ষ্যমাত্রা : আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য মোট জাতীয় বাজেটের অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ প্রায় ৫৮ শতাংশ অর্থায়নের দায়িত্ব চাপানো হতে পারে রাজস্ব বোর্ডের কাঁধে। অর্থাৎ চলতি বছরের তুলনায় ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ বাড়িয়ে ধরা হতে পারে। এ হিসাবে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণের কথা আছে। এনবিআর এ লক্ষ্যমাত্রা কমাতে আবেদন জানিয়েছে। এখনো পর্যন্ত তা আমলে আনেননি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। চলতি বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ৩৫ শতাংশ বা ১ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে। চলতি বছরে এ হিসাব ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।

এরপর ভ্যাট থেকে আয়কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ধরা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার ৩৪ শতাংশ বা ১ লাখ ৪৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এ হিসাব ১ লাখ ২২ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

আগামী অর্থবছরে মোট লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে সবচেয়ে কম ৩১ শতাংশ বা বাকি ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা শুল্ক হিসেবে ধার্য করা হতে পারে। চলতি বছর এ হিসাব ১ লাখ ১১ হাজার টাকা।

বিগত দিনেও ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি। আয়কর ও শুল্ক খাত থেকে আদায়ের হিসাবও বেশি ছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট আদায়কৃত ভ্যাট ১ লাখ ৩০০ কোটি টাকা। এর পরের ২০২০-২১ অর্থবছরে ভ্যাট খাতে মোট আদায় হয়েছিল ৯৩ হাজার কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট ভ্যাট আদায় হয়েছে ৮৪ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বাজেট প্রস্তাব প্রণয়নের প্রথম ধাপে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরের জোরালো আপত্তিতে ২০ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে।

এনবিআর রাজস্ব বাজেট প্রস্তুত কমিটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশনা করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈশ্বিক মন্দা ও ডলার সংকটের কারণে অর্থনীতির গতি কমেছে। এরই মধ্যে রাজস্ব বোর্ডের ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চলতি অর্থবছর শেষে ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলে এনবিআরের ওপর চাপ বাড়বে।

এনবিআর সাবেক চেয়াম্যান বলেন, অবাস্তব বাজেট দিয়ে অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করে কাকে খুশি করতে চাচ্ছে? যাদের দেখাতে এসব হিসাব কষা হচ্ছে তারাও জানে এটা আদায় করা সম্ভব না।

আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের বাজেট দিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ‘আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হারসংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল’ এবং ‘বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটির’ বৈঠকে প্রাথমিকভাবে বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৫৯ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা।

ভ্যাটের প্রভাবে চাপে পড়বে সাধারণ মানুষ : উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, গত ছয় মাস আগেও যে প্লাস্টিকের স্যান্ডেলের দাম ছিল ২০০ টাকা, তা বৈশ্বিক মন্দা ও ডলার সংকটের কারণে এখন বেড়ে হয়েছে ২৫০ টাকা। এখন ধরে নিই আগামী অর্থবছরে ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর কারণে ভ্যাটের হার ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশ করা হলো। শুধু ভ্যাট বাড়ানোর কারণে স্যান্ডেল জোড়া কিনতে হবে ২৮৭ টাকা ৫০ পয়সা। অন্যদিকে ছয় মাস আগে বিক্রি হওয়া ৪৫ টাকার পাউরুটি ডলার সংকটের কারণে এখন বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকায়। ভ্যাটের হার দুই শতাংশ বাড়ানোর কারণে এ পাউরুটির দাম হবে ৬৬ টাকা। ক্রেতার আয় কমবেশি হলেও প্লাস্টিকের স্যান্ডেল ও পাউরুটি সবাইকে একই দামে কিনতে হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ধনী-দরিদ্র সবাইকে একই দামে পণ্য কিনতে হয়। তাই ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে। তিনি বলেন, ভ্যাটে নির্ভরতায় রাজস্ব আদায়ের কৌশল নির্ধারণ করা হলে ভ্যাটে ঘাটতি থাকলে মোট রাজস্ব আদায়েও তার প্রভাব পড়বে। গত কয়েক বছর ধরেই এনবিআর ঘাটতিতে আছে। বৈশি^ক মন্দা ও ডলার সংকটের কারণে অর্থনীতিতে সুবাতাস নেই। এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে সমগ্র অর্থনীতি চাপে পড়বে। অর্থনীতির আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হবে।

আইএমএফের শর্ত ও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ছক : আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে আইএমএফের শর্ত পূরণ করে সংস্থাটির (আইএমএফ) কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে সরকার। শর্ত মেনে আগামী তিন অর্থবছরে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে হবে। এর মধ্যে আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই আদায় বাড়াতে হবে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ে ভ্যাট খাতে জোর দিতে আইএমএফ থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ভ্যাট অব্যাহতি তুলে দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এতে কৃষি, পশুসম্পদ, মৎস্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা সেবা খাত, অর্থাৎ জিডিপির ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ অবদান রাখে, এমন খাতগুলোর ওপর ভ্যাট বসতে পারে। দেশি শিল্পের অনেক খাতে, অনেক কাঁচামাল আমদানিতেও নতুনভাবে ভ্যাট দিতে হবে। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২৯১২ এর প্রথম তফশিল অনুযাযী প্রায় ৪৮৯ এইচএস কোডভুক্ত প্রাথমিক পণ্য, জীবন ধারণের জন্য মৌলিক পণ্যসহ প্রায় ৫০টি সেবার ওপর ভ্যাট আরোপ হতে পারে। এভাবে জিডিপির প্রায় ৫০ শতাংশ পণ্য সেবায় নতুনভাবে ভ্যাট বসতে পারে।

ভ্যাটের সবটা সরকারের কোষাগারে আসে না : প্রয়াত সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার বলেছিলেন, সারা দেশে ভ্যাট প্রদানে সক্ষম প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। এনবিআরে পুরনো পদ্ধতিতে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গড়ে সাড়ে সাত লাখ। এর মধ্যে প্রতি বছর রিটার্ন দাখিল করেছে গড়ে ৩২ হাজার। এর মধ্যে অনলাইনে নিবন্ধন নিয়েছে গড়ে দুই লাখের বেশি।

এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ভ্যাট নিয়েও অনেক প্রতিষ্ঠান সরকারি কোষাগারে ভ্যাট জমা দেয় না। এসব এনবিআরের নজরদারির বাইরে আছে।’

ভ্যাট আদায় স্বচ্ছতা আনতে ইএফডি (্ইলেকট্রিক ফিসক্যাল ডিভাইস) ব্যবহারে উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। এনবিআর সদস্য (মূসক মূল্যায়ন ও বাস্তবায়ন) মইনুল খান দেশ রূপান্তকে বলেন, ‘ভ্যাট ফাঁকিবাজদের চিহ্নিত করতে এনবিআর জরিপ শুরু করেছে। আদায়ে স্বচ্ছতা আনতে এরই মধ্যে সারা দেশের বিক্রয় কেন্দ্রে ইএফডি যন্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ১০ হাজার যন্ত্র বসানো হয়েছে।’

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন দেশ রূপান্তকে বলেন, ‘চার-পাঁচ বছর হয়েছে ইএফডি যন্ত্র দেওয়ার কথা বলা হলেও এখনো তা সামান্যই বাস্তবায়ন হয়েছে।’