আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার কথা বলে আসছে সরকার। তাতে বিএনপির অবস্থানে এখন পর্যন্ত দৃশ্যত কোনো পরিবর্তন আসেনি। তারা শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে রাজি নয়। সংবিধানের মধ্য থেকে নির্বাচন করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ধরে রাখতে অন্তত চার ধরনের কৌশল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।
এসব কৌশলের অংশ হিসেবে নির্বাচনের আগে দলবদলের খেলায় নামতে যাচ্ছে দলটি। এই খেলা নির্ভর করবে মাঠের বিরোধী দল বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়ার ওপর। বিএনপি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত অংশ না নিলে দলবদলে ইন্ধন দেবে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। আর বিএনপি অংশ নিলেও ভিন্ন ফর্মুলায় দল ছেড়ে কেউ সংসদ সদস্য হতে চাইলে তাদের উৎসাহ জোগাবে। সরকারি দলের নিশানায় রয়েছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা, যাদের বয়স ৬৫ বছরের বেশি এবং পরে সংসদ সদস্য হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে দলটির এমন কৌশলের কথা জানা গেছে।
বিএনপি ১০ দফা দাবিতে আন্দোলন করছে। গত বছরের আগস্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করা দলটি গত ডিসেম্বরে ঢাকায় সমাবেশ করে ১০ দফা তুলে ধরে। ওইদিন সংসদে থাকা তাদের সাত সদস্য পদত্যাগ করেন। এসব দাবির মধ্যে অন্যতম হলো বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন করবে না।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের যে কজন নেতার সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়েছে তারা বলেছেন, আওয়ামী লীগের বিশ্বাস, সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এবার দলবদলে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবেন। কারণ অনেক নেতার এবারের পর আর নির্বাচন করার শারীরিক সক্ষমতা থাকবে না। রাজনীতি থেকে বিদায় নিতে হবে অনেক বর্ষীয়ান রাজনীতিককে। এসব নানা দিক ভেবে দলত্যাগ করে হলেও সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে চাইবেন তারা।
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিভিন্ন নেতাকে টোপ দিয়ে রেখেছে আগে থেকেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়া উপনির্বাচনে উকিল আবদুস সাত্তারের অংশ নেওয়া সেই টোপেরই অংশ। ছোট দলের নেতারা যেমন বড় দলে যেতে চাইবেন, মনোনয়ন নিশ্চিত করার শর্তে বড় দল থেকেও ছোট দলে যোগ দেবেন অনেকেই। জুলাইয়ের পর থেকে এ প্রক্রিয়া জোরালোভাবে শুরু হবে।
উল্লেখ্য, সংসদ থেকে পদত্যাগ করা বিএনপির সাতজনের মধ্যে ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আবদুস সাত্তার। তিনি দল ত্যাগ করে আবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে উপনির্বাচনে অংশ নেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন এলে সব রাজনৈতিক দলেরই কিছু কৌশল থাকে। কিছু এক্সপেরিমেন্ট (পরীক্ষা-নিরীক্ষা) থাকে। এগুলো এখনো পরিপূর্ণ হয়নি, বলার মতো কিছুও হয়নি।’
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার দাবি, মাঠের বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে না এলে ওই দল থেকে সংসদ সদস্য হতে কমপক্ষে ১০০ নেতা কোনো দলে না ভিড়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন। তাদের দাবি, বিএনপির শতাধিক নেতা আছেন যারা নির্বাচনের বাইরে থাকতে রাজি নন। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও তারা নির্বাচন করবেন এমন একটি আভাস আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলতে আওয়ামী লীগও দলবদল প্রক্রিয়ায় ইন্ধন জোগাবে। অন্য অনেক ছোট দলকে বড় করা, বিভিন্ন দল নিয়ে জোট করা এবং জোটের মাধ্যমে বিভিন্ন দলের বড় ও পরিচিত নেতাকে ভোটে নিয়ে আসতে এই কৌশল নিয়েছেন ক্ষমতাসীনরা।
আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া উপনির্বাচনে বিএনপির সাবেক নেতা উকিল আবদুস সাত্তারকে যেভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে, একই কায়দায় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও দলছুট নেতাদের সংসদ সদস্য বানাতে সহযোগিতা করা হবে। সংসদ সদস্য হতে পারবেন এমন নিশ্চয়তা যত পাওয়া যাবে দলবদলের খেলা তত জমে উঠবে।
আওয়ামী লীগ সূত্র বলছে, নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীনরা এখন পর্যন্ত চার ধরনের কৌশল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন। দলবদলের খেলা বা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের বের করে আনার কৌশল কাজে না এলে সে ক্ষেত্রে অন্য কৌশল নেওয়া হবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচনে আসবে এটা আমি বিশ্বাস করি। যদি না আসে সে ক্ষেত্রে বিএনপির ৬৫ থেকে ৭৫ বছর বয়সী সবাই নির্বাচনে আসার সুযোগ খুঁজবেন। কারণ, এ নির্বাচনে সংসদ সদস্য না হলে আর সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ নেই তাদের। ফলে দলবদল ঘটবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকের।’ তার দাবি, ‘বিএনপি নির্বাচনের বিরুদ্ধে থাকলেও তাদের দলের বেশির ভাগ নেতাকর্মীই নির্বাচন করতে চান। তাই দলবদল করা লোকের সংখ্যা এ নির্বাচনে বাড়বে।’
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের তিন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবারের নির্বাচনে অনেক বেশি আসন নেওয়ার পরিকল্পনা ক্ষমতাসীনদের ভেতরে নেই। সর্বোচ্চ ১৬০/১৮০ আসন টার্গেট করেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। ছেড়ে দেওয়া আসনে ভোটের আগে গঠিত মোর্চাকে মাঠে নামানো হবে। এ ছাড়া দলছুট নেতাদেরও ওই আসনগুলোতে নামানো হবে। সুবিধা পাবেন এমন বেশ কজন প্রার্থীকে জেতানোর দায়িত্বও নেবে আওয়ামী লীগ।
দলটির সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের লক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, পাশাপাশি চতুর্থ দফা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পথ প্রশস্ত করা। এ দুটি বিষয় মাথায় রেখে সব ধরনের কৌশলে খেলবে নির্বাচন পর্যন্ত। যে খেলায় সফল হবে বা সম্ভাবনা থাকবে সফল হওয়ার শেষ পর্যন্ত তার সবই করে যাবে আওয়ামী লীগ।
যদিও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সংসদ উপনেতা মতিয়া চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এ সম্পর্কে অবহিত নই। প্রয়োজনের বাইরে আমি কোনো ব্যাপারে জানার চেষ্টা করি না।’
গত সোমবার আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলীয় একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে দলের এ কৌশলের ইঙ্গিত দেন। তিনি দাবি করেন, ‘উকিল আবদুস সাত্তারের মতো বিএনপির অনেকে গোপনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। উকিল আবদুস সাত্তার একজন নন, এখন অনেক আছেন। উকিল আবদুস সাত্তারের অভাব নেই, তলে তলে কতজন যোগাযোগ করছেন, অপেক্ষা করুন।’ ওই অনুষ্ঠানে কাদের বলেন, ‘বিএনপির ভোটের বাজার খারাপ।’