ভয়াবহ আগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত রাজধানীর বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দোকানিদের জন্য অস্থায়ী চৌকি বসানোর কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়েছে। আজ বুধবার দুপুর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের তাদের মালামাল নিয়ে চৌকিতে বসার কথা রয়েছে। কিন্তু সব ব্যবসায়ী সেখানে জায়গা পাবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন অনেকে। এ ছাড়া এমন অনেক ব্যবসায়ী রয়েছেন যাদের পুড়ে যাওয়া মার্কেটে সাত থেকে দশটি দোকানও ছিল, তারা এখন সেসব দোকানের পজিশন হাতছাড়া হওয়ার আতঙ্কে আছেন।
কাঠ ও টিনের তৈরি তিনতলা বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সটি আগুন লেগে সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধানে সেখানকার পোড়া বর্জ্য অপসারণ করে খোলা জায়গায় অস্থায়ীভাবে বেচাকেনার জন্য চৌকি বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেক ব্যবসায়ী গুলিস্তানের বিভিন্ন মার্কেটসহ বঙ্গবাজার ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এদিকে বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা গেছে, জোরেশোরে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের পোড়া বর্জ্য অপসারণের কাজ চলছে। ধ্বংসস্তূপ অপসারণের কাজ শেষ পর্যায়ে। পুরো মার্কেট এলাকায় বালু ফেলে ইট বিছানো হয়েছে। তার ওপরই সাড়ে তিন ফুট বাই পাঁচ ফুট ও তিন ফুট বাই পাঁচ ফুট আকৃতির চৌকি বসানো হবে বলে জানিয়েছে মার্কেট কর্র্তৃপক্ষ।
ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ ব্যবসায়ী বলছেন, আগুনে ভস্ম হওয়া জায়গায় সব ব্যবসায়ীর জন্য চৌকি বসানো সম্ভব নয়। ফলে তারা কোথায় যাবেন, কীভাবে দোকান দেবেন তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন।
বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের আদর্শ মার্কেটের ফ্রেন্ডস কালেকশনের মালিক সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমার দোকান ছিল নিচতলায়, আমার ওপরে আরও তিনটি দোকান ছিল। শুধু নিচতলাতেই দোকান ছিল হাজারের ওপরে। এত দোকানি কোনোভাবেই বসার জায়গা পাবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘পোড়া দোকানের স্থানে চৌকি পাব কি না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। মালিক সমিতিও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিচ্ছে না। কাল (আজ বুধবার) বসার জন্য চৌকি কিনে যদি বসতে না পারি, তাহলে আরও ক্ষতির মুখে পড়ব। এ জন্য এখনো চৌকি কিনি নাই।’
বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতির নেতারা জানান, বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে ১.৭৯ একর জমি রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত দোকানিদের বসাতে সেখানে বালু ফেলে ইট বিছানো হচ্ছে। এরই মধ্যে সেখানে ৪০ গাড়ি বালু এবং প্রায় ৯০ হাজার ইট বিছানো হয়েছে। পুরো এলাকায় প্রায় ২.৫ লাখ ইট বিছানো এবং প্রায় ১৫০ গাড়ি বালু ফেলা হবে। আজকের মধ্যে পুরো এলাকায় বালু ফেলা ও ইট বিছানোর লক্ষ্যে করপোরেশনের সংশ্লিষ্টরা কাজ করে চলেছেন।
কাঠ ও টিনের তৈরি তিনতলা বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে চারটি আলাদা ইউনিট ছিল। সেগুলো হলো- বঙ্গবাজার, গুলিস্তান, মহানগরী ও আদর্শ মার্কেট। সব কটি ইউনিট মিলে দোকান ছিল ২ হাজার ৯৬১টি। এর মধ্যে বঙ্গবাজার ইউনিটে ৮৬৩, গুলিস্তান ইউনিটে ৮২৮, মহানগরীতে ৫৯৯ ও আদর্শ ইউনিটে ৬৭১টি দোকান ছিল।
বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের আদর্শ মার্কেট ইউনিটের সভাপতি শাহ আলম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবশ্যই সবাইকে বসানো যাবে না। সর্বসাকল্যে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ চৌকি মার্কেটের জায়গায় বসানো যাবে বলে মনে হচ্ছে। ১০০ চৌকি দিয়ে ২০০ জনকে পুনর্বাসিত করা যায় কি না আমরা দেখব। আর যারা বসার জায়গা পাবে না, তাদের বিষয়ে পরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি জানান, আদর্শ মার্কেট ইউনিটে মোট দোকান ছিল ৬৭১টি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০০ চৌকি বসানো যাবে।
বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. নাজমুল হুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের হাতে আর সময় নেই। আমরা কালকে বসে যেতে চাই। সবকিছু ঠিক থাকলে আমরা কাল বসে যাব। অন্তত একটা চৌকি হলেও একটা ঠিকানা হয়ে যায় ব্যবসায়ীদের।’
তিনি আরও বলেন, ‘যাদের একাধিক দোকান আছে, তাদেরও একটি চৌকি দেওয়া হবে। আমরা হিসাব করে দেখেছি চার ইউনিটে ২ হাজার ৮০০-এর মতো চৌকি বসানো যাবে। আর ১৬১টি আমরা বসাতে পারব।’
মার্কেটের বঙ্গবাজার ইউনিটে চৌকি বসানো হবে সাড়ে তিন ফুট বাই পাঁচ ফুট এবং অন্য তিনটি ইউনিটে তিন ফুট বাই পাঁচ ফুটের চৌকি বসানো হবে বলে জানিয়েছে মার্কেট কর্তৃপক্ষ।
বিকল্প খুঁজছেন ব্যবসায়ীরা : উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেক ব্যবসায়ী গুলিস্তানের বিভিন্ন মার্কেটসহ বঙ্গবাজার ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। বঙ্গবাজার ইউনিটের ‘মমিন হাওলাদার গার্মেন্টস’ নামে একটি দোকানের মালিক খায়রুল ইসলাম হাওলাদার গতকাল দুপুরে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উপায় না পেয়ে বঙ্গবাজারের পাশের মূল সড়কে অস্থায়ী চৌকিতে দোকান বসিয়েছি। গত বছরের এই সময়ে আমার দোকানে দিনে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। এখন আমার এই দোকানে দিনে মাত্র তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকার পোশাক বিক্রি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কাল থেকে (আজ বুধবার) অস্থায়ী চৌকিতে বিক্রির সুযোগ দেবে বলে জানিয়েছে। কিন্তু এখানে জায়গা পাব কি না? এ ছাড়া ঈদের পর থাকতে দেবে কি না? সেই অনিশ্চয়তা আছে। এখন কূল-কিনারা পাচ্ছি না কীভাবে এই ক্ষতি সামলে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরব। অনেকেই অন্য এলাকায় গিয়ে দোকান বসিয়েছে। আমিও একই পরিকল্পনা করছি।’
তবে বহু ব্যবসায়ী ধারদেনা করে কিংবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছিলেন। তারা সব হারিয়ে নতুন করে ব্যবসা শুরু করা নিয়েও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। এমনই একজন দেলোয়ার হোসেন। গতকাল তিনি দেশ রূপান্তকে বলেন, ‘বিভিন্নভাবে টাকা নিয়ে এবং নিজের সবটুকু সঞ্চয় নিয়ে ঈদের আগে মাল তুলেছিলাম। প্রায় ৩০ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। এখন অস্থায়ীভাবে বিক্রির সুযোগ দিলেও কী বিক্রি করব? পোড়ার কিছু বাকি নেই আমার।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি : বঙ্গবাজারের আগুনের ঘটনায় সুরক্ষা সেবা বিভাগের (উন্নয়ন) অতিরিক্ত সচিব সাইফুল ইসলামকে প্রধান ও সুরক্ষা সেবা বিভাগের অগ্নি অনুবিভাগের উপসচিব জাহিদুল ইসলামকে সদস্য সচিব করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১১ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে। গতকাল সকালে বঙ্গবাজার পরিদর্শন করতে গিয়ে উপসচিব জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে আমরা জানার চেষ্টা করেছি আগুন লাগার কারণ। এ জন্য আমরা বিভিন্ন ব্যবসায়ী, স্টেকহোল্ডার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেছি। সরকারের পক্ষ থেকে এটা পূর্ণাঙ্গ কমিটি। বঙ্গবাজার মার্কেটে আগুন লাগার কারণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, ব্যবসায়ীদের কীভাবে পুনর্বাসন করা যায়, সেসব নির্ধারণ করে আমরা চূড়ান্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে উপস্থাপন করব। সে জন্য আমরা ধাপে ধাপে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলব।’
গত ৪ এপ্রিল সকাল ৬টা ১০ মিনিটে বঙ্গবাজারে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছায় তারা। পরে প্রায় সাড়ে ৬ ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের ৫০টি ইউনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে তার আগেই আগুন কেড়ে নেয় সব। আগুনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে আশপাশের মার্কেটগুলোতেও তা ছড়িয়ে পড়ে। এই আগুনে আশপাশের ৬টি মার্কেটের ৫ হাজার ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে দাবি মার্কেট মালিক সমিতির।