২২ বছর ধরে বাংলা বর্ষবরণের দিনটি আসে একই সঙ্গে আনন্দ আর অতৃপ্তি নিয়ে। কারণ রমনা বটমূলে জঙ্গিদের পুঁতে রাখা বোমা বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনার দুই দশকের বেশি সময় পার হলেও অপরাধীদের চূড়ান্ত বিচার এখনো অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। ওই ঘটনায় ১০ জনকে হত্যা মামলায় আটজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে বিচারিক আদালতের রায় হয় সাড়ে আট বছর আগে। কিন্তু হাইকোর্টে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেপারবুক (মামলার রায়সহ যাবতীয় নথি) প্রস্তুত হলেও দণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আপিলের শুনানি নিয়ে বিচারকাজ শেষ হয়নি আজও।
এ মামলায় উচ্চ আদালতে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা বলেন, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত আলোচিত এ মামলাটি হাইকোর্টের একাধিক বেঞ্চে কার্যতালিকায় এলেও রাষ্ট্রপক্ষ শুধু সময় নিয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, কার্যতালিকায় এলেও বিচারক ও বিচারিক এখতিয়ার পরিবর্তন হওয়ায় শুনানি বিলম্বিত হচ্ছে। তবে, শিগগির শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা এ এম আমিন উদ্দিন।
নৃশংস ওই ঘটনায় বিস্ফোরক আইনের মামলাটি এখনো বিচারিক আদালতে বিচারাধীন। আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্কের শুনানি নিয়ে এ মামলাটিও দ্রুত নিষ্পত্তির দিকে যাবে বলে প্রত্যাশা রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের।
২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল সকাল। রমনা বটমূলে ছায়ানটের উদ্যোগে নববর্ষ বরণের অনুষ্ঠানে তখন শত শত মানুষ আনন্দে উদ্বেলিত। সেই উৎসবে পড়ে জঙ্গিদের থাবা। বটমূলের মঞ্চের সামনে আগে থেকে পুঁতে রাখা বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। ভয়াবহ ওই বিস্ফোরণে নিহত হন ১০ জন। আহত হন শতাধিক। এ ঘটনায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হুজির (হরকাতুল জিহাদ) শীর্ষ ১৪ জঙ্গিকে আসামি করে রাজধানীর রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা হয়। হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছরের বেশি সময় পর ২০১৪ সালের ২৩ জুন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত এক রায়ে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় হুজির শীর্ষ জঙ্গি মুফতি আবদুল হান্নান মুনশিসহ (পরে অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর) আটজনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দেয়। রায়ে ছয়জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
সর্বোচ্চ দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলো মাওলানা আকবর হোসেন, মুফতি আবদুল হাই, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মুফতি শফিকুর রহমান, মাওলানা তাজউদ্দিন ও আরিফ হোসেন ওরফে সুমন। তাদের মধ্যে আবদুল হাই, জাহাঙ্গীর আলম বদর, সেলিম হাওলাদার, তাজউদ্দিন এই চারজন এখনো পলাতক। অপর দণ্ডপ্রাপ্তরা কারাগারে। এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক শফিকুর রহমানকে গত বছরের ১৪ এপ্রিল গ্রেপ্তার করে র্যাব। এ ছাড়া যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তরা হলো হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা আবদুর রউফ, মাওলানা সাব্বির ওরফে আবুল হাসান সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া ও শাহাদাত উল্লাহ ওরফে জুয়েল।
ওই বছরের ২৬ জুন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। এরপর প্রধান বিচারপতির নির্দেশে ২০১৫ সালের অক্টোবরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই মামলার পেপারবুক প্রস্তুত হয়। পাশাপাশি কারাগারে থাকা আসামিরা আপিল করে।
রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষের আইনজীবীরা জানান, ২০১৭ সালের ৮ জানুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হলেও একপর্যায়ে বেঞ্চ পুনর্গঠন হলে শুনানি থেমে যায়। এরপর হাইকোর্টের আরও একাধিক বেঞ্চে শুনানি শুরুর তারিখ ধার্য হলেও একই কারণে সেটি আর হয়নি।
এ মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আকবরের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পেপারবুক প্রস্তুতের পর থেকে এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষ অসংখ্যবার সময় নিয়েছে। কিন্তু শুনানি শুরুর উদ্যোগ নেয়নি। আসামি দোষী না নির্দোষ এটি প্রমাণ করতে তো শুনানি করতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা তারা দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেবেন।’
জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনের বিধান হলো, হাইকোর্টের যে বেঞ্চে শুনানি শুরু হয় সেই বেঞ্চেই শুনানি শেষ করতে হয়। কিন্তু এর আগে বেঞ্চ পুনর্গঠন, বিচারিক এখতিয়ার পরিবর্তনসহ নানা কারণে শুনানি শুরু হলেও বিচার শেষ করা যায়নি। মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ, তাই আমরা সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ (২৭ এপ্রিল পর্যন্ত অবকাশ) শেষে শুনানি শুরুর উদ্যোগ নিতে চেষ্টা করব।’
ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো অন্যায় কিংবা ধ্বংসাত্মক অপরাধের বিচার দ্রুত হলে অন্যরা এ ধরনের কাজ করতে সাহসটা কম পায়। সেদিক থেকে মামলাগুলোর বিচার ত্বরান্বিত হওয়া উচিত। কেননা এটি শুধু ছায়ানটের অনুষ্ঠান নয়, এটা রাষ্ট্রের। সেদিক থেকে আমরা আশা করতে পারি যে বিচার নিষ্পত্তি দ্রুত হবে।’
বিস্ফোরক মামলা এখনো অনিষ্পন্ন : রমনা বটমূলে বিস্ফোরণের ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে পৃথক আরেকটি মামলা হয়। তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ২৯ নভেম্বর এ মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ মামলায় আসামি করা হয় একই ঘটনায় করা হত্যা মামলার ১৪ আসামিকে। অভিযোগ গঠনের পর বিস্ফোরক আইনের মামলাটির বিচারকাজ চলছিল ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ। গত বছরের ২১ মার্চ পর্যন্ত এ মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে ৫৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। ওই বছরের ৩ এপ্রিল কারাগারে থাকা আসামিদের ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থনের জবাব শুরু হয়। এরপর মামলাটি বদলি করা হয় ঢাকার সপ্তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালতে। আগামী ১৭ মে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্যের শুনানির দিন ধার্য আছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুরনো এই মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির বিবেচনায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ছিল। কিন্তু দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ায় সেটি এখন সপ্তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালতে বদলি করা হয়েছে। এখন আসামি পক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্য শেষে যুক্তিতর্কের শুনানি হবে। এরপর মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসবে। তিনি বলেন, ‘সাক্ষ্য ও জেরা যেহেতু শেষ হয়েছে তাই এখন খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়। আমরা যুক্তিতর্কের শুনানি দ্রুত শেষ করে বিচার নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেব।’