‘পেছনে কারা খুঁজে বের করতে হবে’

বাফুফের সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগের ওপর নেমে আসা ফিফার নিষেধাজ্ঞার খড়গে পুরো ক্রীড়াঙ্গনই যেন বিপর্যস্ত। দেশের মান ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ায় শুধু সাধারণ সম্পাদক নন, সংস্থাটির শীর্ষ কর্তাদের ওপর ক্ষোভ উগরে দিলেন সাবেক ফুটবলাররা।

আগেই এদের সরে যাওয়া উচিত ছিল
গোলাম সারোয়ার টিপু

ফিফার কাঠগড়ায় দোষী তো শুধু এক সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু সে এগুলো কারও নজরে না দিয়ে করেছে? একা একা? এটা বিশ্বাস করতে হবে? টাকা পয়সা যদি এদিক-সেদিক হয়ে থাকে, সভাপতি এটা জানবে না, এতগুলো সহসভাপতির কেউ জানবে না, বা অন্য যারা আছেন তাদের কারও কোনো নলেজে থাকবে না, এমন হতে পারে না। আবু নাঈম সোহাগ তো এখানে বেতনভোগী কর্মচারী। মুশকিল হলো- যারা নির্বাচিত তারা বাফুফেতে বেতনভোগীর মতো পারফর্ম করে। আর সোহাগ পারফর্ম করে নির্বাচিতদের মতো। পার্থক্য হয়ে গেছে এখানে। ফলাফলও তেমনই হয়েছে। ওর এই কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ওপরের দিকের কেউ জানে না, এটা কিছুতেই বিশ্বাস করার মতো নয়। আমরা তো মনে করেছিলাম, কাজী সালাউদ্দিনের হাতে ফুটবল থাকলে অনেক দূর এগিয়ে যাবে। কিন্তু দিনের পর দিন পিছিয়ে যাচ্ছে ফুটবল। মেয়েদের ফুটবল দলকে যখন অলিম্পিক বাছাইয়ে পাঠাতে ব্যর্থ হলো তখনই এদের সরে যাওয়া উচিত ছিল। সোহাগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর তো বটেই। কিন্তু এই নির্লজ্জদের বোধোদয় হবে বলে আমার মনে হয় না।

মুখোশ উন্মোচন করতে হবে
আবদুল গাফফার

প্রথমেই বলব, আবু নাঈম সোহাগ একজন বেতনভুক্ত কর্মচারী। ফিফার রুলস অনুযায়ী আবু নাঈম সোহাগ সেক্রেটারি, নট জেনারেল সেক্রেটারি। জেনারেল সেক্রেটারি সাধারণত হতে হয় নির্বাচিত প্যানেল থেকে। বাংলায় সাধারণ সম্পাদক যেটাকে আমরা বলি, তাকে নির্বাচন করে সাধারণ সম্পাদক হতে হয়। আমরা এই জায়গাটায় তাকে এত ওপরে তুলে দিয়েছি...। এখন সে যে কাজটা করেছে, কোনোভাবেই সে এটা একা করেনি। এরসঙ্গে অনেক রাঘব-বোয়াল আছে এবং তারা তার কাঁধে বন্দুক রেখে এই কাজগুলো করেছে দীর্ঘদিন যাবৎ। আমরা অনেক দিন ধরে এই সব অনিয়মের প্রতিবাদ করে আসছি। ফিফাতে কাগজপত্রও জমা দিয়েছি। আজ ২০২৩ সালে এসে তদন্তের মাধ্যমে সে সব বেরিয়ে আসছে। সাধারণ সম্পাদককে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এখন কান টানলে মাথা আসবে। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের ক্রীড়ামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করি, এটার সুষ্ঠু তদন্ত করে কারা কারা জড়িত তাদের বের করা হোক। একই সঙ্গে বলব এই কাজী সালাউদ্দিন ও তার গংদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। আমরা সোচ্চার হচ্ছি। লজ্জা যদি থাকে, যত দ্রুত সম্ভব এদের পদত্যাগ দাবি করি।

আগেই অনুমান করেছিলাম
আশরাফউদ্দিন চুন্নু

খবরটা শুনতেই খুব কষ্ট পেয়েছি। কারণ এটা বাংলাদেশ। আমাদের দেশের ওপরে যদি এরকম নিষেধাজ্ঞা আসে বিশ্ব ফুটবলের প্রতিষ্ঠান থেকে, নিশ্চয়ই আমার বুক ব্যথা হয়ে যাবে এবং গেছেও। এরকম কিছু আশা করিনি। তবে তাদের আচরণে আমি কিন্তু বিভিন্ন সময় বলে আসছিলাম, এরকম ঘটনা ঘটতে পারে। তাড়াতাড়ি তারা যেন এটার পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু কী পদক্ষেপ নেবে। তারা তো নিজেরাই অন্যায় করে বসে আসে। তারা বলে আমরা সব ঠিকঠাক করে আসছি, সব ম্যানেজ হয়ে গেছে। আলটিমেটলি কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা ফিফা কোনো ছাড় দেয় না এবং দেয়নি। আবু নাঈম সোহাগ একজন পেইড কর্মচারী। সে কিন্তু অ্যাপ্রুভাল নিয়েই সে এগুলো করেছে। আমার কথা হচ্ছে কে অ্যাপ্রুভাল দিয়েছে, কারা কারা দিয়েছে এগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। আমাদের দেশে সংশ্লিষ্ট যারা আছে, তারা খতিয়ে দেখবে বলে আমি বিশ্বাস করি। ও (আবু নাঈম সোহাগ) একটা দায়িত্বে আছে বলে ওকে সাসপেন্ড করেছে। কিন্তু এর পেছনে কারা আছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে। তবে আমি বিশ্বাস করি খুব দ্রুতই ফিফা এগুলো খুঁজে বের করে সামনে আনবে।

সভাপতি সাহেবের দাম্ভিকতা ক্রীড়াঙ্গনে সাজে না
শেখ মোহাম্মদ আসলাম

আমি ব্যথিত। ফুটবলের এই ক্রান্তিলগ্নে এই ধরনের ঘটনা ফুটবলকে কতটা পিছিয়ে দেবে এর কোনো সীমা নেই। এরা এত বেশি দাম্ভিক, এত বেশি ঔদ্ধত্যপূর্ণ তাদের কথাবার্তা... আমি বলব আল্লাহ তার সঠিক বিচার করেছে। সেই সঙ্গে জনগণের কাছে বিচারের দায়ভার দিয়ে বলতে চাই, ফুটবলের উত্তরণ ঘটাতে হবে এখন থেকে। আমাদের সভাপতি সাহেবের যে দাম্ভিকতা, এটা ক্রীড়াঙ্গনে সাজে না। গাছে যত বেশি ফল হয়, সেই গাছ তত বেশি নুয়ে পড়ে। এটা আমাদের বাংলা প্রবাদ। আর উনি যা তা বলে ফেলেন আমাদের নিয়ে। আমাদের যে অতীত গৌরব ছিল, সেই গৌরবকে তিনি ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছেন নিজের এবং নিজের কর্মীদের কর্মকাণ্ড দিয়ে। আমি বলব ফেডারেশনের এখন স্বেচ্ছায় সরে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু, কে জানে তারা হয়তো এটাকেও (সাধারণ সম্পাদকের নিষেধাজ্ঞা) মহতি কাজ বলবে, গর্বে হয়তো আজ তারা গদগদ। ওদের তো এগুলো নিয়ে কোনো চিন্তাই নেই। মেয়েদের অলিম্পিকে না পাঠানো নিয়ে যে কেলেঙ্কারিটা হলো, এরপর তারা বলে এটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। এটা কোনো কথা? ইচ্ছেকৃতভাবে তারা এটা করেছে। এ সব কিছুর সুরাহা হওয়া উচিত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। 

নিশ্চয়ই বাদলের আত্মা শান্তি পাচ্ছে
হাসানুজ্জামান খান বাবলু

খবরটা তো আমরা কাল (পরশু) পেলাম। কিন্তু আমি বলব, এত দিনের অন্যায়-অবিচার... ১৫ বছর পরে এসে এর সবকিছুর পেছনের সত্যিটা আজ প্রকাশ হলো। এতদিন মিথ্যাচার দিয়ে ফুটবল ফেডারেশন জাতিকে ধোঁকা দিচ্ছিল, আলটিমেটলি আজ বিশ্ব ফুটবল সংস্থা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, তোমাদের এখানে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং স্বেচ্ছাচারিতা ছাড়া কিছুই হচ্ছে না। যা আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশে ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে বড় লজ্জাজনক দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। এই লজ্জার বাইরে তো আমরা না। কারণ আমাদের পরিচয় ফুটবল। সেই ফুটবলের যে অহংকার আমাদের ছিল, সেই অহংকারকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অনিয়ম, দুর্নীতি করে, যার যার পকেট ভারী করে। আমরা গত ১০-১২ বছর এগুলো নিয়েই প্রতিবাদ করেছি, সোচ্চার ছিলাম। আজ আমার বাদল রায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। সাবেক ফুটবলার ও ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সহসভাপতি, যাকে এই সাধারণ সম্পাদক অপমান করেছিলেন। শুধু মাত্র দুর্নীতির প্রতিবাদ করার জন্য। নিশ্চয়ই আজ বাদল রায়ের আত্মা সব দেখতে পাচ্ছে। সে তার ঈশ্বরের কাছে যে বিচার রেখেছিল, এটা আজ শুরু হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই বাদলের আত্মা আজ শান্তি পাচ্ছে।

আমরা এই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফুটবল খেলেছি। ২০ বছর কোচিংয়ের সঙ্গে জড়িত থেকেছি। ফেডারেশনের মেম্বার হিসেবে সালাউদ্দিন সাহেবের সঙ্গেই ঢুকেছিলাম। উনি খেলোয়াড় হিসেবে সর্বোচ্চ সম্মানটা পেয়েছেন। কিন্তু তার হাত ধরেই আজ বাংলাদেশের ফুটবলে সবচেয়ে কালো অধ্যায়ের রচনা হলো।

আবু নাঈম সোহাগের হয়তো শাস্তি হয়েছে। কিন্তু সে যে দুর্নীতিগুলো করেছে, সেটা ফেডারেশনের বসদের বাইরে তো হয়নি। সুতরাং আমি মনে করি, সোহাগকে আজ সরিয়ে দিলে সরে যাবে। কিন্তু তাকে দিয়ে যারা এই কাজ করিয়েছে, তাদের সম্মুখে নিয়ে আসা উচিত। গত ১০-১২ বছরে আমরা যথেষ্ট প্রতিবাদ করেছি, যথেষ্ট অনিয়মের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা সব সময় স্ট্যান্ডবাজি করে, জাতিকে ধোঁকা দিয়ে গেছে। কিন্তু আজ আমি বলব, আল্লাহর শেষ বিচার বলে যে কথা আছে সেটা শুরু হয়েছে।