গরম পৌঁছাল চরমে বৃষ্টি নেই ঈদের আগে

সারা দেশেই বয়ে যাচ্ছে মৃদু থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ। এর মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা চুয়াডাঙ্গায় ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে চরম তাপপ্রবাহ। গতকাল শনিবার জেলাটিতে ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। সেখানে অতি প্রয়োজন ছাড়া জনসাধারণকে ঘরের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তীব্র গরমের কারণে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে নানা ধরনের রোগে। জেলায় জেলায় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে গরমজনিত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে হু-হু করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে চলতি মৌসুমে বর্ষা আসতেও বিলম্ব হতে পারে।

গতকাল রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রা ছিল রাজধানী ঢাকায়ও। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, রাজধানীতে গতকাল ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা ১৯৬৫ সালের পর সর্বোচ্চ। অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চুয়াডাঙ্গা, ঢাকা ছাড়াও খুলনা বিভাগের বাকি সব জেলা, ঢাকা, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা ও পটুয়াখালী জেলার ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, যা আগামী কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। কোনো কোনো এলাকার তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে চরম তাপপ্রবাহে রূপ নিতে পারে।

তাপমাত্রা যদি ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে, তবে তাকে বলা হয় মাঝারি তাপপ্রবাহ। আর তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলে তা হয় তীব্র তাপপ্রবাহ। ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হলে তা হয় চরম তাপপ্রবাহ।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে টানা ১৪ দিন ধরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়। গতকাল যা ছিল যা ৪২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকালের তাপমাত্রা ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হলেও অতীতে কখনো একটানা এভাবে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড হয়নি।

গতকাল ফরিদপুরে ৪১ দশমিক ৩, ঈশ্বরদীতে ৪১ দশমিক ২, মোংলায় ৪০, সাতক্ষীরা ও কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ৪০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। এ ছাড়া দেশের ৪৪টি আবহাওয়া স্টেশনের মধ্যে ৩৮টি স্টেশনেই বইছে তাপপ্রবাহ।

এদিকে তাপপ্রবাহে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। চুয়াডাঙ্গায় প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া কেউ ঘর থেকে বাইরে বের হচ্ছেন না। জেলা প্রশাসনও প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এর আগে গত ২ এপ্রিল থেকে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা চুয়াডাঙ্গায়। প্রতিদিনই বাড়ছে তাপমাত্রা। একটানা তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় হিটস্ট্রোক, ডায়রিয়া, শিশুদের নিউমোনিয়াসহ গরমজনিত রোগবালাই বেড়ে গেছে। চুয়াডাঙ্গায় ১০০ শয্যার সদর হাসপাতালে আজ অন্তর্বিভাগে অন্তত ১৭০ জন রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ ছাড়া বহির্বিভাগে প্রায় এক হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

তীব্র দাবদাহে শ্রমিক, দিনমজুর, রিকশা-ভ্যানচালকরা অস্থির হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও খেটে খাওয়া মানুষ। তীব্র তাপদাহে প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া বাইরে না যেতে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহরের অলিগলি, গ্রামগঞ্জে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিস বলছে, আগামী বুধবার পর্যন্ত তাপমাত্রা প্রতিদিনই বাড়তে পারে। চলতি সপ্তাহেই তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রিতে পৌঁছাতে পারে। প্রচণ্ড থেকে প্রচণ্ডতর দাবদাহ দেখা দিতে পারে।

চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জানান, ১৪ দিন ধরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করছে চুয়াডাঙ্গায়।

তাপমাত্রা নিয়ে কোনো সুখবর নেই জানিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাপমাত্রা নিয়ে কোনো সুখবর নেই। শুধু বাংলাদেশ নয়, দেশের আশপাশের এলাকাগুলোতেও বইছে তাপপ্রবাহ। আগামী ১০ দিনেও বৃষ্টির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।’

টানা তাপপ্রবাহের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বছরের এ সময় দক্ষিণ-পূর্ব (বঙ্গোপসাগর) দিক থেকে হালকা পরিমাণে আর্দ্রতাপূর্ণ বাতাস দেশে প্রবেশ করে থাকে। যখন প্রবেশ করে তখন কালবৈশাখী ঝড় দেখা যায়। কিন্তু এবার সেই বাতাস টানা প্রবেশও করছে না, কালবৈশাখী ঝড়ও হচ্ছে না। এতে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে যে ঝড়ের দেখা পেয়ে আসছিল দেশ, এবার সেটাও হলো না।’

কবে নাগাদ সেই আর্দ্রতাপূর্ণ বাতাস প্রবাহিত হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আর্দ্রতাপূর্ণ বাতাস একটু প্রবেশ করে। কিন্তু প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত তাপের কারণে বাষ্প হয়ে যায়। তাই এই বাতাস টানা প্রবেশ করতে হবে। আগামী ১০ দিনের স্যাটেলাইট চিত্রতে দেখা যায়, আর্দ্র বাতাস সাগরে নেই এবং টানা প্রবেশ করার সম্ভাবনা নেই। তবে এ সময়ের পর হয়তো সেই বাতাস অব্যাহত থাকতে পারে। আর তা করলে তাপমাত্রা কমে এসে কালবৈশাখী ঘটাবে।’

এদিকে এই আবহাওয়া কালবৈশাখী ও টর্নেডো সৃষ্টি হওয়ার মোক্ষম সময় বলে উল্লেখ করেন অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. আশরাফ দেওয়ান। তিনি বলেন, ‘পুবালি বাতাস ও পশ্চিমা বাতাস মিলনের স্থলে কালবৈশাখী হয়ে থাকে। বর্তমান আবহাওয়া এটির জন্য একেবারে উপযুক্ত সময়। আর কালবৈশাখী না হলে মৌসুম সক্রিয় হবে না, মৌসুম সক্রিয় না হলে মৌসুমি বাতাস আসবে না এবং বর্ষাকাল আসবে না।’

কিন্তু আলোচিত সেই পুবালি বাতাস আসছে না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে একাধিক আবহাওয়াবিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশের দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে আসা সেই বাতাসে জলীয় বাষ্প তথা আর্দ্রতা নেই। আর এতেই বিপত্তি দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিম দিক থেকেও আসছে শুষ্ক বাতাস। দুই প্রান্ত থেকে আসা শুষ্ক বাতাসের কারণে দেশজুড়ে গরমের তীব্রতা চলছে।

এপ্রিল ও মে মাস দেশের সবচেয়ে উষ্ণতম মাস। অতীতের রেকর্ডে দেখা যায়, ১৯৬০ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকায় সর্বোচ্চ ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি ও ২০১৪ সালের ২৫ এপ্রিল ৪০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়। অন্যদিকে সারা দেশে ১৯৭২ সালের ১৮ মে সর্বোচ্চ ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল। এখন পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে তা সর্বোচ্চ। অন্যদিকে গত দুই দশকের মধ্যে ২০১৪ সালের ২৫ এপ্রিল যশোরে সর্বোচ্চ ৪২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়।