একটা কথা তো ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় এখন প্রায় প্রতিদিন। দেশে এত সংকট, কিন্তু সবচেয়ে বড় সংকট অনুসরণ করার মতো কোনো চরিত্র নেই। মানুষ কার কাছে শিখবে, কার কাছে যাবে, কোথা থেকে পাবে সাহস? চারদিকে চালাক মানুষের ভিড়ে কোথায় পাবে সরল মানুষ, যার কাছে দুঃখের কথা বলা যায়। ক্যারিয়ারের কথা বলছে সবাই, ক্যারেক্টার তৈরি করার কথা তো বলছে না কেউ। নিজেকে বড় ভাবার মানুষের অভাব নেই, কিন্তু নিজেকে বড় করে তোলার সংগ্রামে লিপ্ত আছেন তেমন মানুষ কই? লক্ষ্যে অবিচল থেকে লক্ষ্য অর্জনের জন্য সাধ্যমতো সব করা যায় কিন্তু কোনো কিছুর জন্যই লক্ষ্য বিচ্যুত হওয়া যায় না এমন দৃষ্টান্ত কোথাও তো দেখি না। অপমানের জ্বালা সবাইকে উত্তেজিত করে, কিন্তু যখন কাজটাই প্রধান তখন অপমানকে ব্যক্তিগতভাবে গায়ে না মেখে সবাইকে নিয়ে কাজ করার মানসিকতাসম্পন্ন মানুষ কোথায়? এ রকম অনেক চাওয়া, না পাওয়া, হাহাকার আর হতাশার মধ্যেও অবিচল থেকে একজন মানুষ যে তার কর্তব্য পালন করে গেলেন তা কি দেশের মানুষ খেয়াল করেছেন?
কারও কারও কাছে বয়স একটা বোঝার মতো। মানুষ বলে, তিনি বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। কারও কাছে বয়স একটা সুবিধার হাতিয়ার। নিজের মতটাকে অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার, কারও মতামত না শোনার অজুহাত। আমরা যখন কাজ করেছি, এই বলে শুরু করে অন্য কাউকে বলার সুযোগ না দেওয়ার কার্যকর অস্ত্র। আবার কারও কারও কাছে বয়স একটা সংখ্যা মাত্র। ক্রমাগত বাড়ে কিন্তু কাবু করে ফেলে না, উদ্যমকে লাগাম পরাতে দেয় না, কৌতূহলকে অবদমন করেন না বরং কৌতূহলের বাতাসে পাল উড়িয়ে দেন, সবসময় থাকেন আগ্রহী এবং উদ্যোগী। কেউ আবার বয়সজনিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান বর্তমানের সমস্যা সমাধানে। তার তো বয়স নিয়ে ভাবনার সময়ই থাকে না। একজন সে রকম আমৃত্যু যুবক ছিলেন আমাদেরই মাঝে। যিনি তার ৮১ বছর বয়সকে থোরাই কেয়ার করে ১৮ বছরে নামিয়ে এনেছিলেন। ছুটেছেন অবিরাম। কিন্তু আমরা কি তার যৌবনের শক্তিকে মূল্যায়ন করেছি?
শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? জানতে চাইলে নির্দ্বিধায় প্রায় সবাই বলে উঠবেন কী আবার? ক্যারিয়ার গড়ে তোলা। কারণ শেখানো হয়েছে লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে। অথবা বাবা-মা উদ্বেগ জড়ানো কণ্ঠে বলেন, ভালো করে পড়াশোনা কর, তা না হলে খাবি কী করে? আর এ দেশে থেকে কোনো লাভ নেই, বাইরে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। সেই লক্ষ্যে চলতে থাকে বিদেশে পড়াশোনা এবং শিক্ষাজীবন শেষে সেখানেই স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা। এর বিকল্প যারা ভাবেন তাদের বাস্তব জ্ঞানের বিষয়ে সবাই প্রশ্ন তুলবেন। একবাক্যে বলেন যে, তারা হয় বোকা অথবা তাদের যোগ্যতা নেই। কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে, বিলাসী জীবনযাপনের মতো আয়-রোজগার আছে, বিস্তর সামাজিক যোগাযোগ আছে তার পরও ফিরে এসেছেন দেশের মাটিতে এমন মানুষকে কী বলা যায়?
বাইরে থেকে দেখলে তার জীবন ঝুঁকিপূর্ণ, বৈচিত্র্যময় এবং বর্ণিল। জীবনের প্রতিটি বাঁক ফেরানোর মুখে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নিজের কথা ভেবে নয়, দেশ ও জনগণের স্বার্থ বিবেচনায়। ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিকেল থেকে এমবিবিএস পাস করে লন্ডনে গিয়েছিলেন এফআরসিএস পড়তে। তখন তার জীবনযাপন ছিল শখ এবং বিলাসিতায় পূর্ণ। তিনি প্রাইভেট জেট চালানোর লাইসেন্স পেয়েছিলেন, যুবকদের আকাক্সিক্ষত দামি স্যুট, টাই, শার্ট, জুতা পরতেন। ৪ বছরের এফআরসিএস কোর্স তখন শেষের দিকে। প্রাইমারি পরীক্ষায় ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছেন, আর কয়েকদিন পরেই ফাইনাল পরীক্ষা। ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। তার মনে কী এই প্রশ্ন আসেনি যে, কী করবেন তিনি তখন? উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আর অনিশ্চিত জীবনের টানাপড়েন। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন সংগ্রামের অনিশ্চিত অথচ মহত্তম পথটাই বেছে নেবেন। ক্যারিয়ারের পরীক্ষা নয়, দেশপ্রেমের পরীক্ষায় অংশ নিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে নেমে পড়লেন লন্ডনের রাস্তায়।
তখন লন্ডনে প্রবাসী বাংলাদেশিরা সভা-সমাবেশ করছেন, তুলে ধরছেন পাকিস্তানিদের গণহত্যার চিত্র। বিভিন্ন দেশের মানবতাবাদী মানুষেরা যোগ দিচ্ছেন সেসব সমাবেশে। লন্ডনের প্রখ্যাত হাইড পার্কে অনুষ্ঠিত এ রকম একটি সমাবেশে প্রকাশ্যে তিনি পাকিস্তানি পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেললেন। পরবর্তী সময় যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এই যে পাসপোর্ট ছিঁড়ে পাকিস্তানের নাগরিকত্ব বর্জন করলেন, সিদ্ধান্তটা কি তিনি হঠাৎ করে, না চিন্তা-ভাবনা করে নিয়েছিলেন? হাসতে হাসতে তিনি বলেছিলেন, ‘পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলা ছিল পাকিস্তানিদের গণহত্যার বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ। তোমরা আমাদের হত্যা করছ, আমি তোমার পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেললাম, নাগরিকত্ব বর্জন করলাম।’
তো পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেললেন এরপর কাজ কী? আপাত নিরাপদ বিদেশে থেকে স্বাধীনতার জন্য সহায়তা করা নাকি সংগ্রামে অংশ নেওয়া? তিনি বেছে নিলেন সেই ঝুঁকিপূর্ণ পথ। ১৯৭১ সালের মে মাসের শেষ দিকে পাসপোর্ট-নাগরিকত্বহীন তিনি কলকাতায় আসার উদ্যোগ নিলেন। ট্রাভেল পারমিট জোগাড় করে সিরিয়ান এয়ারলাইনসে রওনা দিলেন কলকাতার উদ্দেশে। ট্রানজিট দামেস্ক। কিন্তু বিষয়টা এত সহজ ছিল না। দামেস্ক বিমানবন্দরে সিরিয়ার সহযোগিতা নিয়ে পাকিস্তান সরকার তাদের গ্রেপ্তার করতে চাইল। প্লেনের সব যাত্রী নেমে গেছেন, নামেননি শুধু ২ জন। তারা জানতেন প্লেনের ভেতর আন্তর্জাতিক জোন, সেখান থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করা যায় না। বিমানবন্দরে একজন পাকিস্তানি কর্নেল দাবি করেছিলেন, ‘পাকিস্তানের ২ জন নাগরিক প্লেনে আছে। তাদের আমাদের হাতে তুলে দিতে হবে।’ দীর্ঘ সময় বাকবিতণ্ডা, দেন-দরবারের পর পাকিস্তানি কর্নেলকে জানানো হয়, তাদের তো পাকিস্তানি পাসপোর্ট নেই, তারা ট্রাভেল পারমিট নিয়ে ভ্রমণ করছেন। তারা যে পাকিস্তানের নাগরিক তার তো কোনো প্রমাণ নেই। ফলে তাকে গ্রেপ্তার করা বা নামিয়ে নেওয়া সম্ভব হলো না।
১৯৭১ সালের মে মাসের শেষে তিনি পৌঁছালেন আগরতলায় মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরে। সেখানেই গড়ে তুলেছিলেন একটি হাসপাতাল। যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল এই হাসপাতাল, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’। ভবন তৈরির অপেক্ষা না করে ছন-বাঁশ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল ৪৮০ শয্যার হাসপাতাল আর এর অপারেশন থিয়েটার। যুদ্ধে গুরুতর আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জটিল অপারেশনও করা হতো বাঁশের তৈরি এই হাসপাতালে। প্রশিক্ষিত নার্স নেই তো কী হয়েছে, হাতের কাছে তো আগ্রহী মানুষ আছে? ফলে প্যারামেডিক প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল একদল সেবাদানকারী। মুক্তিযুদ্ধে এই ফিল্ড হাসপাতালের ভূমিকা অপরিসীম। এই হাসপাতালটিই স্বাধীন বাংলাদেশে জন্ম নিল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নামে।
স্বাধীনতার পর তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ওষুধনীতি প্রণয়ন। দেশের ওষুধের বাজার প্রায় পুরোটাই ছিল বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। অনেক অপ্রয়োজনীয় ওষুধসহ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ওষুধ ছিল বাজারে। দেশে কারখানা তৈরি করে উৎপাদন করা হতো আর অধিকাংশ কোম্পানি বিদেশ থেকে আমদানি করত। ফলে ওষুধের দাম ছিল বেশি আর কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা চলে যেত দেশের বাইরে। গণমানুষের জন্য চিকিৎসা সহজলভ্য করার জন্য স্বাধীনতার পর থেকেই দেশীয় ওষুধশিল্প গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং সমাজতান্ত্রিক দেশ থেকে কম দামে ওষুধ আমদানির কথা নীতিনির্ধারক মহলের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন তিনি। অবশেষে ওষুধনীতি করাতে সক্ষম হন ১৯৮২ সালে। এর ফলে সাড়ে ৪ হাজার ওষুধ থেকে প্রায় ২ হাজার ৮০০ ওষুধ নিষিদ্ধ করা হয়। আজ দেশীয় পুঁজিপতিদের মালিকানায় ওষুধশিল্পের যে বিকাশ, তা সেই ওষুধনীতিরই সুফল। এখন মানুষের চাহিদার ৯৫ শতাংশেরও বেশি ওষুধ দেশেই উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ এখন ওষুধ রপ্তানিকারক দেশ।
যখন কোভিড মহামারীর আতঙ্ক, তখন তিনি কোভিড আক্রান্ত হয়েছিলেন। গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালেই হয়েছিল তার চিকিৎসা। ‘যে হাসপাতাল তৈরি করলাম, সেখানে যদি নিজে আস্থা না রাখি, সাধারণ মানুষ আস্থা রাখবেন না’ করোনা চিকিৎসায় দামি ওষুধ গ্রহণ করতে রাজি হননি। তার যুক্তি ছিল, ‘প্রথমত করোনা চিকিৎসায় এত দামি ওষুধ দরকার নেই। দ্বিতীয়ত, যে ওষুধ কেনার সামর্থ্য সাধারণ মানুষের নেই, সেই ওষুধ আমি খাব না।’ কোনো ডাক্তার তার মত পরিবর্তন করাতে পারেননি।
আবার যখন তার কিডনি রোগ ধরা পড়ল, তার আমেরিকান ডাক্তার বন্ধুরা তাকে আমেরিকায় নিয়ে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে দেওয়ার উদ্যোগ নিলেন। কিন্তু তিনি রাজি হননি কারণ বাংলাদেশে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট আইন পরিবর্তনের জন্য তিনি আন্দোলন করছিলেন। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কাছের আত্মীয় ছাড়া কেউ কিডনি দান করতে পারেন না। এতে মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। ‘দেশের সাধারণ মানুষ কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের সুযোগ পাবে না, আর আমি আমেরিকা থেকে করে আসব বা দেশে মিথ্যা কথা বলে করতে হবে, তা হয় না। আমি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করব না। বরং ডায়ালাইসিস করব, যে সেবা গরিব মানুষকেও দিতে পারব।’ তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল আপনার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সম্পদের পরিমাণ কত? ‘হবে কয়েক হাজার কোটি টাকার’, তার নির্বিকার উত্তর। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এত টাকার সম্পদ, আপনার কখনো মনে হয় না এখান থেকে নিজের কিছু পাওয়ার ছিল? ‘না, না আমি টাকা-সম্পদ দিয়ে কী করব। দেশের মানুষের জন্য আরও অনেক কিছু করার ছিল।’ তার আরও স্বপ্ন ছিল, চিকিৎসা বাণিজ্য বন্ধ করার, একটি গণতান্ত্রিক দেশের সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচনের এবং সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তার আমৃত্যু লড়াই ছিল।
তার জীবন আমাদের শেখায়, জিততে চাইলে মানুষ নাও জিততে পারে, কিন্তু কোনো মানুষ যদি প্রতিজ্ঞা করে তিনি হারবেন না তাহলে তাকে হারানো সম্ভব নয় কিছুতেই। সে রকম মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, কিন্তু হার মানে না কিছুতেই। আমাদের তেমনি একজন হার না মানা যোদ্ধা ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট
rratan.spb@gmail.com