দখল-দূষণ গিলে খাচ্ছে পঞ্চগড়ের নদী

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০১ এএম

উত্তরের হিমালয়ান সমতল ভূমিবেষ্টিত অঞ্চল পঞ্চগড়। এ জন্য এই জেলাকে হিমালয়কন্যা বলা হয়। এই জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ৩৩টি নদী। পাহাড়ি সমতল অঞ্চল হওয়ায় কিছু নদী বয়ে এসেছে ভারতের পর্বতাঞ্চল থেকে। ২৯টি নদীর উৎপত্তি ঘটেছে স্থানীয় খাল-বিল থেকে। বাংলাদেশের অন্য কোনো জেলায় এত নদী প্রবাহিত হয়নি। তাই অনেকে পঞ্চগড়কে নদীর জেলা বলে থাকেন। এই নদীগুলো দীর্ঘকাল ধরে স্থানীয় সংস্কৃতি ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে আসছে। কিন্তু ময়লা-আবর্জনা ফেলায় অনেক নদী মৃতপ্রায়। এ ছাড়া অনেক নদীর তীর দখল করে গড়ে উঠেছে স্থাপনা।

নদীগুলোর অপার প্রতিদানে পঞ্চগড়ের মাটি অত্যন্ত উর্বর এবং বিশুদ্ধ ও সুস্বাদু। তাই এখানে সব ধরনের ফসলের আবাদ হচ্ছে। কিন্তু ধীরে ধীরে নদীগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় শুকিয়ে যাচ্ছে নদীগুলো। স্থানীয়রা বলছেন, এক যুগ আগেও এসব নদীতে সারা বছর পানি থাকত। পাওয়া যেত নানা ধরনের দেশি মাছ। বর্তমানে অধিকাংশ নদী পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। এসব নদীতে চাষ করা হচ্ছে বোরো আবাদ। বোরো আবাদে অতিরিক্ত সার ও কিটনাশক ব্যবহারের ফলে মাছের প্রজনন কমে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েক প্রজাতির মাছ হারিয়ে গেছে। অপরিকল্পিতভাবে চাষাবাদের ফলে ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী। ফলে গতিপথ বদলে যাচ্ছে। পঞ্চগড়ে আন্তঃসীমান্ত নদী আছে ৮টিÑ মহানন্দা, করোতোয়া, ডাহুক, তালমা, টাঙ্গন, ঘোড়ামারা, বুড়ি তিস্তা ও নাগর।

অধিকাংশ নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে হাটবাজার, জেলা ও উপজেলা শহর। অপরিকল্পিতভাবে পাথর উত্তোলনের ফলে মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে ডাহুক নদ। ওই এলাকার একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই পাথর উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত। প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরকে ম্যানেজ করে নদী দখল করে পাথর উত্তোলন করছে তারা। তালমা নদীর পাশেই গড়ে উঠেছে কয়েকটি বাজার। এই বাজারের সব ময়লা ফেলা হচ্ছে নদীতে। হাড়িভাসা ও চাকলা বাজারের ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে কুরুম নদীতে। বোদা উপজেলা শহর গড়ে উঠেছে পাথরাজ নদীর তীরে। উপজেলা শহরের সব ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে এই নদীতে। ফলে নদীটি মরে যাওয়ার পথে।

দেবীগঞ্জ ও পঞ্চগড় শহর গড়ে উঠেছে করতোয়া নদীর তীরে। এই দুই বৃহৎ শহরের সব ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে করতোয়ায়। গোবরা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে সীমান্ত উপজেলা শহর তেঁতুলিয়া। এই শহরের সব ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয় এই নদীতে। নদীটি প্রায় মৃত। এই উপজেলার তীরনই হাটবাজার গড়ে উঠেছে তীরনই নদীর তীরে। এই বাজারের সব ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয় ওই নদীতেই। ভারতের শিলিগুড়ি শহরের সব বর্জ্য ফেলা হয় মহানন্দা নদীতে। তাই মহানন্দার পানিও দূষিত। অন্যান্য নদীর তীরে গড়ে ওঠা হাটবাজারের ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে নদীতেই। ফলে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দূষিত হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনিক কোনো উদ্যোগ নেই। নেই সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কোনো উদ্যোগ। ফলে নদীগুলো ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে মাছসহ জলজ প্রাণী। পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। চাষাবাদেও দেখা দিয়েছে নেতিবাচক প্রভাব। কারণ নদী শুকিয়ে যাওয়ায় সেচ দিয়ে হয়। এতে আবাদে খরচ বেড়ে গেছে।

এদিকে নদী দখল করে অনেকে গড়ে তুলছে ভবন, দোকানপাট, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। সদর উপজেলার হাড়িভাসা এলাকায় কুরুম নদী দখল করে গড়ে উঠছে দোকান, প্রতিনিয়ত হচ্ছে চাষাবাদ। ডাহুক নদ দখল করে কয়েকটি কোম্পানি গড়ে তুলেছে কারখানা, রিসোর্ট, পোল্ট্রি ফার্ম। জেলা শহরের উপকণ্ঠে তালমা নদী দখল করে গড়ে উঠেছে পার্ক, ভবন এবং ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর এলাকায় করতোয়া নদী দখল করে গড়ে উঠেছে চা-বাগান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি। নদী দখল করে চলছে অবৈধভাবে পাথর ও বালি উত্তোলন। দখলের ফলে এসব নদীর গতিপথ বদলে যাচ্ছে। প্রবাহমান স্রোতধারা সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে।

পঞ্চগড়ে প্রাণ প্রকৃতি-পরিবেশ নিয়ে কাজ করা ‘কারিগর’র সভাপতি সরকার হায়দার জানান, নদী দখল-দূষণ দুটিই ক্রমাগত বাড়ছে। নদীর বুকে চাষাবাদের ফলে স্বাভাবিক অবস্থা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে জীবন-জীবিকায়। নদী রক্ষায় প্রশাসনিকসহ সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের পঞ্চগড় আঞ্চলিক শাখার সভাপতি অ্যাড. একেএম আনোয়ারুল ইসলাম খায়ের বলেন, দখল-দূষণে নদীগুলোর অবস্থা শোচনীয়। নদীগুলো থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ ও খননের দাবি জানান তিনি।

নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকি বলেন, অনেক নদী দখল আছে, যা খালি চোখে দেখা যায় না। করতোয়া ও পাথরাজ নদী সবচেয়ে বেশি দূষিত হয়ে পড়ছে। নদীগুলো নিয়ে রাষ্ট্রীয় পরিচর্যার অভাব রয়েছে। জেলা প্রশাসক মোসা. শুকরিয়া পারভীন বলেন, নদী নিয়ে আমাদের উদ্যোগ আছে। বেশ কিছু নদীর খনন হয়েছে এবং আরও খনন হবে। এ ব্যাপারে সবার সচেতনতা জরুরি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত