শস্য নিয়ে মৈত্রী সংকট

মাত্র এক সপ্তাহ আগেই প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে পোল্যান্ড সফর করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধে হাতে থাকা সামরিক রসদ দিয়ে ইউক্রেনের পাশে জোরেশোরেই আছে পোল্যান্ড। কিন্তু বাণিজ্যিক দিক দিয়ে কিয়েভকে সব উজাড় করে দিতে পারল না ওয়ারশ। নিজেদের কৃষি খাতকে রক্ষায় প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেন থেকে শস্য ও অন্যান্য খাদ্য আমদানি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পোল্যান্ড। গত শনিবার পোল্যান্ডের ক্ষমতাসীন ‘ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির’ (পিআইএস) প্রধান ইয়ারোস্ল্যাভ কাচিনসকি সরকারের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। এরপর এদিনই একই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবার্নের সরকার। পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরি সরকার জানিয়েছে, ইউক্রেন থেকে ব্যাপক শস্য এবং খাদ্য দেশের ভেতরে ঢুকে পড়ায় বাজারে সরবরাহ অনেক বেড়ে গেছে। ফলে দেশীয় কৃষকরা তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।

শস্যসংক্রান্ত যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তা সমাধানে পোল্যান্ড সরকার ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত আছে বলেও জানিয়ে কাচিনসকি বলেন, এরই মধ্যে ইউক্রেন সরকারকে পোল্যান্ডের এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানানো হয়েছে। তবে ইউক্রেন এ সিদ্ধান্তে হতাশা জানিয়ে বলেছে, ‘সংকট সমাধানে একতরফাভাবে নেওয়া কঠোর পদক্ষেপে পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক সমাধান হবে না।’ ইউক্রেনের খাদ্য ও কৃষি নীতিমালা-বিষয়ক মন্ত্রণালয় বলেছে, পোল্যান্ডের নিষেধাজ্ঞাটি দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান চুক্তির বিরোধী। ইস্যুটির সমাধানে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে তারা। মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পোল্যান্ডের কৃষকরা যে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছেন, তা আমরা বুঝতে পারছি। তবে ইউক্রেনের কৃষকরা এই মুহূর্তে যে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছেন, তার ওপর জোর দিচ্ছি আমরা।’ বিশ্বে খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ ইউক্রেন। দেশটির গম, তৈলবীজ, যবের মতো শস্যের প্রভাব আছে বিশ্ববাজারে। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনের বিপুল শস্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তুরস্ক-জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে শস্যচুক্তিতে সম্মত হয় রাশিয়া-ইউক্রেন। তবে এ চুক্তির পর থেকেই রাশিয়ার অভিযোগ ছিল, ইউক্রেনের শস্য আফ্রিকা-এশিয়ার দেশগুলোর খাদ্যাভাব কমানোর চেয়ে বরং উন্নত ইউরোপের উদরপূর্তিতে কাজে লেগেছে। এখন যেন রাশিয়ার এ দাবির সত্যতা সামনে আসছে।

গত মাসে ইউরোপীয় কমিশনকে ইউরোপের ওই অঞ্চলের পাঁচটি দেশের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, শস্য, তেলবীজ, ডিম, পোলট্রি ও চিনির মতো পণ্যগুলোর সরবরাহ ‘নজিরবিহীন’ মাত্রায় বেড়েছে। ইউক্রেনের কৃষিজাত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এখন শুল্কের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। এদিকে পোল্যান্ডে এটি নির্বাচনের বছর। আগে থেকেই সেখানে অর্থনৈতিক স্থবিরতা চলছে। পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের অতিরিক্ত সরবরাহের বিষয়টি ক্ষমতাসীন দল ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টিকে (পিআইএস) দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। ইউক্রেন থেকে আসা এসব খাদ্যশস্যের কারণে স্থানীয় বাজারে দাম কমে যাওয়ায় স্থানীয় কৃষকরা ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। নির্বাচনের বছরে এভাবে ভোটারদের একটি বড় অংশকে অসন্তুষ্ট করতে চাইছে নয়া পিআইএস। দলীয় সম্মেলনে কাচিনসকি ঘোষণা দেন, ‘আমরা ইউক্রেনের অকৃত্রিম বন্ধু ও মিত্র আছি এবং থাকব। আমরা ইউক্রেনকে সমর্থন করে যাব। আমাদের সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন হবে না। কিন্তু প্রতিটি রাষ্ট্র, ভালো সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেদের জনগণের স্বার্থের সুরক্ষা করা।’ পোল্যান্ড-হাঙ্গেরি ছাড়াও অভ্যন্তরীণ কৃষিবাজার ইউক্রেনের খাদ্যশস্যে সয়লাব হওয়ায় ফুঁসছেন রোমানিয়া, বুলগেরিয়ার কৃষকরাও। ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন থাকলেও বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন তারা। ‘সংহতি, দুর্ভোগ নয়!’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ করেছেন রোমানিয়ার কৃষকরা। মধ্য ইউরোপের অনেক দেশের কৃষকরা আমদানি বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন।