ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর উত্তরায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চোর-ছিনতাইকারী ও পকেটমার সদস্যরা। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এয়ারপোর্ট থেকে আব্দুল্লাহপুর ও টঙ্গী স্টেশন রোড এলাকায় হরহামেশাই ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। এ কাজে বাধা দিলেই হত্যা করতেও পিছপা হচ্ছে না ছিনতাইকারীরা।
টাঙ্গাইলের বাসিন্দা মো. আব্দুল বাতেন (৫০) গত শনিবার দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বোনের ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর জন্য আসেন। ফেরার পথে আব্দুল্লাহপুরে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। ছিনতাইকারীরা সব কেড়ে নিয়ে তাকে অজ্ঞান করে মহাসড়কে ফেলে চলে যায়।
ট্রাফিক পুলিশ সূত্র জানা যায় এয়ারপোর্ট, জসীমউদ্দীন, আজমপুর, হাউজ বিল্ডিং, আবদুল্লাপুর, টঙ্গী, ধউর বেড়িবাঁধ মহাসড়কে যানজট পড়লেই সাধারণ যাত্রীদের পড়তে হচ্ছে পকেটমার ও ছিনতাইকারীর কবলে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর যাত্রীবাহী বাসে ওঠার সময় চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে মানিব্যাগ, মোবাইলসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র। দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চক্রটি।
মো. ইকবাল হোসেন নামে এক ভুক্তভোগী জানান, চলন্ত বাসের জানালায় হাত ঢুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মোবাইল, গলার চেইন, কানের দুল, হাতের বালা, আঙুলের আংটি। এতে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত আবার অনেকেই আহত হচ্ছে। যদিও পুলিশ বলছে তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন। বেশ কিছু ছিনতাইকারী ইতিমধ্যে জেলহাজতে আছে।
ছিনতাইকারীরা প্রকাশ্যে ধারালো ব্লেড মুখে নিয়ে থাকে। মানুষের বুকে, পেটে ও হাতে ব্লেড দিয়ে জখম করে। আহত করে কেড়ে নিচ্ছে মোবাইল ও টাকা-পয়সা। সকাল ও সন্ধ্যায় অফিসগামী সাধারণ যাত্রীরা বাসে ওঠার সময় একটি সিন্ডিকেট বেপরোয়া ভাবে বাসে ওঠার চেষ্টা করে। এ সময় যাত্রীদের পকেটে হাত দিয়ে মোবাইল, মানিব্যাগ, টাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হাতিয়ে নিচ্ছে।
এদিকে ছিনতাইয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন লোকাল বাসের চালক ও হেলপারসহ পুলিশের সোর্সদের বিরুদ্ধে। এসব ছিনতাইকারীর বড় একটি তালিকা রয়েছে প্রশাসনের হাতে। উত্তরার তিনটি থানায় ১২০টি মামলা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছিনতাইকারী জানান, রাজধানীর এয়ারপোর্ট থেকে গাজীপুরের চৌরাস্তা পর্যন্ত নামে-বেনামে অসংখ্য পকেটমার, টানা পার্টি ও ছিনতাইকারী চক্র রয়েছে। আর ছিনতাইকৃত সব পণ্য কেনার জন্য টঈী মাজার বস্তিতে অসংখ্য ব্যক্তি রয়েছে। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মো. শাহালম, ব্লেড জাকির। অন্যদিকে ব্যাংকের মাঠে মো. জামালের নেতৃত্বে উত্তরায় একটি গ্রুপ সক্রিয়। পকেটমার গ্রুপে রয়েছে মো. শকত, মো. মিলন, হাজি জুয়েল, মো. মিজান, বাবলা, মো. রনি, মো. ডলার মিন্টু, মো. নাদিম, মো. আনিস, গলাকাটা ছোট নাইম, জিকু।
টঈী আরিচপুরের গ্রুপে রয়েছে বড় সাওন, খাটো এমরান, ছোট শাওন, রিপন, রুবেল, মনির, শুক্কুর, কোরবান, স্বপন ঘিরিল কাটা শরিফসহ রমজান ও কাল্লু। আর এসব পকেটমার ছিনতাইকারী চক্রটির সঙ্গে সরাসরিভাবে জড়িত টঙ্গী মাজার বস্তির মো. জাহাঙ্গীর। সবাই তাকে র্যাব-পুলিশের সোর্স হিসেবে চেনে। তবে এই জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ডাকাতি মামলা আছে বলেও জানান চক্রের এক সদস্য।
বিভিন্ন সময় প্রশাসনের কর্মকর্তারা এদের ধরে মামলা চালান দিলেও কয়েকদিন পর জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আবারও একই কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ দাবি করেন নাগরিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি খতিয়ে দেখে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।
নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে আরও একজন পকেটমার চক্রের সদস্য জানায়, আব্দুল্লাহপুর হাউজ বিল্ডিং আজমপুর এসব স্থানে জাহাঙ্গীর গংদের সহযোগিতায় পকেট মারার কাজ হয়। তবে মাঝে মাঝে সাধারণ মানুষের হাতে আটক হলে জাহাঙ্গীর গং চড়-থাপ্পড় মেরে ছেড়ে দেয়।
সে আরও বলে, ‘জাহাঙ্গীর আমাদের এখানে পকেটমার চক্রের সব সদস্য থেকে প্রতিদিন টাকা নিয়ে থাকে।’ বেশিরভাগ সময় সন্ধ্যার পর আব্দুল্লাহপুর ব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে জাহাঙ্গীর পকেটমার চক্রের সবাইকে ধরে ধরে টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকার করলে পুলিশের সহযোগিতায় বক্সে নিয়ে বেধড়ক মারধর করে। আবার থানায় নিয়ে যায়, আবার কখনো কখনো মারধর করে ছেড়ে দেয়। জাহাঙ্গীরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয় নিয়ে কথা বলেন উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, রোজার প্রথম দিন থেকে ব্যাংক, মার্কেট ও মহাসড়কে নজরদারি বৃদ্ধি করেছেন। এই কয়েক দিনে ৯৫ জন ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার করেন। তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। এখানে কয়েকটি গ্রুপ আছে যাদের নাম বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি। এসব কাজে যারা জড়িত তারা কেউ এখানে থাকে না, অধিকাংশই বাইরে থেকে আসা।