সুনাকও সংকটের মুখে!

কনজারভেটিভ অর্থাৎ নিজ দলের নেতাদের বিরোধিতায় বরিস জনসনকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়েছিল। এরপর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্যাকেজ ঘোষণা করে বুমেরাং ফল পেয়ে গদি হারিয়েছিলেন জনসনের স্থলাভিষিক্ত লিজ ট্রাস। মাত্র ৪৫ দিনের প্রধানমন্ত্রী ট্রাসের পর যুক্তরাজ্যের টালমাটাল রাজনীতি-অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে প্রধানমন্ত্রীর গুরুদায়িত্ব পান ভারতীয় বংশোদ্ভূত ঋষি সুনাক। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের দেড়শ দিনের মধ্যেই এবার তার প্রধানমন্ত্রিত্বও পড়ল সংকটে।

স্ত্রীর ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়ে পার্লামেন্টের তদন্তের মুখে পড়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক। পার্লামেন্টের ‘কমিশনার ফর স্ট্যান্ডার্ডস’ গত ১৩ এপ্রিল থেকে এ তদন্ত শুরু করেছে। গত সোমবার কমিশনারের ওয়েবসাইটে শেয়ার করা তথ্যে এ কথা বলা হয়েছে। একটি চাইল্ড কেয়ার কোম্পানিতে সুনাকের স্ত্রীর অংশীদারত্ব নিয়ে চলছে এ তদন্ত। সুনাক ওই কোম্পানিতে তার স্ত্রীর অংশীদারত্বের কথা স্বচ্ছভাবে ঘোষণা (ডিক্লেয়ারেশন অব ইন্টারেস্ট) করেছিলেন কিনা এবং সুনাক সরকারের ঘোষিত নতুন বাজেট নীতিতে তার স্ত্রী ব্যবসায়িক সুবিধা পাচ্ছেন কিনা এসবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধী দলগুলো সুনাকের স্ত্রী অক্ষতা মূর্তিকে ব্যবসায় সুবিধা পাইয়ে দিতে তার নতুন বাজেট নীতি প্রণয়ন করা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় এ তদন্ত। ওইসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গত মার্চ মাসের বাজেটে চাইল্ড কেয়ারের জন্য তহবিল সংক্রান্ত যে নীতি ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে উপকৃত হতে পারে সুনাকের স্ত্রী অক্ষতা মূর্তির ওই কোম্পানি।

অক্ষতার প্রতিষ্ঠানের নাম কোরু কিডস। মূলত শিশুদের নিয়ে কাজ করে থাকে কোম্পানিটি। গত মাসে বাজেট পেশকালে এ ধরনের সংস্থাগুলোর জন্য আলাদা প্রকল্প ঘোষণা করেছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। এরপরই সুনাকের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাছাড়া, স্ত্রীর শেয়ার হোল্ডিংয়ের বিষয়টি নিয়মমাফিক নিবন্ধন না করে সুনাক পুরো বিষয়টি লুকানোর চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ ওঠে। তবে সুনাকের মুখপাত্র বলেছেন, তদন্তে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে।

পার্লামেন্টের কোনো সদস্য আচরণবিধি সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘন করেছেন কি না, তা নিয়ে সাধারণত তদন্ত করে কমিশনার ফর স্ট্যান্ডার্ডস। এমপিদের আচরণবিধির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে এ তদন্ত হচ্ছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এমপিরা তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয়ে সবসময়ই জবাবদিহি করতে বাধ্য। 

সংসদীয় এ তদন্ত ঋষি সুনাকের জন্য বিব্রতকর। গত বছর অক্টোবরেই সরকারের প্রতিটি ক্ষেত্রে সততা বজায় রেখে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন। এদিকে আগামী বছর জাতীয় নির্বাচনে দলের এবং নিজের ভাবমূর্তিও বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ এখন সুনাকের সামনে। তদন্তে তিনি দোষী সাব্যস্ত হলে কেবল ক্ষমা চাইলেই হবে না। পদও হারাতে হতে পারে তাকে। দোষী প্রমাণিত হলে সুনাকের ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা চাপানোরও ক্ষমতা রয়েছে পার্লামেন্টের তদন্তকারী ওই কমিটির।  

স্ত্রী অক্ষতার জন্য সুনাকের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পড়াটা নতুন নয়। জনসনের পদত্যাগের পর কনজারভেটিভ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের দৌড়ে সুনাকের সম্ভাবনাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল তার জীবনসঙ্গিনীর অঢেল সম্পদ। এমনকি গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে লিজ ট্রাসের কাছে সুনাকের পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল তার স্ত্রী, এমনটাই মনে করা হয়। সুনাকের জনপ্রিয়তায় আরও ভাটা পড়ে সানডে টাইমস রিচ লিস্ট ম্যাগাজিনে খবর প্রকাশের পর। সেখানে বলা হয়েছিল অক্ষতার সম্পদের পরিমাণ ৪৩ কোটি ডলার। তখন প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান বলেছিল, অক্ষতা ভারতীয় নাগরিক হওয়ায় যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা হিসেবে কর দিতে বাধ্য ছিলেন না। এভাবে তিনি দুই কোটি পাউন্ড কর বাঁচান। সমালোচকরা বলেছিলেন, সুনাকের স্ত্রী কর ফাঁকি দিচ্ছেন। অথচ সুনাক (তৎকালীন অর্থমন্ত্রী) দরিদ্রদের কাছ থেকেও কর আদায় করছেন।