বাড়তি ভাড়া গরমের বাগড়া

ঈদ করতে বাড়ি যাচ্ছেন। আনন্দের উপলক্ষের এ যাত্রায় স্বস্তির হচ্ছে না। তীব্র গরম, তার ওপর বাড়তি ভাড়া আদায়, সঙ্গে যানজট সব মিলিয়ে রাজধানী ছেড়ে যাওয়া মানুষের নাকাল দশা। গতকাল বুধবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

সকাল থেকে যাত্রীর চাপ কিছুটা বাড়লেও দুপুর ২টার পর কমতে থাকে। আবার সন্ধ্যার পর যাত্রীর চাপ বাড়ে। আজ বৃহস্পতিবার ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়বে বলে মনে করেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা।

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী শনি কিংবা রবিবার উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল ফিতর। গতকাল থেকেই সরকার ঘোষিত ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে। আগের দিন মঙ্গলবার থেকে রাজধানীর সব বাস টার্মিনাল, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ও সদরঘাট দিয়ে ঢাকা ছাড়তে শুরু করে মানুষ। গত কয়েক দিন ধরে রাজধানীসহ সারা দেশে অসহনীয় তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে দিনের তাপমাত্রা রেকর্ড ভেঙেছে।

যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা ও সায়েদাবাদ এলাকা ঘুরে সকাল থেকে যাত্রীদের চাপ দেখা গেছে। একই সঙ্গে পরিবহনগুলোতে বাড়তি ভাড়া আদায়ের প্রবণতা ছিল। যাত্রাবাড়ী থেকে পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণবঙ্গের উদ্দেশে যেসব পরিবহনের বাস ছেড়ে যায়, সেসব পরিবহনের কাউন্টারের সামনে ছিল মানুষের উপচেপড়া ভিড়। দক্ষিণবঙ্গের অন্তত ২০টি জেলার বাস যাতায়াত করে পদ্মা সেতু হয়ে। গত মঙ্গলবার থেকে যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ এলাকায় অসহনীয় যানজট হচ্ছে।

ট্রাফিক পুলিশ ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলছে, পদ্মা সেতু হয়ে মাওয়া ও যাত্রাবাড়ীমুখী আসা বাসগুলো ফের মাওয়ামুখী হতে গিয়ে যানজটের তীব্রতা বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশ কিছু কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। ঢাকা ছেড়ে যাওয়া বাসগুলো যেন দ্রুত যেতে পারে সে জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট হয়ে যাত্রাবাড়ীমুখী বাসগুলোকে বেশি সময় ধরে সিগন্যালে থাকতে হচ্ছে। তবে এর সুফল খুব বেশি দেখা যায়নি।

ফরিদপুরগামী ‘আপন পরিবহন’র কাউন্টার ম্যানেজার অশোক জানান, নির্ধারিত ভাড়া ৩৫০ টাকা। তারা নিচ্ছেন ৪০০ টাকা। এ ছাড়া শরীয়তপুরগামী ‘পিআর পরিবহন’র কাউন্টার ম্যানেজার মহসিন বলেন, নন-এসি বাসের নির্ধারিত ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ এবং এসি পরিবহনে ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।

যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এলাকায় দুপুর সোয়া ১২টার দিকে কথা হয় যাত্রী মামুন মিয়ার (৪৫) সঙ্গে। তিনি বলেন, ফরিদপুরের ভাঙ্গা যেতে তাকে ৫০ টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘প্রচ- গরমে এমনিতেই কাহিল হয়ে পড়েছি। তার ওপর বাড়তি ভাড়ার চাপ। এখন কোনোমতে বাড়ি যেতে পারলেই হয়।’

যাত্রাবাড়ী থেকে বরিশালগামী ‘বেপারী পরিবহন’র সুপারভাইজার মো. ফারুখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, যাত্রাবাড়ী থেকে নির্ধারিত বাস ভাড়া ৫৩৪ টাকা। এখন নেওয়া হচ্ছে ৬০০ টাকা। তিনি বলেন, ভোর ৫টা থেকে দুপুর পর্যন্ত জুরাইন ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় তীব্র যানজট। এ ছাড়া পদ্মার ওপার থেকে বাস আসছে অনেকটা খালি হয়ে। সেতুতে দিতে হয় টোল। সঙ্গে জ্বালানি খরচ তো আছেই। পুষিয়ে নিতে একটু বাড়তি ভাড়া নিতে হচ্ছে।

তবে বিপরীত চিত্রও দেখা গেছে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে। ছেড়ে যাওয়া বেশ কয়েকটি পরিবহনে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম ভাড়া নিতে দেখা গেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে কৌশলের আশ্রয়। গেটলক কিংবা সিটিংয়ের কথা বলে যাত্রী তুললেও যাত্রাপথে যাত্রী তোলার কথা নিজেরাই স্বীকার করেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। আজ যাত্রী পরিস্থিতি বুঝে ভাড়া আরও বাড়তি নেওয়া হতে পারে, এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন তারা।

কুমিল্লাগামী ‘তিশা প্লাস’ পরিবহনের টিকিট বিক্রেতা রাহাত ভাড়ার নির্ধারিত চার্ট দেখিয়ে জানান, এই পরিবহনে চার্ট অনুযায়ী ভাড়া ২৯৭ টাকা। কিন্তু তারা এখন নিচ্ছেন ২৫০ টাকা। কেন কম নিচ্ছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এই লাইনে কোনো কোনো পরিবহন ২০০ টাকা ভাড়াও নিচ্ছে। যাত্রী কম। অন্যদিকে ফিরতি পথে আসতে জ¦ালানির খরচও উঠে না। তবে আজ যদি যাত্রীর চাপ বাড়ে এবং যানজটের কারণে ফিরতি বাসগুলো ঢাকায় আসতে বিলম্ব হয় তাহলে অন্যদের মতো তাদেরও বাড়তি ভাড়া নিতে হবে।’

লক্ষ্মীপুরগামী ‘জোনাকি পরিবহন’ কাউন্টারে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৫০ টাকা করে বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন যাত্রী। যদিও কাউন্টার ম্যানেজার নজরুল ইসলাম দাবি করেন, চার্ট অনুযায়ী ভাড়ার চেয়ে তারা নিচ্ছেন কম। তবে যাত্রীরা বলেন, এ রুটে চেয়ার কোচের ভাড়া ৬০০ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু এ পরিবহন পথেও যাত্রী তুলবে।

গাবতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, যাত্রীর তেমন চাপ নেই। অবশ্য আজ বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা।

মহাখালী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, যাত্রীর চাপ এখনো তেমন নেই। মো. সুমন নামে এক যাত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাসে আগে থেকে টিকিট কাটতে পারিনি। এখন সব জায়গায় বেশি ভাড়া দাবি করছে। ঈদ এলেই বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়। স্বাভাবিকের চেয়ে ঈদের সময় ২০০-৩০০ টাকা বেশি ভাড়া লাগছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেসব সড়কে মোটরসাইকেল চলাচল খুব বেশি করে না সেখানে ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আর পদ্মা সেতু দিয়ে এখনো মোটরসাইকেল না চলায় সে রুটগুলোতে ২০০-৩০০ টাকা বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। সরকারের উচিত কঠোরভাবে মনিটরিং করা, যেন অসাধু পরিবহন ব্যবসায়ীরা ভাড়া নৈরাজ্য করতে না পারে।’

আমাদের দাউদকান্দি (কুমিল্লা) প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাড়ছে যানবাহনের চাপ। এ সড়কের দাউদকান্দির বলদাখাল ইউটার্ন এবারও ভোগান্তির কারণ হতে পারে। এর সঙ্গে যত্রতত্র যাত্রী তোলা, ফুটপাত দখল করে দোকান, অবৈধ স্ট্যান্ড, ফিটনেসবিহীন মাইক্রোবাস চলাচলে দূরপাল্লার গাড়ির গতি কমে যানজটের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়।

ঈদে যান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে জেলা প্রশাসন, হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ ও পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পদক্ষেপ নিয়েছে। মহাসড়কের বলদাখাল এবং গৌরীপুরে বসানো হয়েছে পুলিশ কন্ট্রোল রুম।

গতকাল সকালে দাউদকান্দি সেতুর টোলপ্লাজা এলাকা পরিদর্শন করেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নূরী, নারায়ণগঞ্জ সড়ক পরিবহনের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহানা ফেরদৌস প্রমুখ।

শাহানা ফেরদৌস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যানজট নিরসনে টোলপ্লাজায় অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দিয়েছি। মোটরসাইকেলের জন্য পৃথক লেনসহ কোন লেনে কোন গাড়ি চলবে তার সাইনবোর্ড লাগিয়েছি। মাইকিং করে চালক-যাত্রীদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে সবসময়। এ ছাড়াও বিএনসিসির টিম মোতায়েন করা হয়েছে।’

কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গাড়ি ও যাত্রী দুইয়ের চাপ বাড়ছে। এ সুযোগে বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। তবে গতকাল দুপুরে মহাসড়ক পরিদর্শন এসে অতিরিক্ত আইজিপি ও হাইওয়ে পুলিশের প্রধান শাহাবুদ্দিন খান বলেন, মলম পার্টি, ছিনতাই ও বেশি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সরেজমিন ঘুরে যাত্রী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি ছুটি ও কিছু কারখানা ছুটি ঘোষণা করায় গতকাল সকাল থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গাড়ি ও যাত্রীদের চাপ বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপ বেড়েছে ওই মহাসড়কের চন্দ্রা ত্রিমোড়ে। এ চন্দ্রা মোড় দিয়ে উত্তরবঙ্গের ২২টি জেলার যানবাহন চলাচল করে। অনেকে বাস না পেয়ে ট্রাক, পিকআপে চড়ে বসে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা এবং দাউদকান্দি টোলপ্লাজা, ১৫টি স্টেশনে বিশৃঙ্খলা এবং ৫৪টি ইউটার্নে নিয়মভঙ্গের কারণে এবার ঈদযাত্রায় যানজটের কারণ হতে পারে। তবে হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, তারা ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে প্রস্তুতি নিয়েছে। কুমিল্লা রিজিয়নের ২২টি থানা ও ফাঁড়ির সদস্যদের নিয়ে দুই দফায় ৬৪টি প্যাট্রল টিম গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়াও ৩০টি কুইক রেসপন্স টিম রাখা হয়েছে। পর্যাপ্তসংখ্যক অ্যাম্বুলেন্স থাকছে দুর্ঘটনায় হতাহতের জরুরি সেবার জন্য।

হাইওয়ে পুলিশ রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ বলেন, ‘যাত্রীসাধারণের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।’

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানান, গত বছর পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকে এখন পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটের চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। তেমন কোনো ঝক্কিঝামেলা ছাড়া ঢাকা ও আশপাশের জেলা থেকে মানুষ নিজ নিজ এলাকায় ফিরছে।

গতকাল সকাল থেকে দৌলতদিয়া ঘাট ঘুরে দেখা যায়, এ প্রান্তে যানবাহনের তেমন চাপ নেই, ফেরির জন্য সারিতে থাকা বাসগুলোর অধিকাংশ আসন ফাঁকা ও অনেক বাস যাত্রীশূন্য। পাটুরিয়া থেকে ছেড়ে আসা লঞ্চগুলোতে ছিল যাত্রীর চাপ। তবে ফেরিতে সে পরিমাণ যাত্রী ছিল না। আজ থেকে যাত্রীর চাপ বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, ‘যানবাহন ও যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি আগে থেকে নিয়েছি। তাছাড়া ঘাটে সেই আগের মতো ভিড় নেই।’

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের সিরাজদীখানের কুচিয়ামোড়া থেকে লৌহজংয়ের পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তের টোলপ্লাজা পর্যন্ত যানবাহনের কোনো চাপ দেখা যায়নি। একই সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গজারিয়া উপজেলার জামালদী এলাকা থেকে বাউশিয়া পাখির মোড় পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে যানবাহনের চাপ লক্ষ করা যায়নি।

গজারিয়া উপজেলার ভবেরচর হাইওয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ এএসএম রাশেদুল ইসলাম জানান, মহাসড়কের ১৩ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে দুটি পয়েন্ট যথাক্রমে ভবেরচর ও বাউশিয়া পাখি মোড়ে ইউটার্ন রয়েছে। এ ছাড়া অন্যত্র সব স্থানে ডিভাইডারের মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রামমুখো দুটি লেনে যানবাহন চলাচল করছে।

সাভার প্রতিনিধি জানান, গতকাল ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক পরিদর্শন করেন অতিরিক্ত আইজিপি ও হাইওয়ে পুলিশপ্রধান সাহাবুদ্দিন খান। ঈদযাত্রা নির্বিঘœ করতে ব্যাপক প্রস্তুতির কথা জানান তিনি।

ট্রেনযাত্রা : কমলাপুর রেলস্টেশনে মানুষের ভিড় দেখা গেছে। স্টেশনে টিকিট পরীক্ষা ছাড়া যাত্রীদের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। একই সঙ্গে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল পুরো স্টেশনে।