ঈদ সালামি যেভাবে ঘরে ঘরে, সব শ্রেণি-পেশায়

ঈদুল ফিতরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ সালামি বা ঈদি। নতুন পোশাকে নামাজ শেষে কোলাকুলির পরই শুরু হয় বড়দের থেকে ঈদি নেওয়ার পর্ব। এর মধ্যে যুগ বদলেছে অনেক। কিন্তু বন্ধ হয়নি সালামি নেওয়া। এখনো ছোটরা বড়দের কাছ থেকে চকচকে নতুন নোটের ঈদ সালামি আশা করেন। বয়স যাই হোক, সম্পর্কে বড় হলেই সালামি দেওয়া যেন অলিখিত নিয়ম।

সালামির সূচনা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে কিছু ইতিহাসবিদের মতে, দশম শতাব্দীতে ফাতিমীয় খিলাফতের যুগে মিসরে সালামি প্রথার সূচনা ঘটে। এ সময় ঈদের দিন বড়রা ছোটদের হাতে কিছু পরিমাণ পয়সা তুলে দিতেন। এই প্রথা তখন ‘ঈদি’ বা ‘হাদিয়া’ নিয়ে নামে পরিচিত ছিল।

পরবর্তীতে অটোমান সাম্রাজ্য এবং আরবে ঈদি বিনিময়ের রীতি সম্প্রসারিত হয়। কেবল নগদ অর্থ নয়, রুচিভেদে কেউ কেউ নতুন কাপড়, মিষ্টিও সালামির তালিকায় যুক্ত করেন। আর বাংলায় সালামির পরিসর ছিল খুবই সমাকীর্ণ। গ্রামবাংলার মুসলমানরা দরিদ্র হওয়ায় এবং তাদের নিজেদের মধ্যে স্বতন্ত্র কমিউনিটির বোধ প্রবল না হওয়ায় ধর্মীয় উৎসবকে সামাজিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো কঠিন বিষয় ছিল।

যদিও উনিশ শতক ধরে চলা ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের প্রভাবে গ্রামীণ ও নগরজীবনের উৎসবে নতুনত্বের ছোঁয়া লাগে। আর বিশ শতকের চতুর্থ দশক থেকেই ঈদ–উৎসব সর্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তার এক বইয়ে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের ঈদ–উৎসবের বয়স বড়জোর ৪০ থেকে ৫০ বছর। তিনি বলেছেন, ঢাকা, কলকাতা প্রভৃতি শহরে নাচ, গান ও মিছিলের সমন্বয়ে ঈদ উদযাপনের চিত্র পাওয়া যায়। তবে গ্রামবাংলার তেমন উল্লেখযোগ্য খবর পাওয়া যায় না।

এদিকে সালামি আর ঈদ–উৎসব যেন একই সূত্রে গাঁথা। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছিল, তা জমকালো ঈদ–উৎসবের জন্য যথেষ্ট ছিল না। আশির দশক থেকে এ দেশে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের বিপুল বিস্তার ঘটে। বিদেশের শ্রমবাজারগুলোতে বাংলাদেশের লোকজন কাজ করতে শুরু করেন। এসব কারণে গ্রাম ও শহরের মধ্যকার আর্থিক ব্যবধান ঘুচতে থাকে।

এই আর্থিক সচ্ছলতার ভিত্তিতেই গত চার দশকে বাংলাদেশের ঈদ–উৎসব ব্যাপকতা পেয়েছে। হয়েছে সর্বজনীন। গ্রামের যে মেয়েটি পোশাকশিল্পে কাজ করে, সে ঈদের ছুটিতে বাড়ি যায় স্বজনদের জন্য হরেক রকমের উপহার নিয়ে। প্রবাসী ছেলেটিও বিপুল পরিমাণ অর্থ জমিয়ে দেশে ফেরে প্রিয়জনদের সঙ্গে সাড়ম্বরে ঈদ করার জন্য। এরাই খুশির আমেজে ঈদের দিন ছোটদের হাতে তুলে দেয় কড়কড়ে নতুন টাকা। আর এভাবেই সালামি পৌঁছে গেছে শহর থেকে লোকালয়ে, উচ্চশ্রেণি থেকে সাধারণ্যে।