বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ এখন ভারত, চীন নয় বলে সম্প্রতি জানিয়েছে জাতিসংঘ। ২০২২ সালে চীনে প্রতি হাজারে মাত্র ৭টি শিশু জন্মগ্রহণ করে। এত কম জন্মহার আগে দেখা যায়নি। চীন সরকারের এক সন্তান নীতিই কি কেবল এর জন্য দায়ী? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
পাত্রীর আকাল
চীনের পূর্বাঞ্চলীয় আনহুই প্রদেশের এক গ্রামে বাস করেন ডিং চিনসি। বয়স ৩৫ বছর। ধাতু ঢালাই তার পেশা। ডিংয়ের গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িই এখন খালি। সবাই শহরে চলে গেছে। শিশুদের কোলাহল সেখানে আগের মতো শোনা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে ডিং বিয়ের জন্য পাত্রীর সন্ধান করছেন কিন্তু পাচ্ছেন না। তিনি একা নন, তার গ্রামে ত্রিশ ও চল্লিশের কোঠার কয়েক ডজন অবিবাহিত পুরুষ আছেন, যারা পাত্রীর অভাবে বিয়ে করতে পারছেন না। প্রেমিকার পরিবারের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর পর সেখান থেকে কোনো সাড়া পাননি ডিং। কারণ তার পক্ষে নতুন বাড়ি কেনা সম্ভব ছিল না। ডিংয়ের মা-বাবা সে সময়ে পাত্রীপক্ষকে আকৃষ্ট করতে ঋণ করে একটি গাড়ি কিনতে চেয়েছিলেন। পাশাপাশি ঋণের অর্থে কাছের এক শহরে একটি অ্যাপার্টমেন্ট সংস্কার করতে চেয়েছিলেন, যেখানে বর-কনে থাকবেন। তাতেও কোনো লাভ হয়নি। এই চিত্র কেবল আনহুইয়ে নয়, চীনের অন্যান্য প্রদেশেও দেখা যাবে। দেশটিতে জন্মহার কয়েক দশক ধরে পড়তির দিকে। গত বছর চীনে প্রতি হাজারে ৭টি শিশু জন্মগ্রহণ করে, যা ছিল রেকর্ড। এত কম জন্মহার দেশটিতে আগে দেখা যায়নি। তার ওপর ডিংয়ের মতো অবিবাহিতরা যে জীবনসঙ্গী পাচ্ছেন না, তার অন্যতম কারণ চীনের চরম লিঙ্গ ভারসাম্যহীনতা। ডিং যখন জন্মগ্রহণ করেন, সে সময়ই আনহুই প্রদেশে ছেলেশিশু ও মেয়েশিশুর মধ্যে অসমতা প্রকট ছিল। ছেলেশিশুর প্রতি চীনাদের ঐতিহ্যগত পক্ষপাত ও চীন সরকারের এক সন্তান নীতি পরিস্থিতি আরও নাজুক করে তোলে। দেশটিতে এখন প্রায় তিন কোটি অতিরিক্ত পুরুষ বাস করছেন, যাদের অর্ধেকের বেশি বিয়ের উপযোগী।
পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে
চীন এখন জনসংখ্যা ঘাটতিতে আছে। রাষ্ট্রটির যাত্রার শুরু থেকে দেখা গেছে, বিশ্বের সামনে আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা ও শক্তিমত্তা প্রদর্শনের জন্য বরাবরই সেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ২২১ সালে চীন সম্রাট চিন শি হুয়াং গ্রেটওয়াল বা চীনের মহাপ্রাচীর নির্মাণকাজে দশ লাখ শ্রমিক নিযুক্ত করার আদেশ দিয়েছিলেন। তার আমলে বিশ্বের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের বেশি বাস করত চীনে। দুই হাজার বছর পর এই একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বে সুপারপাওয়ার হিসেবে আবির্ভূত চীন। এর পেছনে ভূমিকা আছে দেশটির লাখ লাখ শ্রমিকের। এই শ্রমিকরা একপর্যায়ে গ্রাম ছেড়ে পাকাপাকিভাবে শহরে স্থানান্তরিত হন। চার দশকে চীনের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখে দেশটির কোটি কোটি মানুষ। সাতটি নাইজেরিয়া বা ৪২টি পেরু বা ১৪০টি সুইডেনের জনসংখ্যা যত হবে, ঠিক ততটাই ছিল চীনের জনসংখ্যা।
তবে চীন এখন জনসংখ্যার বিচারে বড় ধরনের পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে। গত বছরের হিসাবে দেখা যায়, দেশটির জনসংখ্যা অনেক কমেছে। জনসংখ্যাবিদদের ভবিষ্যদ্বাণী, এ কেবল শুরু। আগামীতে চীনের জনসংখ্যা আরও অনেক হ্রাস পাবে। ১৯৪৯ সালে পিপলস রিপাবলিক অব চায়না প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম দেশটির জন্মহার এত কমেছে। কেবল গত সাত বছরেই জন্ম সংখ্যা প্রায় অর্ধেক হ্রাস পায়। ২০১৬ সালে চীনের জন্ম সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ। ২০২০ সালে এই সংখ্যা ৯৬ লাখে নামে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের জন্মহার যদি স্থির থাকেও, তাহলেও ২১০০ সালের মধ্যে দেশটির জনসংখ্যা ৫০ শতাংশ বা তারও নিচে নেমে যাবে। তখন চীনের জনসংখ্যা হবে ভারতের অর্ধেক বা নাইজেরিয়ার সমান।
চীনের জনসংখ্যা সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য হারে কমে ষাটের দশকের শুরুতে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রচারণা দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (১৯৫৮-১৯৬২ সাল) দরুন দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় দেশটিতে। খেতে না পেয়ে সে সময় তিন কোটি মানুষ মারা যায়। এবার চীনের জনসংখ্যা কমার জন্য দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনোটিই দায়ী নয়। দায়ী চীনের দ্রুত সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিয়ে ও সন্তান লালন-পালনের খরচ বৃদ্ধি এবং এক সন্তান নীতি। টানা কয়েক শতাব্দী ধরে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ছিল চীন। এখন তাকে টপকে জনসংখ্যায় শীর্ষস্থান দখলে নিয়েছে ভারত। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, আরভিনের সমাজবিজ্ঞানী ওয়াং ফেং বলেন, ‘এই শতাব্দীর শেষে চীনের জনসংখ্যা এত কমে যাবে যে, দেশটিকে চিনতে কষ্ট হবে। বিশেষ করে আমরা যারা চীনের ইতিহাস ও বিশ্বে এর অবস্থানের কথা জানি, তাদের পক্ষে ওই সময় দেশটিকে চেনা দুরূহ হয়ে পড়বে।’ চীন অবশ্য বিশ্বের একমাত্র দেশ নয়, যারা এ ধরনের সংকটের সম্মুখীন। পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পোন্নত শহুরে অর্থনীতির দেশগুলোতে যেখানে জন্মহার ও মৃত্যুহার কম, তারা কম-বেশি জনসংখ্যা হ্রাসজনিত সমস্যা মোকাবিলা করছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৯৮০ সালে এক সন্তান নীতি কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল চীন সরকার। কিন্তু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে তা যে কয়েক দশকে উদ্বেগজনক হারে কমে যাবে, তা তারা বুঝতে পারেনি। অবস্থা বেগতিক দেখে ২০১৬ সালে ওই কর্মসূচি বাতিল করা হয়। কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হয়নি। জন্মহার হ্রাস অব্যাহত থাকে। গোটা দুনিয়ার জনসংখ্যা যেখানে গত ৫০ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে, সেখানে চীনসহ উন্নত দেশগুলো তাদের জনসংখ্যা হ্রাস ঠেকাবে কীভাবে? চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং সম্প্রতি অঙ্গীকার করেছেন, জনসংখ্যা উন্নয়ন কৌশলে তিনি পরিবর্তন আনবেন এবং জন্মহার যাতে বৃদ্ধি পায় সে লক্ষ্যে নীতি প্রণয়ন করবেন। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যাবিদ ইয়ং কাই বলেন, ‘কোনো দেশ আজ পর্যন্ত এ সমস্যা সমাধান করতে পারেনি। মানব জাতির নতুন এই অধ্যায় নিয়ে এখনো লেখা হয়নি।’
বিয়েতে অনাগ্রহ
চীনের পূর্বে আরেক প্রদেশের নাম শেনডং। সেখানে এক গ্রামে জন্মেছিলেন শাশা ইয়ু। মেয়ে হওয়ায় কৃষক মা-বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত ছিলেন তিনি। শাশা বলেন, ‘আমার মা ছোটবেলায় প্রায়ই বলতেন মেয়ে হবে জানলে আমি কখনোই তোকে জন্ম দিতাম না।’ শৈশবে একবার ঘোড়ার গাড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিলেন শাশা। পরের দিন হাসপাতালে ঘুম ভেঙে দেখেন, তার মা পরম মমতার সঙ্গে হাতপাখা দিয়ে তাকে বাতাস করছেন। মায়ের এমন স্নেহ সচরাচর তার কপালে জুটত না। এ কারণে হাসপাতালের সেই বিরল সুখস্মৃতি আজও তার মনে আছে। তিনি বলেন, ‘আমি চোখ খুলতে চাইছিলাম না। চোখ খুললে যদি মা বাতাস করা বন্ধ করে দেন, এই ভয়ে চোখ বন্ধ করেছিলাম।’ শৈশবে মনমরা সময় কাটালেও শাশা মা-বাবার মন জয়ের জন্য সবকিছু করতে রাজি ছিলেন। তিনি ছিলেন তার পরিবারে প্রথম গ্র্যাজুয়েট। স্নাতক পাসের পর ব্যাংকে যোগ দেন শাশা এবং মা-বাবার ঋণ শোধ করেন। বিশের কোঠার শেষেও তিনি বিয়ে না করায় তার মা তাকে প্রায়ই গাল-মন্দ করতেন। চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তর সেখানকার তরুণ-তরুণীদের চিন্তা-ভাবনায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বিয়ে করে সন্তান লালন-পালন করতেই হবে চীনের লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ-তরুণী এমনটা এখন আর মনে করেন না। এ বিষয়ে শাশা বলেন, ‘মা-বাবার মন পেতে অনেক কিছু করেছি। কিন্তু বিয়ের বিষয়ে তাদের ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের শেকল আমাকে ভাঙতে হয়েছে। বিয়ে করে সন্তান জন্ম দেওয়া অপরিহার্য মনে করি না। আমি আমার মা-বাবা ও বন্ধুদের বিয়ে দেখেছি। সেসব দেখে ঈর্ষান্বিত হওয়ার মতো কিছু পাইনি।’ শাশা এখন চীনের সাংহাই শহরে একাই একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন।
চীনের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছেন শাশা ইয়ু ও ডিং চিনসি। একজন সংসার করতে চান, আরেকজন চান না। তবে তাদের মধ্যে মিল আছে। তারা দুজনই চীনের জন্মহার হ্রাসে ভূমিকা রাখছেন। গত কয়েক দশকে দেশটিতে কেন বিয়ে ও জন্মহার উদ্বেগজনক হারে কমেছে, তা শাশা ও ডিংদের দেখলে বুঝতে সমস্যা হয় না। ২০২১ সালের শেষের দিকে চীনের কমিউনিস্ট ইয়ুথ লিগ ১৮ থেকে ২৬ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের নিয়ে একটি জরিপ করে। এতে দেখা যায়, ৪৪ শতাংশ নারী ও ২৫ শতাংশ পুরুষ নিশ্চিত নন, তারা বিয়ে করবেন কি না। সাংহাইয়ের মতো চীনের আধুনিক শহরগুলোতে শাশার মতো তরুণীদের মধ্যে এই অনিশ্চয়তার হার সবচেয়ে বেশি।
অর্থনৈতিক চাপ
২০১৯ সালে চীনের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, একটি শিশু বড় করতে সেখানে গড়ে ৭৬ হাজার ডলার ব্যয় হয়, যা দেশটির মাথাপিছু আয়ের সাত গুণ। চীনের সাংহাই শহরে এই খরচ দ্বিগুণ। একটি সন্তানের পেছনে ৭৬ হাজার ডলার ব্যয়ের সামর্থ্য চীনের অনেক পরিবারের নেই। আবার যাদের আছে, তাদের অনেকে সন্তান নিতে চান না। এমনই একজন ৩৬ বছর বয়সী স্কারলেট কাই। সাংহাইয়ের এক পরিপাটি অ্যাপার্টমেন্টে স্বামীকে নিয়ে থাকেন তিনি। পরিবারের বয়স্ক তিন সদস্যের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাদের ওপর। সন্তান লালনের সক্ষমতা স্কারলেটের থাকলেও তিনি সন্তান নিতে চান না। এ নিয়ে তার মা কিছু বললে তিনি উত্তর দেন, ‘কেবল সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য আমি জীবনযাপন করছি না।’ বড় হওয়ার পর স্কারলেট দেখেছেন, মেয়েরা বিয়ে করার পর চাকরি-বাকরি ছেড়ে দেন। সন্তান লালন-পালন ও গৃহস্থালি কাজকর্মের মধ্যে ডুবে গিয়ে তারা একপর্যায়ে তাদের ব্যক্তিসত্তা হারিয়ে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘আমি যখন ছোট ছিলাম, সে সময় আমি আমার চারপাশে অনেক অদৃশ্য নারী দেখেছি। আমি অবাক হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করতাম, তাদের জীবন এমন হবে কেন?’ বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন স্কারলেট। ওই সময় ফরাসি দার্শনিক, লেখক ও নারীবাদী কর্মী সিমোন দ্য বোভোয়ারের বই পড়ার সুযোগ হয় তার। স্কারলেট বলেন, ‘আলোচনা করে আমি আর আমার স্বামী সিদ্ধান্ত নিই, আমরা বাচ্চা নেব না। সবাইকে বংশবৃদ্ধি করতেই হবে, এমন কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই।’ চীনে স্কারলেটের মতো এমন অনেকে আছেন, যারা সন্তান নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী নন। আর যেসব দম্পতি আগ্রহী, তারা একটির বেশি সন্তান নিতে চান না। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি এর জন্য দায়ী। ওই দম্পতিরা একটি শিশু বড় করতেই হিমশিম খাচ্ছেন। আরেকটি নেওয়ার চিন্তা তারা করতে পারেন না অর্থনৈতিক কারণে।
আর্থ-সামাজিক এমন নানা কারণে চীনে জন্মহার হ্রাস যাচ্ছে, যা ভাবাচ্ছে দেশটির বিশেষজ্ঞদের। জন্মহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের নীতি কতটা কাজে আসে, তাই এখন দেখার বিষয়।