নামাজ সুন্দর করার অনুশীলন

ধরুন এলাকার খুব প্রভাবশালী একজনের কাছে আপনার প্রয়োজন তুলে ধরার একটা সুযোগ পেলেন, তিনি আপনার প্রয়োজন মেটানোর ক্ষমতা রাখেন। এই সুযোগে আপনার যত অভাব, চাহিদা, আবেগ, অনুভূতি সব তার সামনে পেশ করতে পারবেন। তখন আপনি নিশ্চয়ই চেষ্টা করবেন নিজেকে একটু গুছিয়ে, পরিপাটি করে তার সামনে উপস্থিত করতে। তার সামনে দাঁড়াতে আপনি যথেষ্ট খেয়াল রাখবেন পাছে না কোনো বেয়াদবি হয়ে যায়। কথা বলতে চেষ্টা করবেন খুব গুছিয়ে, ধীরে-সুস্থে।

যেখানে সামান্য কয়েকজন মানুষের ওপর ক্ষমতাবান মানুষের প্রতি এত ভয়, এত বিনয় সেখানে সমগ্র জগতের প্রতিপালক মহান রব, তিনি সব প্রভাবশালীর ওপর প্রভাবশালী তার সামনে দাঁড়াতে অন্তরে কতটুকু ভয় আর বিনয়ের মিশেল থাকা প্রয়োজন- একটু ভাবুন। সেই রাজাধিরাজ মহান রবের সামনে কথা বলতে কতটুকু সংযত হওয়া প্রয়োজন একটু ভাবুন। কিন্তু এখানটায় এসেই আমাদের যত তাড়াহুড়ো  লেগে যায়।

আপনার নিশ্চয়ই নামাজকে সুন্দর করতে ইচ্ছে করে! খুশু-খুজু (ধীর-স্থিরতার সঙ্গে, একনিষ্ঠভাবে) সহকারে নামাজ দাঁড়াতে ইচ্ছে করে। চলুন এ জন্য কিছু করণীয় জেনে নিই-

এক. আজানের ধ্বনি কানে আসামাত্র নামাজের জন্য উঠে দাঁড়ান। প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করুন। এতে করে ঠিক আগের সময়টিতে পার্থিব চিন্তাভাবনা ঝেড়ে ফেলে আখেরাতের ভাবনায় ডুব দেওয়ার এক অপার্থিব সুযোগ আপনি পাচ্ছেন।

দুই. উত্তম স্থানে উত্তম সময়ে নামাজ আদায়ের স্বাদ অতুলনীয় এক অনুভূতি সৃষ্টি করে। তাই আমাদের উচিত হবে প্রথম ওয়াক্তে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করা।

তিন. একদম তাড়াহুড়ো নয়, বরং যথেষ্ট পরিমাণ সময় নিয়ে আমরা নামাজ আদায় করব। নামাজে তাড়াহুড়ো করার প্রবণতা নামাজের একাগ্রতা ছিনিয়ে নেবে।

চার. একই কাজ বারবার করতে থাকলে একঘেয়েমি পেয়ে বসা খুবই স্বাভাবিক। নামাজে একঘেয়েমি ভাব চলে আসার অন্যতম কারণ হলো- আমরা নির্দিষ্ট কিছু সুরা বুঝে না বুঝে বারবার তেলাওয়াত করি। ফলে নামাজের ভেতর উদাসীনতা পেয়ে বসে। মুখে তেলাওয়াত-তাসবিহ চলে, আর ওদিকে মন পড়ে থাকে দোকানে-অফিসে। এক্ষেত্রে করণীয় হলো- নতুন নতুন সুরা ও আয়াত মুখস্থ করার ধারা চালু রাখা এবং তা নামাজে তেলাওয়াত করা।

পাঁচ. নামাজে দ্রুত কোরআন তেলাওয়াত নয়, বা একেবারেই বেশি বেশি পাঠ করে কোরআন খতম করা নয়। বরং সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প অল্প করে পাঠ করা। যেটুকু পাঠ করছেন, তার অর্থ ও মর্ম জেনে পাঠ করার চেষ্টা করা। এই পদ্ধতি আল্লাহর ইচ্ছায় আপনাকে বহুদূর নিয়ে যাবে।

ছয়. যখন একাকী নামাজ আদায় করছেন, তখন নামাজকে যথাসম্ভব দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করুন।

সাত. গভীর রাতের নামাজ যেন একাগ্রতার পেয়ালায় তৃপ্ত চুমুক। সবার অলক্ষ্যে বলে একাগ্রতার পারদও থাকে ঊর্ধ্বমুখী। নিশুতি রাতে তাই রবের মমতামাখা ডাকে সাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে যান তাহাজ্জুদের জায়নামাজে।

আট. নামাজে নিবিড় একাগ্রতা এসে যাওয়ার পর তা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি করার চেষ্টা থাকবে আমাদের। তাহলে ধরে রাখা নিয়ে ভাবতে হবে না। এজন্য করণীয় হচ্ছে-

ক. ইমানের পারদ ঊর্ধ্বমুখী রাখার জন্য প্রতিনিয়ত ইমানি দাওয়াত ও আলোচনা করা। খ. বিশেষ করে নামাজের দাওয়াত, নামাজের ভেতর-বাহির, ফরজ-ওয়াজিব-সুন্নত-মুস্তাহাব, খুশু-খুজুর দাওয়াত দেওয়া।

নয়. যখনই নামাজে কোনো কারণে একাগ্রতার ঘাটতি দেখা দেবে, ঠিক সেই মুহূর্তে নামাজকে দীর্ঘায়িত না করা। এমন সময়ে নামাজ দীর্ঘ সময় কাটাতে গেলেই অভিশপ্ত শয়তান নানা ভুল-ত্রুটির ফাঁদে ফেলে আপনার নামাজকে একবারে হালকা বানিয়ে ছেড়ে দেবে।

দশ. যখন নামাজে গভীর মনোযোগ, নিবিড় একাগ্রতা আর প্রকৃত স্বাদ পেতে শুরু করবেন তখন লম্বা লম্বা সময় নিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যান।