চেক প্রতারণার অভিযোগে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর নাছির আহমেদকে ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই দুই মাসের কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেয় চট্টগ্রামের একটি আদালত। পরে নাছিরের করা আপিলে সাজা কমে এক মাসের কারাদণ্ড হয়। সাজা পরোয়ানার পর নাছির প্রতারণার আশ্রয় নেন। চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ের চা বিক্রেতা মজিবুর রহমানের সঙ্গে চুক্তি করেন তিনি। গত ১৩ মার্চ নাছির নাম ধারণ করে চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্ট আদালতে আত্মসমর্পণ করেন মজিবুর। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়। তবে কারাগারে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে আঙুলের ছাপ না মেলায় ১৬ মার্চ জানাজানি হয় যে এ আসামি প্রকৃত আসামি নন। জানা গেছে, মাত্র ৩ হাজার টাকার চুক্তিতে নাছিরের হয়ে সাজা খাটতে রাজি হন মজিবুর।
গত দুই বছরে এমন অন্তত ছয়টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে যেখানে চুক্তি করে টাকার বিনিময়ে একজনের হয়ে অন্যজন কারাগারে গেছেন। এর মধ্যে গত দুই মাসে চট্টগ্রামের ঘটনাটিসহ গণমাধ্যমে প্রকাশিত চারটি ঘটনা আলোচনায় এসেছে। ২০১৮ সালের ৮ জুলাই পুলিশ কর্মকর্তা মামুন ইমরান খান খুনের মামলার আসামি দুবাই প্রবাসী স্বর্ণ ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খানের হয়ে মো. আবু ইউসুফ নামে এক ব্যক্তির কারাগারে যাওয়ার বিষয়টি সম্প্রতি আলোচনায় আসে। এ ছাড়া সম্প্রতি কক্সবাজারে মাদকের মামলায় সাইদুল নামে একজন দাগী ইয়াবা কারবারির হয়ে শাহজাহান নামের এক ব্যক্তির কারাগারে যাওয়ার বিষয়টিও গণমাধ্যমে এসেছে। ২০১০ সালে একটি হত্যা মামলাসহ দুটি মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি সোহাগের হয়ে অর্থের বিনিময়ে মো. হোসেন নামের এক ব্যক্তির কয়েক বছর কারাবাসে থাকার খবর পাওয়া যায় গত বছরের ৩০ জানুয়ারি। এ ঘটনায় শাহরিয়ার সিরাজী ও ইব্রাহীম হোসেন নামে দুই আইনজীবীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও উঠে আসে। গত বছরের ২১ মার্চ বাগেরহাটের শরণখোলায় মারধরের একটি মামলায় ফরিদ উদ্দিন মানিক হাওলাদারসহ চারজনকে আসামি করে ওই বছরের ৩১ মে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। বিচারকালেই সৌদি আরবে চম্পট দেন ফরিদ উদ্দিন। তবে, প্রতারণার মাধ্যমে ফরিদ উদ্দিন নাম ধারণ করে তৈরি পোশাক বিক্রেতা আল আমিন গত ১৮ এপ্রিল বাগেরহাটের সংশ্লিষ্ট আদালতে জামিনের আবেদন করলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠায়। পরে জানাজানি হয় যে এ ব্যক্তি প্রকৃত আসামি নন।
ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের কারাগারগুলো কখনোই স্বস্তির জায়গা নয়। পরিবার ও সমাজের বাইরে সেখানে প্রাত্যহিক জীবনযাপন থাকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে। থাকে অসুস্থ হওয়ার কিংবা জীবনের ঝুঁকিও। কিন্তু এত কিছু জেনেও একশ্রেণির মানুষ আরেকজনকে কারাবাসে প্ররোচিত করছে, একই সঙ্গে কিছু মানুষ অর্থের লোভে বা অন্য কোনো কারণে জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে যা উদ্বেগের বিষয়। এ প্রবণতার পেছনে লোভ, আইন ও আদালতের ফাঁকফোকর, বিচারকাজকে অবজ্ঞা করার অহংবোধ, প্রচলিত সমাজ থেকে বিচ্যুতিমূলক জীবন ধারণের মতো বিষয়গুলো কাজ করছে বলে মনে করেন তারা। এভাবে অন্যের সাজা খাটতে যাওয়াকে নতুন ধরনের অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলেন, আইন-আদালতকে ফাঁকি দিয়ে ভয়ংকর প্রতারণার এসব ঘটনায় কারও বিচার বা শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে এমন শোনা যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমাজ পরিবর্তিত হয়ে একটি আধুনিক সমাজব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। জনসংখ্যা ও অপরাধও বাড়ছে সমানতালে। এর সঙ্গে অপরাধের ধরন ও নিত্যনতুন কৌশল তৈরি হচ্ছে। অন্যের হয়ে সাজা খাটার এই প্রবণতাও এরই অংশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এতটা দারিদ্র্যের পর্যায়ে যায়নি যে আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কেউ এ ধরনের ঝুঁকি নেবে।’
অধ্যাপক জিয়া মনে করেন, আইন ও আদালতের কিছু দুর্বলতা ও ফাঁকফোকর আছে বলেই এমনটি ঘটছে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এন গোস্বামী বলেন, ‘ফ্রয়েডের (মনোবীক্ষণের জনক অস্ট্রিয়ার সিগমুন্ড ফ্রয়েড) একটি তত্ত্বে মানুষের অবক্ষয়ের তিনটি সূত্রের বিশ্লেষণ বলছে, কিছু পাওয়ার জন্য মানুষের তীব্র আকাক্সক্ষা, কোনো কিছুকে তুচ্ছ মনে করার অহংবোধ এবং চরম অহংবোধ। দেখা যাচ্ছে, কিছু মানুষের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতা কাজ করছে। ফলে অপরাধ জেনেও আইন ও বিচারব্যবস্থাকে তুচ্ছ করে অন্যের হয়ে সাজা খাটার মতো চরম ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করতে কিংবা প্ররোচনা দিতে কিছু মানুষ দ্বিধাবোধ করছে না। এটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়।’
বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৪১৬ ধারায় অন্যের রূপ ধারণ করে প্রতারণার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে অন্য কোনো ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করে অথবা জ্ঞাতসারে কোনো ব্যক্তিকে অন্য ব্যক্তি বলে চালিয়ে দেয় তাহলে সেই ব্যক্তি অপরের রূপ ধারণ করে প্রতারণা করছে বলে গণ্য হবে। দণ্ডবিধির ৪১৯ ধারায় অপরের রূপ ধারণ করে প্রতারণার শাস্তি হিসেবে তিন বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের সশ্রম কারাদন্ড ও অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে।
আইনজীবীরা বলেন, অন্যের হয়ে সাজা খাটার বিষয়টি নতুন না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এর প্রবণতা বেড়েছে। তবে, যেসব ঘটনা ধরা পড়ে তাতে সংশ্লিষ্ট আসামিদের বিচার নিষ্পত্তি হয়ে সাজার খবর পাওয়া যায় না।
বদলি সাজা খাটার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি প্রকাশ হয় ২০২১ সালের মার্চে। চট্টগ্রাম মহানগরের রহমতগঞ্জ এলাকায় ২০০৬ সালের ৯ জুলাই কোহিনূর বেগম নামে এক পোশাককর্মী খুনের ঘটনায় ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর যাবজ্জীবন সাজা পান কুলসুমা আক্তার কুলসুমী। তবে, তার পরিবর্তে সাজা খাটতে থাকেন বিধবা ও তিন সন্তানের জননী মিনু আক্তার। বিষয়টি ২০২১ সালের ১৮ মার্চ জানতে পারে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ। ওই বছর ৭ জুন হাইকোর্ট এক আদেশে মিনু আক্তারকে মুক্তির নির্দেশ দেয় এবং এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট তিন আইনজীবীকে তলব করে। পরে ওই বছরের ১৬ জুন মুক্তি পান তিনি। কিন্তু কয়েকদিন পর ১৬ জুলাই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান মিনু। তবে তার মৃত্যুর বিষয়টিকে সন্দেহজনক উল্লেখ করেছিলেন হাইকোর্টে মিনুর পক্ষে শুনানিকারী আইনজীবীরা। তার এ ঘটনায় তোলপাড় শুরু হলে কারাগারে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় আসে। বিষয়টি উচ্চ আদালতের নজরেও আনা হয়।
এ নিয়ে হাইকোর্টের রায় আসে মোদাচ্ছের আনসারীর পরিবর্তে মোহাম্মদ জহির উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে ‘ভুল’ আসামি হিসেবে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় করা রিট আবেদনে। গত বছরের ৫ জুলাই দেওয়া ওই রায়ে দেশের সব কারাগার ও থানায় আসামির আঙুল ও হাতের তালুর ছাপ, চোখের মণির মাপ সংরক্ষণের মাধ্যমে বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি চালুর নির্দেশ দেয় আদালত।
মিনু ও জহিরের পক্ষে আদালতে শুনানিকারী আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাইকোর্টের রায়ের পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারসহ বেশকিছু কারাগারে এ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এর সুফলও মিলছে। কিছু কারাগারে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি মনে করেন, কারাগারগুলোতে বায়োমেট্রিক পদ্ধতির আরও ব্যাপক ব্যবহার বাড়ালে প্রতারকরা ভয় পাবে, সতর্ক হবে।
বদলি সাজা খাটার বিষয়ে সাবেক ডিআইজি প্রিজন (কারা উপ-মহাপরিদর্শক) মেজর জেনারেল (অব.) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছু অসৎ লোকের কারণে দেশের কারাগারগুলো অনেক ক্ষেত্রে সংশোধনাগার বা যুগোপযোগী হয়নি। এরপরেও কিছু লোক স্বেচ্ছায় কারাগারে যায় বলে মাঝেমধ্যেই শুনি। এর মধ্যে কিছু লোক নিতান্তই গরিব এবং তারা যায় টাকার লোভে। আর কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভয়ভীতি দেখিয়ে পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে কারাগারের কাজ শুধুই শনাক্ত করা।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন সাময়িকী ঢাকা ল’ রিপোর্টস’র সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘কিছু লোকের মধ্যে বিচারব্যবস্থাকে অবজ্ঞা করার প্রবণতাও বাড়ছে। কিন্তু তাদের শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে এমন চোখে পাড়ে না।’
তিনি বলেন, ‘অন্যের হয়ে কারাবাসের ঘটনায় যে প্ররোচিত করছে সে যেমন অপরাধ করছে, তেমনি যিনি লোভের বশে বা অন্য কোনো কারণেই হোক কারাগারে যাচ্ছেন তিনিও অপরাধ করছেন। এসব প্রতারকের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হওয়া সমীচীন।’