কোরআন মাজিদ অবতীর্ণের প্রাক্কালে স্বয়ং কোরআনই আরবদের এর সম্মোহনী শক্তিতে সম্মোহিত করেছিল। যার অন্তরকে আল্লাহতায়ালা ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন তিনি এবং যাদের মনের ওপর ও চোখের ওপর পর্দা পড়ে গিয়েছিল তারাও এ কোরআনের সম্মোহনী প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। যদিও তারা এ কোরআন থেকে কোনো উপকৃত হতে পারেনি। কিন্তু কিছু এমন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যারা প্রাথমিক অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তখন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এত বেশি শক্তি ও ক্ষমতাশালী ছিলেন না যে, তারা তার ক্ষমতা ও শক্তিমত্তায় বিমোহিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। বরং তাদের ইসলাম গ্রহণের মূলে ছিল কোরআন মাজিদের মায়াবী আকর্ষণ।
হজরত উমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা এবং হজরত ওয়ালিদ বিন মুগিরা (রা.)-এর প্রভাবিত হওয়ার ঘটনা দুটো উপরোক্ত বক্তব্যকেই স্বীকৃতি দেয় এবং প্রমাণ করে যে, কোরআনে কারিমের সম্মোহনী শক্তি অত্যন্ত প্রবল। যা শুধু ইমানদারদের নয়; বরং কাফেরদেরও প্রবলভাবে প্রভাবিত করত।
প্রশ্ন হচ্ছে, কোরআন মাজিদ আরবদের কীভাবে পরাজিত করল এবং ইমানদার ও কাফেরদের মধ্যে এটি কীভাবে এমন প্রচণ্ড প্রভাব ফেলল?
যে সব মনীষী কোরআন মাজিদ বোঝার ব্যাপারে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছেন এবং কোরআনে কারিমের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করে কলম ধরেছেন, তারা তাদের সাধ্যমতো এ ব্যাপারে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। অনেক আলেম কোরআনি বিষয়বস্তুর মিল ও যোগসূত্র সম্পর্কে কিছু না বলে অন্যভাবে কিছুটা আলোচনা করেছেন। যা কোরআন এমন কিছু ঘটনা বলে দিয়েছে, যা পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যেই সংঘটিত হয়েছে। তা ছাড়া কোরআন বিশ্বপ্রকৃতি ও মানব সৃষ্টি সম্পর্কে আলোকপাত করেছে ইত্যাদি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ কোরআন মাজিদে প্রচুর বর্ণনা করা হয়েছে। যা আল-কোরআনের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক।
কিন্তু ছোট ছোট সেই সব সুরার ব্যাপারে বক্তব্য কী, যেখানে কোনো শরিয়তের বিধান বর্ণনা করা হয়নি কিংবা যেখানে কোনো অদৃশ্য জগতের বিবরণ পেশ করা হয়নি; পার্থিব জগতের কোনো জ্ঞান বিতরণ করা হয়নি? যদিও ছোট সেই সুরাগুলোতে সব বিষয়ের সামষ্টিক আলোচনা করা হয়নি (যা কোরআনে কারিমের অনেক সুরায় করা হয়েছে)। তবু কোরআন মাজিদ অবতীর্ণের প্রথম দিকে সেগুলো আরবদের প্রবলভাবে সম্মোহন করেছিল। ওই সুরাগুলোর মাধ্যমেই এসেছিল তাদের চিন্তার জগতের আলোড়ন এবং তার সৌন্দর্যের প্রতি তীব্র আকর্ষণ।
একথা স্বীকার করতেই হবে যে, এ ছোট সুরাগুলোর জাদুকরী প্রভাব এত তীব্র ও অপ্রতিরোধ্য ছিল, যার কারণে শ্রোতা মোহগ্রস্ত না হয়ে পারত না। আল কোরআন স্বীয় বৈশিষ্ট্যের প্রভাবে কাফের ও মুমিনদের তার প্রভাব বলয়ে টেনে নিতে সক্ষম হয়েছে। যারা ইসলাম গ্রহণ করে সৌভাগ্যশালী হয়েছেন, তাদের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে আল কোরআন। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায়ই নেই যে, আল- কোরআনের ছোট একটি সুরা কিংবা তার অংশবিশেষ তাদের জীবনের মোড়কে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। অবশ্য ইসলাম পূর্ণতাপ্রাপ্তির পর যেসব লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের পেছনে কোরআন মাজিদ ছাড়াও কিছু আচার-আচরণে এবং বাহ্যিক তৎপরতা ক্রিয়াশীল ছিল। তবে প্রাথমিক পর্যায়ের সৌভাগ্যবান মুমিনদের পেছনে ইমানের ব্যাপারে যে বস্তুটি ক্রিয়াশীল ছিল তা কেবলমাত্র কোরআন ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রশ্ন হতে পারে কোরআন মাজিদের এই সম্মোহনী শক্তির উৎস কোথায়?
উত্তরে ইসলামি স্কলাররা বলেছেন, একটি কথা ভেবে দেখা দরকার- তখন পর্যন্ত শরিয়ত পরিপূর্ণ ছিল না, অদৃশ্য জগতের খবর ছিল না, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে জোরালোভাবে তেমন কিছু বলা হয়নি, ব্যবহারিক কোনো দিক-নির্দেশনা তখনো কোরআন দেয়নি, কোরআনে অতি সামান্য একটি অংশ ইসলামের দাওয়াতি কাজ করার জন্য বর্তমান ছিল। তবু সেখানে জাদু ও সম্মোহনী শক্তির উৎস নিহিত ছিল। আর এখন তো পূর্ণ কোরআন আমাদের সামনে বিদ্যমান। সুতরাং সব মানুষের জন্য দরকার, কিছু সময়ের জন্য হলেও কোরআনে কারিমের সেই শৈল্পিক সৌন্দর্য ও রহস্য অনুধাবনের চেষ্টা করা।
কোরআন মাজিদ শাশ্বত ও চিরন্তন। শৈল্পিক এ সৌন্দর্য কোরআন মাজিদকে অন্য সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী করে দেয়। ফলে দ্বীনি গুরুত্ব ও উদ্দেশ্য পূর্ণতা লাভ করে ধাবিত হয় মনজিলে মাকসুদের দিকে। এটাও কোরআনে কারিমের একটি সম্মোহনী শক্তি, অনেকে তা অনুধাবন করে আর অনেকেই তা করে না।