পাহাড়ে পানির হাহাকার

রাঙ্গামাটি সদরের সাপছড়ি ইউনিয়নের দুর্গম গ্রাম নারাইছড়ি। সাপছড়ির রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়ক থেকে পাহাড়ি পথ ধরে প্রায় ঘণ্টাখানেক হেঁটে যেতে হয় গ্রামটিতে। উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ হওয়ায় কোনো যানবাহন যেতে পারে না সেখানে। গ্রামটিতে বসবাস ১১৩টি পরিবারের প্রায় ৫০০ মানুষের। পানীয় জলের জন্য যাদের সবাই নির্ভরশীল গ্রামের একটিমাত্র পাহাড়ি ছড়ার ওপর। কিন্তু শুকনো মৌসুমে সবেধন নীলমণি সেই ছড়াটিও শুকিয়ে যাওয়ায় খাবার পানিসহ নিত্যব্যবহার্য পানির তীব্র কষ্টে ভুগছে গ্রামের প্রতিটি মানুষ। তবে এ চিত্র শুধু নারাইছড়ি গ্রামেরই নয়। বর্তমানে একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির বহু জনপদে।

সুপেয় পানির জন্য ধুঁকছে জেলা তিনটির দুর্গম পাহাড়ি গ্রামের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। পাহাড়ে বসবাসের কারণে সারা বছর এসব গ্রামবাসীকে স্থানীয় ঝিরি-ঝরনার পানির ওপর নির্ভর হয়ে জীবনধারণ করতে হয়। ঘরের সব কাজসহ পানের জন্য ব্যবহার করা হয় এ পানি। সাধারণত বর্ষার সময় থেকে শীত মৌসুম পর্যন্ত ঝিরি-ঝরনা থেকে পানি সংগ্রহ করা গেলেও মাঘ-ফাল্গুন থেকে পাহাড়ে সুপেয় পানির সংকট দেখা দেয়। সরকারের উদ্যোগে দুর্গম কিছু কিছু পাহাড়ি গ্রামে রিংওয়েল ও টিউবওয়েল স্থাপন করা হলেও শুকনো মৌসুমে এসব থেকে পানি মিলছে না। গ্রামবাসী আশপাশের নিচু জায়গায় তৈরি করা কুয়া থেকে পানি সংগ্রহ করলেও শুকনো মৌসুমে এসব কুয়াও যাচ্ছে শুকিয়ে।

এমন পরিস্থিতিতে গ্রীষ্মের দাবদাহে ঘর্মাক্ত হয়ে দীর্ঘ পাহাড়ি পথ হেঁটে পাড়ি দিয়ে অনেকে কাপ্তাই হ্রদ থেকে পানি সংগ্রহ করছে, আবার কেউ কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে পাশের গ্রাম কিংবা হ্রদ থেকে পানি সংগ্রহ করছে। এ যেন এক কলসি ঘামের দামে এক কলসি পানি সংগ্রহ। কিন্তু হ্রদের পানি ফুটিয়ে পান করতে পারলেও শুকনো মৌসুমে সেই পানিও একেবারে কমে গেছে। যদিও সরকারি হিসাবে, পাহাড়ে গড়ে ৬০ ভাগ মানুষ সুপেয় পানির আওতায় এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বছরের অর্ধেক সময় বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ পানির অভাবে ধুঁকছে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, একসময় সারা বছরই ঝিরি-ঝরনার পানির ওপর নির্ভরশীল থাকলেও নির্বিচারে বন উজাড় ও পাথর উত্তোলন, সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ এবং সেগুনগাছের আধিপত্যসহ আরও নানান কারণে প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এখন শুধু বর্ষা মৌসুমেই ঝিরি-ঝরনাগুলোতে পানি পাওয়া যায়। তাছাড়া পাহাড়ে জনবসতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির সংকট আরও বাড়ছে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, মূলত সমতলের পদ্ধতি ব্যবহার করে পাহাড়ে সুপেয় পানির সংকট নিরসন সম্ভব নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ও পাথুরে এলাকা হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সব জায়গায় পাওয়া যায় না। যার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপনের মধ্য দিয়েও পুরোপুরি পানি সংকট সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য গবেষণার প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

রাঙ্গামাটি সদরের সাপছড়ি ইউনিয়নের নারাইছড়ি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের সবকটি পরিবার কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষিকাজে পানি ব্যবহার করা হয় পাশের ছড়া থেকে। কিন্তু ছড়া শুকিয়ে যাওয়ায় অনেক জমি ফাঁকা পড়ে রয়েছে। গ্রামের নারীরা দূর-দূরান্তের কুয়া থেকে প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করছে। এ পানি দিয়েই চলছে পান করা থেকে শুরু করে ঘরের রান্নাবান্নাসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজ। নারাইছড়ির মতো পুরো রাঙ্গামাটির বেশিরভাগ পাহাড়ি অঞ্চলেই পানির এমন কষ্টে ভুগছে মানুষ। প্রাকৃতিক উৎস ধ্বংসের কারণে শুকনো মৌসুমে পানির জন্য কষ্ট পেতে হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে। সরকারি হিসাবে, জেলার ৬৩ ভাগ মানুষ সুপেয় পানির আওতায় এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বছরের অর্ধেক সময় বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে জেলার ৭০ ভাগ মানুষ পানির অভাবে ধুঁকছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাঙ্গামাটির ১০ উপজেলার মধ্যে বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ির প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এসব এলাকার মানুষ বেশিরভাগই পাহাড়ের ওপর বসবাসের কারণে গভীর নলকূপও স্থাপন করা সম্ভব হয় না। কিছুটা নিচু জায়গায় পানির স্তর পাওয়া গেলেও সেখান থেকেও পানি সংগ্রহ করতে কষ্ট হয়।

নারাইছড়ির বাসিন্দা সুমিতা চাকমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শীতের পর থেকে গ্রামে পানির কষ্ট বেড়ে যায়। পাশের ঝিরি থেকে অন্যান্য সময় পানি পাওয়া গেলেও শুকনো মৌসুমে সেটাও থাকে না। ছড়া শুকিয়ে সড়কের মতো হয়ে যায়। তাই ঘণ্টাখানেক পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে পাশের গ্রাম থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়।’ পানি সংকটের কারণে প্রতিদিন গোসল করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।

এদিকে কাপ্তাই হ্রদেও পানি সংকটের কারণে সুপেয় পানির সমস্যা আরও তীব্র হয়েছে। হ্রদ থেকে পরিষ্কার পানি নিয়ে ফুটিয়ে পান করার জন্যও বেগ পেতে হচ্ছে। শুকনো মৌসুম হওয়ায় পানির স্তর একেবারে নিম্নস্তরে রয়েছে। এ জন্য অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে হ্রদের পানির দেখা মিলছে। কাপ্তাই হ্রদের রুলকার্ভ অনুযায়ী, পানির স্তর বর্তমানে থাকার কথা ৮১ এমএসএল (মিনস সি লেভেল)। কিন্তু কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হ্রদে পানির স্তর রয়েছে ৭৬ এমএসএল। অর্থাৎ বর্তমানে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় পাঁচ ফুট কম গভীরতায় পানি রয়েছে। কাপ্তাই হ্রদে পানির সর্বনিম্ন স্তর ৬৮ এমএসএল।

বরকল উপজেলার সুবলং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তরুণ জ্যোতি চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ি গ্রামগুলোতে রিংওয়েল, টিউবওয়েল বসিয়ে বছরের অন্যান্য সময় পানি পাওয়া গেলেও শুকনো মৌসুমে পানি নেই বললেই চলে। দূর-দূরান্তে যেসব ঝরনায় পানি পাওয়া যায়, সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করছে মানুষ। এ সংকট কাটাতে পানির উৎসস্থলে বনায়ন ও বাঁশ লাগাতে হবে। না হলে দীর্ঘমেয়াদে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এ ছাড়া বাঁধ দিয়ে পানি ধরে রেখে গ্রামে গ্রামে পানি পৌঁছানোর মাধ্যমেও সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। তবে ঝিরি-ঝরনাগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনাও কমে আসছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাঙ্গামাটি জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাগ বড়–য়া বলেন, ‘দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এখানে পানির ব্যবস্থা করা সমতলের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের। তারপরও আমরা সাধারণ মানুষের কাছে খাবার পানি পৌঁছে দিতে কাজ করে যাচ্ছি।’ জেলার ৫৭-৫৮ ভাগ মানুষ সুপেয় পানির আওতায় এসেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

পার্বত্য আরেক জেলা বান্দরবানের পাহাড়ি গ্রামগুলোতেও পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পানি সংকটে গ্রামবাসীর এখন একমাত্র ভরসা কুয়া। গ্রীষ্মের শুরুতে ঝিরি কিংবা ঝরনার পাশে দুই থেকে তিন ফুট গভীর গর্ত খুঁড়ে তৈরি করা হয় এসব কুয়া। সেখান থেকে পাওয়া যায় সামান্য পানি। ছোট গ্লাস বা হাঁড়ি দিয়ে কুয়ার গর্ত থেকে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষরা সংগ্রহ করছেন খাবার পানি। গৃহস্থালি কাজেও ব্যবহার হচ্ছে এ পানি। তবে এ পানিও নিরাপদ নয়। রাতে কুয়ার পানিতে বিভিন্ন ধরনের পশুপাখি কিংবা জীবজন্তু মুখ দেয় বা পানি খেয়ে নেয়। যার কারণে পানি খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

ক্রামাড়িপাড়ার বাসিন্দা মেন লেং ম্রো দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পানির খুব কষ্ট। কুয়ার পানি খেতে হয়। অনেক সময় চার-পাঁচ কিলোমিটার পথ হেঁটে পানি সংগ্রহ করতে হয়। নোংরা পানি খাওয়ায় এলাকার অনেক মানুষের ডায়রিয়া হচ্ছে।’

এলাকাবাসী ও জনপ্রতিনিধিরা জানান, ম্রোলংপাড়া, ক্রামাদিপাড়া, দেওয়াই হেডম্যানপাড়া, যামিনীপাড়া ও বসন্তপাড়াসহ ম্রোদের পাড়াগুলোতে পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বসন্তপাড়ার বাসিন্দা মেনলিয়ান বলেন, ‘পানির তীব্র অভাব। বেশিরভাগ ছড়া শুকিয়ে গেছে। পানির অভাবে অনেকে নিয়মিত গোসল করতে পারে না। নোংরা পানি পান করে অনেকের ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগ হচ্ছে।

পানি সংকট প্রসঙ্গে বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শর্মিষ্ঠা আচার্য বলেন, ‘পাথরের কারণে চাইলেই পাহাড়ের যেকোনো জায়গায় নলকূপ স্থাপন করা যায় না। এ ছাড়াও পাহাড়ের বেশিরভাগ জায়গা উঁচু। তবে যেসব ঝিরিতে শুষ্ক মৌসুমেও পানি থাকে সেখানে জিএফএস পদ্ধতিতে পানি সরবরাহ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’

পানির সংকট দেখা দিয়েছে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি জেলারও বিভিন্ন দুর্গম জনপদে। খাগড়াছড়ি সদরের ঠাকুরছড়া এলাকার কলাপাড়া ও দুল্যাতলীপাড়া, খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কে পাঁচ মাইল, সাত মাইল ও ভাইবোন ছড়া ইউনিয়নের ওয়াক্রাপাড়া, কলাতলীসহ অধিকাংশ এলাকায় দেখা দিয়েছে পানির সংকট। জেলা সদরের খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি সড়কের পাশে ঠাকুরছড়া এলাকার নতুন বাজার। এ বাজার থেকে এক-দেড় কিলোমিটার দূরে কলাপাড়া ও দুল্যাতলীপাড়া। এ দুই পাড়ায় ৫০-৫৫টি পরিবারের বসবাস। পাড়ার অধিকাংশই পরিবারই জুম চাষের পাশাপাশি বাগান করে জীবিকা নির্বাহ করে। পানির জন্য এ দুই গ্রামে রয়েছে একটিমাত্র রিংওয়েল নলকূপ। তাও পানি উঠে নামমাত্র। পাড়ার মানুষকে বাধ্য হয়ে দেড়-দুই কিলোমিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। বাড়ির গৃহিণীদের শুধু পানি সংগ্রহ করতেই দিনের অধিকাংশ সময় চলে যায়। একই অবস্থা জেলার অন্যান্য উপজেলার বেশিরভাগ দুর্গম জনপদে।

দুল্যাতুলী, কলাপাড়া এলাকাটি খাগড়াছড়ি ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। সেখানকার বাসিন্দা জ্যোতি দত্ত ত্রিপুরা বলেন, ‘এ দুটি পাড়াসহ আশপাশের এলাকায় পানির তীব্র সংকট। টিউবওয়েল বা রিংওয়েল করা যায় না। এলাকাটি পাথুরে এবং পানির স্তরও খুব গভীরে। ইউনিয়ন পরিষদ যে বাজেটে টিউবওয়েল ও রিংওয়েল স্থাপন করে, সেই বাজেটে এখানে টিউবওয়েল বা রিংওয়েল হয় না। এই এলাকার পানির সমস্যা সমাধানের জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।’

খাগড়াছড়ি পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আবু দাউদ বলেন, ‘একসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম বনবাদাড়িতে ভরা ও জঙ্গলাকীর্ণ ছিল, ফলে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু নির্বিচারে বন উজাড়ের কারণে পানির উৎসগুলো হারিয়ে গেছে।’

এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রেবেকা আহসান বলেন, ‘পানি সংকট সমাধানে আমরা কাজ করছি। সম্প্রতি একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ২৫০টি পরিবারের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। পানি সংকট সমাধানে পর্যায়ক্রমে এ প্রকল্পের পরিধি আরও বৃদ্ধি করা হবে।’

* রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি প্রতিনিধির পাঠানো তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি