গরিবের ইতিহাসের পাঠ শেখানো রণজিতের বিদায়

আগামী ২৩ মে ১০০ বছর পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন সুহৃদ, ছাত্ররা। কিন্তু তার আগেই চিরবিদায় নিলেন নিম্নবর্গের ইতিহাস সাধনার অন্যতম পথিকৃৎ রণজিৎ গুহ। গত শুক্রবার রাতে (স্থানীয় সময়) অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার বাসভবনে মারা যান বাংলাদেশের বরিশালে জন্ম নেওয়া প্রখ্যাত এ ইতিহাসবিদ।

রণজিৎ গুহের পরিবারের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তী। আনন্দবাজার পত্রিকাকে দীপেশ বলেন, রণজিৎ গুহ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। নানান রোগ ও বয়সের জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে ভিয়েনা সময় রাত ৩টার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

রণজিৎ গুহ ১৯২৩ সালে ২৩ মে বরিশালের বাখরগঞ্জের সিদ্ধকাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দেশভাগের সময় পারিবারিকভাবে কলকাতায় চলে যান। কলকাতায় গিয়ে গুহ কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। গুহ প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র ছিলেন। পরে ১৯৪৭ সালে ডিসেম্বরে প্যারিসে বিশ্ব ছাত্র সম্মেলনেও যোগ দেন। এরপর দলের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি একে একে সাইবেরিয়া, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও চীন বিপ্লব নিজের চোখে খতিয়ে দেখেন। তবে ১৯৫৬ সালে বিদেশ থেকে ফেরার পর হাঙ্গেরিতে সোভিয়েত অনুপ্রবেশের বিরোধিতা করে তিনি সক্রিয় রাজনীতি ছাড়েন। 

১৯৫৯ সালে তিনি ভারত থেকে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান এবং সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে রিডার পদে যোগ দেন। পরে অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতেও অধ্যাপনা করেন।

রণজিৎ গুহ ভারতের কৃষক আন্দোলন নিয়ে সুদূরপ্রসারী কাজ করেছেন। ঔপনিবেশিক ভারতে কৃষক বিদ্রোহ নিয়ে লেখা একটি বইয়ের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের ইতিহাসচর্চার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন। তার লেখা ‘এলিমেন্টারি আসপেক্টস অব পিজেন্ট ইনসার্জেন্সি ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া’ আগেকার লিখিত ইতিহাসের অনেক অধ্যায়কে প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড় করায়। শুরু হয় নিম্নবর্গীয় ইতিহাস চর্চার ধারা। এই নিম্নবর্গীয় ইতিহাস চর্চার প্রভাব পড়ে সারা পৃথিবীতে।

জীবনের অনেকটা সময় ভারত থেকে দূরে থাকলেও রণজিতের সংস্পর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দীপেশ চক্রবর্তী, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, শাহিদ আমিন, গৌতম ভদ্র, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক প্রমুখ নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চায় ব্রতী হয়েছিলেন। দীপেশ চক্রবর্তী এক লেখায় তাকে ‘প্রখ্যাত বাঙালি ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছিলেন, বিশ শতকের সবচেয়ে সৃজনশীল ভারতীয় ঐতিহাসিক।

রণজিতের প্রয়াণে গতকাল শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শোকবার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘প্রবাদপ্রতিম ঐতিহাসিক রণজিৎ গুহর মৃত্যুতে আমি আমার গভীরতম শোক প্রকাশ করছি। আমি রণজিৎ গুহর স্ত্রী মেখঠিল্ড গুহ-সহ তার সব আত্মীয় পরিজন, ছাত্রছাত্রী ও অনুরাগীদের সবাইকে আমার আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।’