চট্টগ্রাম ওয়াসায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জোয়ার শুরু হয়েছে। তিন দিনের ব্যবধানে চেয়ারম্যান ও উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দুজনকে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এর আগে গত ২১ মে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলমকে। গত ২০ সেপ্টেম্বর উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রকৌশল) পদে প্রকৌশলী আতিকুজ্জামান বিল্লাহকে ও ১৭ সেপ্টেম্বর চেয়ারম্যান পদে মো. ইদ্রিস মিয়াকে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
কিন্তু চুক্তিভিত্তিক এই নিয়োগ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে নগরীতে। বিশেষ করে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মো. ইদ্রিস মিয়ার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের জায়গা ব্যাংকে বন্ধক দিয়ে নিজের নামে ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগের জন্য ‘পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন, আইন, ২০২৬) আইন অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্বয়ং সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিধি অনুযায়ী ওয়াসা বোর্ডের সদস্যদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যানের নাম প্রস্তাবনা করবে এবং সরকার তা অনুমোদন করবে। কিন্তু এক্ষেত্রে ওয়াসা বোর্ড কোনো প্রস্তাবনা করেনি। একই সঙ্গে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রেও কোনো বিধান মানা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, চেয়ারম্যান হিসেবে সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষাবিদ কিংবা সিনিয়র কোনো প্রকৌশলীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে সরকারের ঊর্ধ্বতন আমলা কিংবা প্রকৌশলীদের ডেপুটেশনে দেওয়া হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে কিছুই মানা হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত সময়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান ছিলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. জাহাঙ্গীর আলম। এ ছাড়া উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে সরকারের আমলারা দায়িত্ব পালন করে আসছেন। কিন্তু গত ২০ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক নিয়োগ শাখার উপ-সচিব গোলাম রব্বানী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রকৌশল) পদে প্রকৌশলী আতিকুজ্জামান বিল্লাহকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের পানি সরবরাহ-৩ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মোছা. আকতারুন নেছা স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে মো. ইদ্রিস মিয়াকে তিন বছরের মেয়াদে নিয়োগ দেওয়া হয়। মো. ইদ্রিস চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন। তিনি পটিয়ার সাবেক চেয়ারম্যানও ছিলেন। অপরদিকে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া প্রকৌশলী আতিকুজ্জামান বিল্লাহ বিএনপিপন্থি প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েসন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (এ্যাব) অন্যতম নেতা।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে যথার্থ লোক নিয়োগ না হলে চট্টগ্রাম ওয়াসার সেবায় স্থবিরতা নেমে আসতে পারে উল্লেখ করে সনাক ও টিআইবি চট্টগ্রামের সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ভালো। এতে সরকারের বিশ^স্ত লোকগুলো দায়িত্ব পায় এবং জনগণের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া সহজ হয়। কিন্তু পদগুলোতে যদি দক্ষ ও যথার্থ লোকের সংস্থান না হয় তাহলে সরকারের উদ্দেশ্য হোঁচট খেতে পারে এবং জনগণও সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
একই মন্তব্য করেন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান নাজের হোসেন। তিনি এর আগেও চট্টগ্রাম ওয়াসার বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। ওয়াসায় চেয়ারম্যান ও উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রকৌশল) নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি রাজনৈতিক বা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরোধী নই। তবে নিয়োগগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া প্রয়োজন। যেমন ওয়াসা বোর্ড থেকেই চেয়ারম্যান নিয়োগ হতে হবে। এখন বাইরে থেকে একজনকে নিয়োগ দিয়ে দেওয়া কি বাস্তবসম্মত? সঠিক জায়গায় যোগ্য লোকের সংস্থান হলে সরকারের সেবাগুলোও সহজে দেওয়া সম্ভব হয়ে তাকে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সূত্রপাত কখন? : ২০০৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর চট্টগ্রাম ওয়াসায় প্রথমে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহকে। পরবর্তীতে চেয়ারম্যান প্রথার পরিবর্তে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহকে নিয়োগ দেওয়ার পর ওয়াসা বোর্ড গঠন করা হয়। সেখানে চেয়ারম্যানও নিয়োগ দেওয়া হয়। তখন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ মাত্র ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকলেও এখন চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রকৌশল) নিয়োগ দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম ওয়াসা নগরবাসীর চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ পানি সরবরাহ করছে। ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি বর্তমানে চারটি পানি শোধনাগারের মাধ্যমে এই পানি সরবরাহ করছে। এর মধ্যে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টও চালু করতে যাচ্ছে ২০২৮ সালে।