শ্রমিককে মজুরি না দেওয়া পাপ

আল্লাহতায়ালা বান্দাদের ওপর কিছু জিনিস ফরজ করেছেন, যা পরিত্যাগ করা জায়েজ নয়, কিছু সীমা বেঁধে দিয়েছেন, যা অতিক্রম করা বৈধ নয় এবং কিছু জিনিস হারাম করেছেন, যার ধারেকাছে যাওয়াও ঠিক নয়। এমনই একটি বিষয় হলো- কোনো শ্রমিক থেকে ষোলোআনা শ্রম আদায় করে পুরো মজুরি না দেওয়া। বর্তমান সমাজে এই কাজের চর্চা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বহুসংখ্যক মুসলিম নির্দ্বিধায় তা হরহামেশা করে চলেছে। অথচ নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শ্রমিকের পাওনা দ্রুত পরিশোধে জোর তাকিদ দিয়েছেন।

শ্রমিক, কর্মচারী, দিনমজুর যেই হোক না কেন তার থেকে শ্রম আদায়ের পর যথারীতি তার পাওনা পরিশোধ না করা মহাজুলুম। এ জুলুম এখন হর-হামেশাই হচ্ছে। শ্রমিকদের প্রতি জুলুমের বিচিত্র রূপ রয়েছে। যেমন-

এক. শ্রমিক স্বীয় কাজের সপক্ষে কোনো প্রমাণ পেশ করতে না পারায় তার পাওনাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা। এক্ষেত্রে দুনিয়াতে তার হক নষ্ট হলেও কেয়ামতের দিন তা বৃথা যাবে না। কেয়ামতের দিন জালেমের পুণ্য থেকে মজলুমের পাওনা পরিমাণ পুণ্য প্রদান করা হবে। যদি তার পুণ্য নিঃশেষ হয়ে যায় তাহলে মজলুমের পাপ জালেমের ঘাড়ে চাপানো হবে, তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। -সহিহ মুসলিম : ২৫৮১

দুই. যে পরিমাণ অঙ্ক মজুরি দেওয়ার জন্য চুক্তি হয়েছে তার থেকে কম দেওয়া। এ বিষয়ের সমূহ ক্ষতি প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘যারা ওজনে কম দেয় তাদের জন্য দুর্ভোগ রয়েছে।’ -সুরা আল মুতাফফিফিন : ১

অনেক নিয়োগকর্তা দেশ-বিদেশ থেকে নির্দিষ্ট বেতন বা মজুরির চুক্তিতে শ্রমিক নিয়োগ করে থাকে। তারপর তারা যখন কাজে যোগদান করে তখন সে একতরফাভাবে চুক্তিপত্র পরিবর্তন করে বেতন বা মজুরির পরিমাণ অনেক কমিয়ে দেয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওই সব শ্রমিক তখন কাজ করতে বাধ্য হয়। অনেক সময় শ্রমিকরা তাদের অধিকারের সপক্ষে প্রমাণ পেশ করতে পারে না। তখন কেবল আল্লাহর কাছে অভিযোগ দায়ের করা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকে না। এক্ষেত্রে যদি নিয়োগকর্তা মুসলিম ও নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি কাফের হয় তবে বেতন মজুরি হ্রাসে ওই শ্রমিকের ইসলাম গ্রহণে বাধা সৃষ্টি হয়। ফলে কেয়ামত দিবসে ওই কাফেরের পাপ তাকে বহন করতে হবে।

তিন. মজুরি বৃদ্ধি না করে কেবল কাজের পরিমাণ কিংবা সময় বৃদ্ধি করা। এতে শ্রমিককে তার অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত করা হয়।

চার. মজুরি পরিশোধে গড়িমসি করা। অনেক চেষ্টা-প্রচেষ্টা, তদবির তাগাদা, অভিযোগ-অনুযোগ ও মামলা-মোকাদ্দমার পর তবেই প্রাপ্য অর্থ আদায় সম্ভব হয়। অনেক সময় নিয়োগকারী শ্রমিককে ত্যক্ত-বিরক্ত করার উদ্দেশ্যে টালবাহানা করে, যেন সে পাওনা ছেড়ে দেয় এবং কোনো দাবি না তুলে চলে যায়। আবার কখনো তাদের টাকা খাটিয়ে মালিকের তহবিল স্ফীত করার কুমতলব থাকে। অনেকে তা সুদি কারবারেও খাটায়। অথচ সেই শ্রমিক না নিজে খেতে পাচ্ছে না নিজের পুত্র-পরিজনদের জন্য কিছু পাঠাতে পারছে। যদিও তাদের মুখে দুই মুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার জন্যই সে এ দূর দেশে পড়ে আছে। এজন্যই এ সব জালেমের জন্য এক কঠিন দিনের শাস্তি অপেক্ষা করছে।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ বলেন, ‘কেয়ামত দিবসে আমি তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাদী হব- ১. যে ব্যক্তি আমার নামে শপথ করে কিছু দেওয়ার কথা বলে তারপর তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, ২. যে ব্যক্তি কোনো স্বাধীন লোককে ধরে বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করে ও ৩. যে ব্যক্তি কোনো মজুরকে নিয়োগের পর তার থেকে পুরো কাজ আদায় করেও তার পাওনা পরিশোধ করে না।’ -সহিহ বোখারি : ২৯৮৪