প্রকৃতিকে ক্ষেপায় কে?

খরা-বন্যা, রোদ-বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাসসহ নানান অতি ঘটনায় প্রকৃতিকে গালমন্দের একটি মৌসুম যাচ্ছে। প্রকৃতির স্বভাব বদল নিয়ে কথা খুব বেশি হচ্ছে। মানবসৃষ্ট সভ্যতার মতো প্রকৃতিসৃষ্ট জলবায়ুও বদলায়। তবে তা প্রকৃতির যথানিয়মে। যাকে বলা হয় প্রাকৃতিক। সেখানে মানবকুলের ক্রিয়াকর্মের জের পড়লে সেই পরিবর্তনটা হয় অস্বাভাবিক। সেই অস্বাভাবিকতা এখন দেশে দেশে।

প্রকৃতির অন্যতম সদস্য মানুষ। এ মানুষও বদলে যাচ্ছে। তা স্বভাবে-চরিত্রে, কাজেকর্মে সবদিকেই। প্রকৃতিকে সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মানুষের। তারা বেঁচে আছে প্রকৃতির ওপর ভর করে। কিন্তু তাদের নানা কর্মকাণ্ড ও সভ্যতার বিকাশের নামে প্রতিনিয়ত আঘাত পড়ছে প্রকৃতির ঘাড়-মাথায়। ঘাড়ে বা মাথায় আঘাত পড়লে বিগড়াতে বা মাইন্ড করতে সময় লাগে? 

বিশে^র অনেক দেশের মতো হুমকির মুখে বাংলাদেশের পরিবেশ-প্রতিবেশও। দেশে প্রকৃতি নিয়ে কথা বলা ও কাজ করার লোকও কম। পরিবর্তন প্রকৃতির অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হলেও এর ফল সব সময় খারাপ হয় না। কখনো কখনো ভালো কিছুও হয়। প্রকৃতির সব পরিবর্তন সব সময় মানুষের দৃষ্টির সম্মুখে হয় না। দৃষ্টি ও জ্ঞানের অন্তরালেও হয়। অলক্ষ্যে ঘটা ওই পরিবর্তনের ফল সব সময় জানা হয় না। ওই পরিবর্তনের সুফল-কুফলও থেকে যায় জানার বাইরে। অথবা জানতে জানতে অনেক সময় চলে যায়। তা জানার আওতায় আসে বহু পরে গবেষণার বদৌলতে। 

প্রকৃতির পরিবর্তনকে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ নামে সম্বোধন করা হয়। পরিবর্তন হলেও প্রকৃতি কখনো প্রতিহিংসাপরায়ণ হয় না। অভিসম্পাত করে না। প্রকৃতি সবার জন্যই সমান। কাউকে দুচোখে দেখে না। তবে একের পাপে সবাইকে তাপে-চাপে ফেলে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা-খরা মোটেই প্রকৃতির হেলাখেলা বা লীলা নয়। বরং প্রকৃতির ওপর মানবসৃষ্ট কাজকর্মের ফল। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্বের বাহাদুরি করে।  প্রকৃতির সহনশীলতা ও সম্প্রীতিবোধকে গলাটিপে মারার বাহাদুরির জের মানুষকে ভুগতে হচ্ছে।

সাগরকে ভাগাড়, বহতা নদীকে ভরাট পাথরের ঢিবি, সবুজ বনানীকে উৎপাদনসই কলকারখানা বানানোর নিষ্ঠুরতায় প্রকৃতিকেই মেরে ফেলার চর্চা বাংলাদেশসহ অনেক দেশে। পৃথিবীর ফুসফুসে অক্সিজেনের ঘাটতি ঘটিয়ে বন, বৃক্ষ, নদী, পাহাড় এমনকি পশুপাখিদের আবাসস্থলেও মানবজাতির রাজত্বের পরিণাম যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জনবসতির ওপর প্রতিনিয়ত নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন- বন্যা, বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি আঘাত হেনেছে। গবেষকরা বলছেন, গত দশ বছরে বিশ্বে যত বন্যা, ঝড় ও দাবানল হয়েছে তার সবই তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে। বাংলাদেশও এর শিকার। অসময়ে বৃষ্টি, বৃষ্টির মৌসুমে খরা, এক এলাকায় বৃষ্টি, আরেক এলাকায় খরা। শীতকালেও শীতের দেখা মেলে না। প্রকৃতিতে স্বাভাবিকতা থাকলে শীত বা গরম তার ডিসিপ্লিন মতো সবাইকে সার্ভিস দেয়। কখনো কিছু নেয় না। শুধু দেয়। কাউকে নাখোশ করে না।

এ কষ্টকর সময়ে মোটা দাগের সুখবর দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ইইউর পক্ষ থেকে কোপারনিকাস অ্যাটমসফিয়ার মনিটরিং সার্ভিস এবং কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস জানিয়েছে, বরফে ঢাকা উত্তর মেরুর আকাশে ওজন স্তরে তৈরি হওয়া ১০ লাখ বর্গকিলোমিটারের বিশাল গর্তটি নিজে নিজেই সারিয়ে তুলেছে। বড় রকমের শঙ্কা তৈরি হয়েছিল বিশাল এ গর্তটি নিয়ে। কারও কারও ধারণা, করোনাভাইরাসের কারণে দুনিয়া জোড়া উৎপাদন-শিল্পায়ন ও ভোগবিলাসের চাকা স্থবির হয়ে পড়ায় ওজন স্তরের গর্তটি ভরাট হয়ে গেছে। করোনা আক্রমণের পরে পরিবেশ-প্রকৃতি বদলে যাওয়ার এ রকম আরও কিছু খবর প্রচার হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ব্যতিক্রম।

করোনার পর ঢাকা কেবলই বিশ্বের দূষিত নগরীর তালিকায় আসছে। করোনার মতো ভয়াবহ ভাইরাস থেকে বেঁচে যাওয়াদের আচার-আচরণ শুধরানোতে গরজ নেই। প্রকৃতির মান ভাঙিয়ে আবার উদার করে তোলার লক্ষণ নেই। বরং প্রকৃতিকে আরও ক্ষেপানোর বিস্তর আয়োজন। বিজ্ঞানী ও গবেষকদের আশঙ্কা, ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি বঙ্গোপসাগরে তলিয়ে যাবে। নতুন নতুন রোগ, ঘূর্ণিঝড়, খরা, ভূমিকম্পসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ তখন নিয়মিত হয়ে উঠবে। আবহাওয়া হয়ে উঠবে আরও শুষ্ক, আরও উত্তপ্ত । এতে বাংলাদেশসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে বিলুপ্ত হবে বিশেষ প্রজাতির জীব। মানবসমাজও ঝুঁকি ও দুর্যোগের সম্মুখীন হবে।

আসন্ন এ ভয়াবহতা বিবেচনায় বাংলাদেশ যে চুপ করে বসে আছে, ঘটনা এমন নয়। নানা উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। সুফল কি আসছে সেই মাত্রায়? সতেরো কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে জন্মনিয়ন্ত্রণের হালহকিকত জানতে গিয়ে কান টানলে মাথা আসার মতো কিছু তথ্য সামনে আসছে। গড় আয়ু আগের চেয়ে কমে এখন ৭২ দশমিক ৩ বছর। যা আগে ছিল ৭২ দশমিক ৮। এ জন্য মোটাদাগে দোষী করা হয় মহামারী করোনাকে। এ সময়ে মাতৃ ও  শিশুমৃত্যু হারও বেড়েছে। কিন্তু জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হারের অংকটি ঝাপসা। সরকারি জরিপে জন্মহার শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি। গ্রামে ১৯ দশমিক ৫ আর শহরে এই হার ১৬ দশমিক ৪। প্রতিবেদনে  সনাতন-আধুনিক মিলিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার বৃদ্ধি শনাক্ত হয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বা পিল বাজারে আসে ১৯৬০ দশকে। তখন এটিকে নারীর স্বাধীনতা ও শরীরের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের ঘটনা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল। ছিল লজ্জা-শরমের বিষয়ও। পরে ধীরে ধীরে লজ্জা ভাঙতে থাকে। ধারণা ও বিশ্বাস বদলাতে থাকে। জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসে। প্রজনন হার বা ‘টোটাল ফার্টিলিটি রেট’-টিএফআর দুইয়ে নামানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। সেখানে টপ প্রায়োরিটি দেওয়া হচ্ছে পরিবার পরিকল্পনাকে। কিন্তু ফলাফল কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নয়।

প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রজনন হার প্রায় এক জায়গায়ই আটকে আছে। এর হেতু খুঁজতে গিয়ে কখনো বলা হচ্ছে, করোনাই সব বরবাদ করে দিয়েছে। করোনাকে দোষী করতে গিয়ে পরিবার পরিকল্পনার মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে গাফিলতির সত্যতা আড়াল করে ফেলা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা-কর্মীর প্রায় ৩০ শতাংশ পদ খালি পড়ে থাকার তথ্যটি আলোচনার ফাঁক গলিয়ে উহ্য থেকে যাচ্ছে। যার অনিবার্যতায় প্রজননে গরজের বিপরীতে জন্মনিয়ন্ত্রণে তা হচ্ছে না। বরং অনীহা তৈরি হচ্ছে। ভেতরে-ভেতরে ‘মুখ দিয়াছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি’ তত্ত্বটি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কোথাও কোথাও।

পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে বৃষ্টি ও তাপমাত্রা পরিবর্তনে বাংলাদেশের আক্রান্তের কথা বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে। করোনা, ডেঙ্গু, ইবোলা মহামারীসহ অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাবও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যে ভোগান্তি এবং কষ্ট সব প্রাণীর প্রজননগত বিষয়ে ব্যাঘাত করছে। গর্ভবতী মা, প্রসূতি ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবায় তার ভয়াবহতা চিন্তায়ও আসছে না অনেকের। দুর্যোগের সময় কিছু কিছু এলাকায় কী পরিমাণে বাল্যবিয়ে হয়, কিশোরীরা মাতৃত্ব বরণ করে এ সংক্রান্ত হিসাব কারও কাছেই নেই। দুর্যোগ আক্রান্ত জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী এবং কিশোরীদের গর্ভকালীন প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। এর কী ভয়াবহ জের অপেক্ষা করছে, অনেকে ভাবতেও পারছেন না। প্রকৃতিকে দোষ দিয়ে সেখান থেকে নিস্তারের সুযোগ থাকবে না।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট 

mostofa71@gmail.com