জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকৃতির আশীর্বাদ

আবহাওয়ার কল্যাণে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছে চট্টগ্রাম নগরবাসী। প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিলের আচমকা বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। কালবৈশাখীর ঘণ্টাখানেকের বর্ষণে যে জলাবদ্ধতা হতো এবার তার দেখা মেলেনি। এপ্রিলে নগরীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার পারদ ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছিল। এখনো নেই বৃষ্টির কোনো দেখা। আর এতে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প।

শুধু কি প্রাক-মৌসুম? আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পূর্বাভাস বলছে, জলাবদ্ধতা হওয়ার মতো বৃষ্টি সহসা হচ্ছে না। এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর পতেঙ্গা কার্যালয়ের আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবহাওয়ার উপাত্ত অনুযায়ী এ বছর প্রাক-বর্ষা প্রায় হয়নি বললেই চলে। উপরন্তু দেশজুড়ে তাপপ্রবাহ প্রবাহিত হয়েছে। এখনো অব্যাহত রয়েছে তাপপ্রবাহ। কিছুদিন পর বৃষ্টি হলেও জলাবদ্ধতা হওয়ার মতো বৃষ্টিপাত হবে না।’

তাহলে কি আগামী বর্ষা মৌসুম পর্যন্ত জলাবদ্ধতা নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকা যায় এমন প্রশ্নের জবাবে বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি নিয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে এবার মৌসুম বিলম্বে শুরু হচ্ছে। আমাদের এখানে মূলত জুন-জুলাইতে ভারী বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। এবার যেহেতু প্রাক-বর্ষা দেখা যায়নি, তাই বর্ষা মৌসুমের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার দুর্ভোগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যে বছর বৃষ্টিপাত বেশি হবে সে বছর জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ দেখা দেয়। আবার কখনো কখনো মৌসুমের এক বা দুদিন টানা ভারী বর্ষণ হলে জলাবদ্ধতা হয়। তবে বড় বিষয় হলো, বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা নিরসনের নেওয়া মেগা প্রকল্পের কাজে পূর্ণ সময় পাওয়া যায় না। বছরের অর্ধেক সময় (এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর) কাজ করা যায় না।

এবার প্রাক-বর্ষা না হওয়ায় পুরোদমে কাজ করতে পারছেন জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পের কর্মীরা। নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, জলাবদ্ধতা নিরসনে খালের রিটেইনিং ওয়াল (প্রতিরক্ষা দেয়াল) নির্মাণের কাজ চলছে। কিন্তু বছরের এ সময় বৃষ্টির কারণে কাজ বন্ধ থাকত আগে। মুরাদপুর হোটেল জামানের সামনের খালে দেখা যায়, বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। এখানে বাঁধ দিয়ে প্রতিরক্ষা দেয়ালের কাজ করা হবে। এ ছাড়া মুরাদপুর মোড়ের কালভার্টের পর থেকেও কাজ চলমান রয়েছে।

খালের ওপর বাঁধ দিয়ে কাজ বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছিলেন সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পটি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন হলেও মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৩৪ ব্রিগেড।

বাঁধ নির্মাণ বিষয়ে জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাহ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবার বৃষ্টি দেরিতে আসছে বলে আমরা কাজ করার সময় বেশি পাচ্ছি সত্য। অন্যান্য বছর আগেই কাজ বন্ধ করে দিতে হয়। তবে ঈদের বন্ধের কারণে আমরা আবহাওয়ার সদ্ব্যবহার করতে পারিনি। শ্রমিকরা ছুটি কাটিয়ে আসছে মাত্র। এখন কাজ শুরু করছি আবার। আর এমনই কাজ করার জন্য হয়তো মুরাদপুরে সাময়িক বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। ওখানে স্থায়ী কোনো বাঁধ হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা খালের ভেতরে মাটি রেখে কোনো কাজ করব না। কারণ এসব মাটি ঈদের আগে অপসারণ করেছি।’

বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, চশমা খালে শেখ ফরিদ মসজিদের পাশে খালের ভেতরে মাটির স্তূপ। রেললাইনের নিচে খালের মধ্যে মাটি জমে আছে। সিডিএ অ্যাভিনিউর ষোলশহর দুই নম্বর গেট থেকে মুরাদপুর পর্যন্ত অংশে মাটি অপসারণ করা হলেও সাধারণ মানুষের বর্জ্যে আবারও তা ভরাট হওয়ার পথে। মাটির স্তূপ দেখা গেছে রাজাখালী খাল ও চাক্তাই খালেও। চাক্তাই খালের চামড়ার গুদাম ব্রিজের উজান ও ভাটি উভয় অংশেই রয়েছে মাটির স্তূপ। সরু অংশ দিয়ে পানি চলাচল করে। এ ছাড়া ভাটার সময় চাক্তাই খালের মাটি দেখা যায়। এখানকার মাটি উত্তোলন প্রয়োজন।

চট্টগ্রামে দুই কারণে জলাবদ্ধতা হয়ে থাকে। প্রথমত বৃষ্টির পানি নামতে না পারার কারণে, অন্যটি হলো জোয়ারের পানির কারণে। তবে এবার নগরীর আগ্রাবাদ, হালিশহর এলাকায় জোয়ারের পানির কারণে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই এলাকায় মহেশখাল সøুইসগেট চালু করা হয়েছে। এতে জোয়ারের পানি প্রবেশ করতে পারবে না। তবে বাকলিয়া, চকবাজার, চান্দগাঁও প্রভৃতি এলাকায় জোয়ারের পানিতে জলাবদ্ধতা থাকবে। একই সঙ্গে এসব এলাকায় পানি নামতে না পারার কারণেও জলাবদ্ধতা থাকবে বলে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান। তবে এবার মুরাদপুর ও বহদ্দারহাটে পানি হয়তো উঠবে না। বৃষ্টি হলেই ষোলশহর দুই নম্বর গেট থেকে মুরাদপুর ও বহদ্দারহাট পর্যন্ত প্রধান সড়কে পানি উঠে যায়। এতে পুরো নগরীর যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এবার সেই দুর্ভোগ হবে না বলে জানান জলাবদ্ধতা নিরসনে সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাহ আলী। তিনি বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে ষোলশহর থেকে শুল্কবহর এন মোহাম্মদ পর্যন্ত অংশে খালটি চওড়া করেছি। এতে পানি দ্রুত নেমে যেতে পারবে। তাই এবার আর রাস্তায় পানি ওঠার সম্ভাবনা নেই।’

কিন্তু প্রকল্পের আওতায় খালের উভয় পাশে রাস্তা নির্মাণের কথা থাকলেও তা এখনো শুরু হয়নি। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘মেগা প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালের মধ্যে আমরা ২০টি খালের কাজ শেষ করেছি। বাকি ১৬টি খালে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শুরু না করায় সেগুলোতে প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণকাজ থমকে রয়েছে এবং খালের পাড়ে রাস্তা নির্মাণও হয়নি।’

৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্পটি ২০১৭ সালের আগস্টে একনেকে অনুমোদন পায়। সিডিএ এ প্রকল্পটির অনুমোদন পেলেও মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়নের জন্য ২০১৮ সালের এপ্রিলে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তির আওতায় সেনাবাহিনী মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করবে। কিন্তু দুই দফায় সময় বৃদ্ধি হলেও এখনো প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। ২০২১ সালে সংশোধিত আকারে প্রকল্পটি পুনরায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলেও এখনো একনেকে অনুমোদন পায়নি। এ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের ৫৭টি খালের মধ্যে ৩৬টি খাল সংস্কার ও উন্নয়নকাজ করবে সেনাবাহিনী। বাকি খালগুলোতে সিটি করপোরেশন তাদের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজগুলো করবে। প্রকল্পের আওতাধীন ৩৬টি খালের মধ্যে পুরোদমে শেষ হয়েছে প্রায় ২০টি খালের কাজ। আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ থাকা এ প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩৬টি খাল আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি, খালের উভয় পাশে ১৫ ফুট চওড়া রাস্তা ও খালের মুখে পাঁচটি সøুইসগেট বসানো, ৪২টি সিল্ট ট্র্যাপ (বালি জমার স্থান), ৩টি জলাধার নির্মাণ, ৩৬টি খাল খননের মাধ্যমে ৫ লাখ ২৮ হাজার ২১৪ ঘনমিটার মাটি উত্তোলন, ৪২ লাখ ঘনমিটার কাদা অপসারণ, নতুন করে ১০ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার নালা নির্মাণ, ১ লাখ ৭৬ হাজার মিটার দীর্ঘ প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ এবং খালের উভয় পাশে ৮৫ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করার কাজ রয়েছে। তবে সংশোধিত ডিপিপিতে এসব উপাত্তে অনেক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

মানুষ সচেতন না হলে সুফল মিলবে না : গতকাল মঙ্গলবার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অগ্রগতি জানাতে সংবাদ সম্মেলন করেছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। ব্রিগেড সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এ পর্যন্ত ৭৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

এ সময় ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘মানুষ সচেতন না হলে প্রকল্পের সুফল মিলবে না। আমাদের প্রকল্পের কাজ যেহেতু সিংহভাগ শেষ, আমরা এবার অনেকটুকু সুফল পাব।’

চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহ আলী বলেন, খালের অবৈধ দখল, সব ধরনের আবর্জনা খালে ফেলা এবং খালকে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করা, অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানির লাইনের মাধ্যমে ব্রিজ ও কালভার্টের পানি প্রবাহ ব্যাহত হওয়া এসব কারণে জলাবদ্ধতা হচ্ছে।