পানিবেষ্টিত দৃষ্টিনন্দন চার মসজিদ

যেকোনো স্থাপনা এমনিতে যতটুকু সুন্দর, তার সামনে যদি স্রোতবিহীন স্থির নদী, সমুদ্র কিংবা স্বচ্ছ পানির লেক থাকে, তাহলে সেই পানিতে প্রতিফলনের ফলে সৃষ্ট প্রতিবিম্ব মূল স্থাপনাকে আরও চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে। বিশ্বের অনেক প্রাসাদ, ভিলা, কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনের সামনে তাই কৃত্রিম লেক নির্মাণ করা হয়। মসজিদও এর ব্যতিক্রম নয়।

মসজিদ মূলত ইবাদত-বন্দেগির জায়গা হলেও বিশ্বের সব দেশেই মসজিদকে দৃষ্টিনন্দন, আকর্ষণীয় এবং জাঁকজমকপূর্ণ করে তৈরি করে তোলার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ইসলামিক স্থাপত্য এবং কারুকার্যের অনেকটাই গড়ে উঠেছে মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করেই। বিশ্বের অনেক মসজিদ আছে যার চারপাশে কৃত্রিমভাবে তৈরি লেকের পানি এমনভাবে পরিবেষ্টিত, দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন মসজিদটি পানির ওপর ভাসমান। তবে শুধু লেকই না, সরাসরি সমুদ্রের পানির ওপর পাইলের ওপর স্থাপিত মসজিদও আছে, যেগুলোকে আক্ষরিক অর্থেই ভাসমান মসজিদ বলা সম্ভব। দৃষ্টিনন্দন ভাসমান মসজিদের দিক দিয়ে মালয়েশিয়া এগিয়ে। পানিবেষ্টিত মালয়েশিয়ার অন্যতম দৃষ্টিনন্দন ৪টি মসজিদ হলো-

পুত্রা মসজিদ

পুত্রাজায়া শহরটি হচ্ছে মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক কেন্দ্র। দেশটির রাজধানী কুয়ালালামপুর হলেও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন পরিকল্পিত এ শহরে অবস্থিত। আর শহরটির প্রধান মসজিদের নাম হচ্ছে- পুত্রা মসজিদ। ১৯৯৯ সালে নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া মসজিদটি শহরটির কেন্দ্রে একটি কৃত্রিম হ্রদের পাড়ে অবস্থিত। মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে মালয়েশিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী আব্দুর রহমান পুত্রা আল হাজের নামানুসারে। মসজিদটির গম্বুজ এবং মিনার গোলাপি রঙের গ্রানাইট পাথর দ্বারা তৈরি। এর মিনারটির উচ্চতা ১১৫ মিটার। মসজিদটিতে একসঙ্গে ১৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারে।

তানজুং বুঙ্গা ভাসমান মসজিদ

মালয়েশিয়ার পেনাং প্রদেশে অবস্থিত তানজুং বুঙ্গা ভাসমান মসজিদটি পেনাং ভাসমান মসজিদ নামে পরিচিত। পুরো মালয়েশিয়াজুড়ে পানি বেষ্টিত মসজিদের ছড়াছড়ি থাকলেও সেগুলোর প্রায় সবগুলোই কৃত্রিম হ্রদের তীরে অবস্থিত। ২০০৪ সালে নির্মিত এই মসজিদটিই মালয়েশিয়ার প্রথম মসজিদ, যা সমুদ্রের পানির ওপর নির্মিত। জোয়ারের সময় মসজিদটির পাইলগুলো পানিতে অদৃশ্য হয়ে গেলে একে পানিতে ভাসমান বলে মনে হয়। ১২৯৫ বর্গমিটার আয়তনের মসজিদটি একই স্থানে সুনামিতে ধ্বংস হয়ে একটি মসজিদকে প্রতিস্থাপিত করে নির্মিত হয়েছে। এর মিনারটির উচ্চতা প্রায় সত্তর তলা ভবনের সমান। সন্ধ্যার সময় যখন মসজিদের লাইটের আলো সমুদ্রের পানিতে প্রতিফলিত হয়, তখন মসজিদটির প্রকৃত রূপ ধরা পড়ে। মসজিদটিতে একসঙ্গে দেড় হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

কোটা কিনাবালু সিটি মসজিদ

কোটা কিনাবালু সিটি মসজিদ হচ্ছে মালয়েশিয়ার সাবাহ অঙ্গরাজ্যের রাজধানী কোটা কিনাবালুর প্রধান মসজিদ। ২০০০ সালে কোটা কিনাবালুকে শহরের মর্যাদা দেওয়ার মাধ্যমে মসজিদটির উদ্বোধন করা হয়। মসজিদটির নকশা করা হয়েছে মুসলমানদের দ্বিতীয় পবিত্রতম স্থান মদিনার মসজিদে নববির নকশা অবলম্বনে। আরবি স্থাপত্যের মতোই মসজিদটির গম্বুজ সোনালি এবং নীল রঙের। মসজিদটি দক্ষিণ চীন সাগরের থেকে উৎপন্ন লিকাস উপসাগরের তীরে একটি কৃত্রিম হ্রদ দ্বারা আংশিক পরিবেষ্টিত হওয়ায় এটি কোটা কিনাবালু ভাসমান মসজিদ নামেও পরিচিত। এতে একসঙ্গে ৯ থেকে ১২ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। এটি মালয়েশিয়ার সবচেয়ে সুন্দর মসজিদগুলোর একটি এবং প্রতি বছর এটি বিপুল সংখ্যক পর্যটককে আকৃষ্ট করে।

মলাক্কা প্রণালী মসজিদ

সৌদি আরবের আল রাহমা মসজিদের মতোই মালয়েশিয়ার মলাক্কাতে অবস্থিত মলাক্কা প্রণালী মসজিদটিকেও জোয়ারের সময় সমুদ্রে ভাসমান বলে মনে হয়। কারণ এ মসজিদটিরও স্তম্ভগুলোর ভিত্তি সমুদ্রের নিচে অবস্থিত। ২০০৬ সালে নির্মিত মসজিদটি সুদীর্ঘ মলাক্কা প্রণালীর তীরে অবস্থিত একমাত্র মসজিদ। মসজিদটির অবস্থান পানির ওপর কৃত্রিমভাবে নির্মিত ৪০ হেক্টর আয়তনের মলাক্কা দ্বীপের ওপর। মসজিদটির নকশায় মধ্যপ্রাচ্য এবং মালয় স্থাপত্যের সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায়। এর গম্বুজ প্রথাগত মধ্যপ্রাচ্যের গম্বুজের মতো হলেও চার কোণে অবস্থিত মিনার চারটি মালয়েশিয়ান স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করে। এর মূল মিনারটির উচ্চতা ৩০ মিটার। মসজিদটি মলাক্কার ভাসমান মসজিদ নামেও পরিচিত।